মিকলুখো মাকলায়ার মানুষ
(২১)
আমি সব সময় খাবার পোড়াই বলে তুই মনে হয় ভেবেই নিয়েছিস আমি পোড়া খাবার ভালবাসি।
পুড়ল কোথায়? এটা তো তোর রেসিপিতে রান্না করা।
যাকগে, আমার সমস্যা নেই। তোর অসুবিধা না হলেই হল।
বল, এখন ছাত্রদের গল্প বল। পড়াশুনার অবস্থা, পরিবেশ – এসব আর কি!
দেখ, আমরা যখন এদেশে আসি, তখন পড়াশুনাই ছিল আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। কেননা পড়াশুনা শেষ করে দেশে গিয়ে চাকরি করে শুধু দেশের সেবাই করব না (মানে সমাজতন্ত্র গড়ে জনগণের অবস্থার উন্নতি করব না) নিজেদের জীবন যাপনও করব। চাকরিই ছিল একমাত্র লক্ষ্য, বা তোরা যারা ডাক্তার তাদের জন্য প্রাইভেট প্র্যাক্টিস। কিন্তু আসল কথা, যাই করি সেটা পড়াশুনার সাথে জড়িত ছিল, রেজাল্টের সাথে সম্পর্কিত ছিল জীবনের উন্নতি। পেরেস্ত্রইকার হাওয়া যখন সব কিছু পালটে দিল, যখন সুযোগ এলো ব্যবসা করার, পড়াশুনা শেষ না করেও অনেক অর্থ উপার্জনের, অনেকের মধ্যেই পড়াশুনা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিল। এমনকি পড়াশুনা শেষ করেও অনেকেই ব্যবসাকে পেশা হিসেবে নিল। লেখাপড়া তার সম্মান হারাল। হীরক রাজার মত অনেকেই ভাবল «লেখাপড়া করে যে অনাহারে মরে সে।» শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নেই নয়, সহজ উপায়ে প্রচুর পয়সা উপার্জনের প্রবণতা সারা বিশ্বের তরুণ সমাজের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে আর এর প্রভাব পড়েছে পড়াশুনায়, তাদের জীবন যাত্রায়। নব্বইয়ের দশকের কথা নিজেই জানিস। ২০০১ আর ২০০৭ সালে আমি এক সেমিস্টার করে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে আর দুবনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি। তখন একটা জিনিস খেয়াল করেছি। ছেলেরা পড়াশুনা একেবারেই করতে চায় না, তবে ওরা আরও বেশি করে চায় না আর্মিতে যেতে। ফলে অনিচ্ছা সত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। আমার এখনও মনে আছে নব্বইয়ের দশকের কথা। খুব ব্রাইট কিছু ছেলেমেয়ে তখন পিএইচডি করত আমাদের ডিপার্টমেন্টে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে সবাই কোন ফার্মে চাকরি নেয় অথবা ব্যবসায় ঢোকে। এদের কেউই আর ডিফেণ্ড করেনি। অথচ সব কিছু আগের মত থাকলে এরা সবাই ভালো শিক্ষক অথবা গবেষক হত। এখন সময় বদলেছে, আবার ছেলেমেয়েরা পড়াশুনার গুরুত্ব বুঝছে, তবে সেটা হচ্ছে ধীরে ধীরে। আমাদের বাংলাদেশের ছাত্রদের সম্পর্কেও কমবেশি একই কথা বলা যায়। দেশেও শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক অবনতির ফলে যারা আসে তাদের বেজ আমাদের মত নেই। এখন ছাত্রদের মধ্যে ছাত্র সংগঠনের কাজের চেয়েও দলীয় রাজনীতি অনেক বেশি বলে মনে হয়। অন্তত দূর থেকে দেখে যেটা বুঝি। কিন্তু আমাদের সময়ই কী সেটা কম ছিল। একমনা বা সিপিবি মনা ছেলেমেয়েরা অন্তত মস্কোয় বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, ফলে কোন দলের নাম না নিয়েও এরা ছাত্র সংগঠনের জীবনে একচ্ছত্র আধিপত্য চালাত। যে শহরে সংখ্যাটা প্রায় সমান সমান, সেখানে কিন্তু বেশ ঝামেলা ছিল। মস্কোয় এখন সেই অবস্থা। তাই এটা মনে হয় সময়ের নয় বিভিন্ন দলের শক্তির অনুপাতের উপর নির্ভরশীল। এখন অবশ্য ছাত্রদের বিভিন্ন গ্রুপের স্পন্সর আছে। প্রায়ই দেখি ওদের বিভিন্ন আড্ডায়। আমাদের যে ছিল না, তা নয়। তবে আমরা যে গ্রুপে ছিলাম, সেখানে কোন স্পন্সর ছিল না, আমরা নিজেরাই চাঁদা দিয়ে এসব করতাম। তোর মনে আছে মে দিবসের ছুটিতে আমার রুমে শতখানেক লোকের গ্যাদারিং-এর কথা? সবার কাছ থেকে ১ রুবল করে চাঁদা তুলে অনেক মাংস, রুটি বা বিয়ার কেনা হত? আসলে সব বাবা-মাই মনে করে তারা খুব বাধ্য, কর্মঠ আর মনযোগী ছিল। পিতা পুত্রের এই দ্বন্দ্বের মতই বিভিন্ন জেনারেশনের দ্বন্দ্ব অনিবার্য। এটা থাকবেই।
কিন্তু পড়াশুনার মান কী আগের মতই আছে?
মোসার্ট বলেছিলেন «সাফল্য – এটা ৯৫% পরিশ্রম আর ৫% বাদবাকি সব»। এঙ্গেলস আরও এগিয়ে গিয়ে বলেন «পরিশ্রম বানরকে মানুষে পরিণত করে।» আমি সব সময়ই বিশ্বাস করি পড়াশুনার ৮০% নিজের, বাকী ২০% শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। তা না হলে গ্রামের স্কুল থেকে কখনোই ভাল ছাত্র বেড়িয়ে আসতে পারত না। বর্তমানে ইন্টারনেটের দৌলতে এমন কী অজ পাড়া গাঁয়ে বসে বইপত্র পাওয়া যায়। জ্ঞানের ভাণ্ডার তো খোলা, কী নেবে সেটা নির্ভর করে ব্যক্তির উপর। তাছাড়া এখনও আমাদের যারা পড়াতেন তাদের অনেকেই শিক্ষকতা করছেন, আমাদের বয়সী একটা বিরাট অংশ সোভিয়েত শিক্ষা লাভ করেছে। আমরা কিন্তু আগের মতই পড়াচ্ছি। ছোটবেলায় শিক্ষা নিয়ে যত স্বপ্নই থাকুক না কেন, একটা বয়সের পর এর সাথে যোগ হয় বাস্তব পরিস্থিতি। পড়াশুনার সাথে সাথে চাকরির প্রশ্ন আসে। আমি যখন বুয়েটে ভর্তি হই, তখন কয়েকজন ছেলেমেয়ের কথা কানে আসে। একজন বলছিল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে লাভ নেই, চাকরির জন্য মেকানিক্যাল ভালো। উত্তরে আরেকজন বলল, আমরা যখন পাশ করে বেরুবো তখন যে সব কিছু পাল্টে যাবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই। হাতে গনা কিছু মানুষ বাদে প্রায় সবাই ভবিষ্যৎ, চাকরি – এসব মাথায় রেখেই পড়াশুনা করে। তাছাড়া এখন একটা ট্রেন্ড দেখা যায়, চাকরি বা ব্যবসা যাই কর একটা ডিগ্রী থাকলে ভালো। অনেকেই তো জীবনের এক পর্যায়ে রাজনীতিতে যোগ দেয়। তখন এদের এসব ডিগ্রী অনেক কাজে লাগে। নিজেদের চারপাশে একটু ভালো করে তাকালেই এসব দেখতে পাবি। আসলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যদি ভারতবর্ষের ইতিহাস দেখিস, দেখবি পড়াশুনা করত মূলত ব্রাহ্মনেরা আর রাজপুত্ররা, অর্থাৎ যারা রাষ্ট্রক্ষমতা আর ধর্মীয় কাজকর্মের সাথে জড়িত। কৌটিল্যের অর্থ শাস্ত্রের কথা বলতে পারিস। তবে সেটাও কিন্তু রাজকার্যের সাথেই জড়িত। সভাকবি, জ্যোতিষী সহ বিদ্বানদের অবস্থান ছিল মূলত রাজদরবারে। বৌদ্ধ বিহারগুলোতেও মূলত পড়ান হত ধর্মশাস্ত্র আর জ্যোতির্বিদ্যা, যা ছিল আস্ট্রোলোজি, রাজা বা সমাজের উপরের তলার মানুষদের ভাগ্য গণনার জন্য। প্রাচীন মিশরেও কী সেরকম ছিল না? গ্রীস দেশে অবশ্য ফিলসফি, গণিত প্রসার লাভ করে। তবে সেসবও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল রাষ্ট্র যন্ত্রের সাথে। একই ঘটনটা আমরা দেখব আরব বিশ্বে, মধ্য যুগের ইউরোপে – যেখানে ধর্ম আর রাষ্ট্র প্রায় এক হয়ে গিয়েছিল। মুঘল আমলে শিক্ষা ছিল চাকরি কেন্দ্রিক। একই ব্যাপার ব্রিটিশ আমলে। ব্রিটিশরা কী করত? ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের জন্য ক্যাডার তৈরি করত। তাই চাই বা না চাই – প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বরাবরই চাকরি বা আরও সঠিক ভাবে বললে সমাজে মানুষের মর্যাদা ওরিয়েন্টেড। যুগ যুগ ধরেই সাধারণ মানুষ শিক্ষা পেত বংশ পরম্পরায়। আমার ছোটবেলায়ও দেখেছি অনেক ছেলেরাই কোন দর্জির অধীনে কাজ করে সেলাই শিখছে আর এক সময়ে নিজেরাই মাস্টার হচ্ছে। একই জিনিস তাঁত, হালচাষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশায় আমরা দেখব। দেশে তো এখনও ড্রাইভারের হেল্পার হিসেবে ঢুকেই এক সময় সবাই ড্রাইভার হয়। এ সবই কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। এছাড়া লেখক, কবি – এরা তো কখনই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ধার ধারেননি। কাউকে তো আর কবি বা সাহিত্যিক হতে শেখানো যায় না, গান লিখতে শেখান যায় না। যারা এসব হয়, ভেতরের তাগিদেই হয়। এখন দেখা যাচ্ছে, শুধু দু আনা মজুরির ছোটখাটো চাকরি নয়, ঘরে বসে ইন্টারনেট ঘেঁটে বিশেষ করে আইটি সেক্টরে পারদর্শী হয়ে অনেকেই বড় বড় চাকরি করছে। সে জন্যে বয়সটাও এখন বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে না। সব মিলিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আগে যে গুরুত্ব ছিল এখন সেটা নেই। তবে কিছু বিষয় আছে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে গেলে অপরিহার্য। এটা ফিজিক্স, ম্যাথেমাটিক্স, রসায়ন, ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি। এসব বিষয়ে যারা পড়তে চায়, জানতে চায়, তাদের পড়াশুনা না করে উপায় নেই। তাই চাহিদা বদলের সাথে সাথে শিক্ষার চরিত্র, চাহিদা – এসবই বদলাচ্ছে। আমাদের ডিপার্টমেন্টেই অনেকেই বায়োফিজিক্স পড়তে চাইছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ডিপার্টমেন্ট। আমরা চেষ্টা করছি সময়ের সাথে পা মিলিয়ে চলতে। এখন প্রায়ই শুনবি ইউনিভার্সিটির রেটিং এর কথা। আমি মাত্র তিন বছর পড়াচ্ছি। গত ছাব্বিশ বছর গবেষণার সাথে জড়িত। দের শ’র বেশি পাব্লিকেশন, কিন্তু কোন দিন জার্নালের রেটিং নিয়ে ভাবিনি। এখন ইউনিভার্সিটি সেটা ভাবায়, তারা বলে কোন ধরণের জার্নাল পাব্লিকেশন ইউনিভার্সিটির রেটিং বাড়ায়। মনে আছে, সোভিয়েত আমলে আমরা বলতাম সোভিয়েত অনেক জিনিসই ভালো, তবে মোড়কটা সাদাসিদে। এখন তারা সেটা নিয়ে ভাবছে। সুন্দর সোভিয়েত শিক্ষা সিস্টেম বাদ দিয়ে ইউরোপিয়ান সিস্টেম চালু করার পেছনে এটাও একটা কারণ বলেই মনে হয়। আসলে যুগটাই এখন এমন – শো আর শো, এটাই ওভার অল পরিস্থিতি। মনে হয় সারা বিশ্বেই। যেহেতু আমাদের স্কেপ্টিক্যাল মনোভাবের পরেও ইউনিভার্সিটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রেটিং-এ খারাপ করছে না, বুঝতে হবে এরা ট্রেন্ডে আছে, যুগের সাথে পা মিলিয়ে চলছে। মনে আছে, আমাদের সময় আমরা অনেকেই নাখোশ হতাম রুশ ভাষা, ফিলসফি এসব পড়ানোর জন্য। যতদূর জানি, আমাদের দেশের ব্যাচেলর বা মাস্টার্স লেভেলে সাইন্সের ছাত্রদের বাংলা বা ইংরেজি, সাহিত্য বা ফিলসফি পড়তে হয় না। খুব সম্ভব অন্যান্য দেশেও না। ফলে অনেক সময় দেখেছি, নিজেদের সাবজেক্টে খুব ভালো জ্ঞান থাকার পরেও অন্যান্য দেশের স্পেশালিষ্টদের এর বাইরের বিষয় সম্পর্কে ধারণা কম। একবার আমার বাসায় এক নামকরা গণিতবিদ এলেন বেড়াতে। ইউরোপ, আমেরিকায় পড়াশুনা করেছেন। আমার তো অনেক বইপত্র, বিশেষ করে লিটেরেচার। দেখে বললেন, “আমি স্কুলে থাকতে ডিকেন্সের টেল অফ ট্যু সিটিজ পড়েছিলাম, এরপর আর কিছু পড়ার সময় পাইনি।” অথচ আমার রুশ কলিগদের সাথে সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন থেকে শুরু করে প্রায় বিষয়েই অনায়াসে আলাপ করা যায়। অনেক কিছু বদলে গেলেও এখনও ইউনিভার্সিটিতে এসব পড়ায়। বিদেশিদের রুশ আর স্থানীয়দের ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, জার্মান, আরবি বা অন্য এক বা দুটো ভাষা। ইদানীং শুনছি চাইনিজও এর সাথে যোগ হয়েছে। চেষ্টা করে শুধু স্পেশালিষ্ট নয়, পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার পথা দেখাতে। তাই সব মিলিয়ে অবস্থা ততোটা খারাপ নয়।
মেডিসিনের কী অবস্থা?
আগের মতই। আসলে জানিস, আমাদের সব ফ্যাকাল্টিতে ব্যাচেলার শুরু হলেও মেডিসিনে যতদূর জানি, আগের মতই আছে, মানে টানা ছয় বছর পড়াশুনা করে ডাক্তার হয়ে বেরোয়। সেটাই ঠিক মনে হয়। কেনন না একজন পদার্থবিদ বা ইঞ্জিনিয়ার ব্যাচেলর শেষ করে কাজ করতে পারে বা অন্য কোথাও গিয়ে পড়তে পারে, হাফ ডাক্তার হয়ে বেরোনো অনেক রিস্কি আর এসব ব্যাপারে এক জায়গায় পড়াশুনা শেষ না করে অন্য কোথাও ভর্তি হওয়া তাদের পেশাকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে।
অন্যান্য ফ্যাকাল্টি?
ঠিক জানি না রে। তবে সব দেখে মনে হয় ভালই চলছে। হোস্টেলের কথা যদি জিজ্ঞেস করিস, তবে সেটা আরও বেশি বর্ণাঢ্য বলেই মনে হয় যদিও প্রায় বছর কুঁড়ি কোন হোস্টেলে ঢুকিনি। নব্বইয়ের দশকে পরিবেশ বেশ ভয়াবহ ছিল। স্কীনহেডদের আক্রমণ হত শুনেছি। এখন সেসব নেই। সেই আশির দশকের মতই ছাত্ররা ঘোরাফেরা করছে। মস্কোয় বিদেশির অভাব নেই, তবে মিকলুখো মাকলায়ায় এলেই মনে হয় মস্কো একটা কসমোপলিটন সিটি। আমার এক আর্জেন্টিনার বন্ধু আছে, দুবনায় আলাপ, মাঝে মধ্যে মস্কো আসে। ওর তো ভীষণ পছন্দ এই এলাকা। ক্যাফে, বার – সব গমগম করছে। এ যেন বিশ্ব মানবের মিলন মেলা। ইউনিভার্সিটির কালচারাল সেন্টার আগের চেয়েও আক্টিভ। বিভিন্ন সময়ে বিদেশে যায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। ইন্টারক্লাব ১০ নম্বরের পেছনেই আছে। সেখানে যাই বছরে একবার, দুর্গা পুজার সময়। এ সময় পুরনো পরিচিতদের সাথে দেখা হয়, কথা হয়। এক সময় এখানে বাংলাদেশ ডে পালিত হত ঘটা করে। এখনও বিভিন্ন সময় দেখি বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েরা নিজেদের দেশের কোন জাতীয় দিবস পালন করছে। এখনও প্রতি বছর পয়লা মে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতির মানুষদের ফেস্টিভ্যাল পালিত হয়। মনে আছে, আমাদের ছাত্র জীবনেই এর শুরু। সবাই নিজ নিজ দেশের স্টল খুলে, কালচারাল প্রোগ্রাম করে। আসলে জানিস, কোন জিনিস আমরা যখন বাইরে থেকে দেখি, তখন এক রকম মনে হয়, আর যখন ভেতর থেকে দেখি, তখন অন্য রকম। আমার বিশ্বাস ছাত্র হিসেবে আশির দশকে আমাদের যে অনুভূতি হত, আজকের ছাত্রদের ঠিক একই রকম অনুভূতি হয়। এখনও নিজের দেশকে এখানে তুলে ধরতে পেরে গরবে তাদের বুক ফুলে ওঠে। কিন্তু আমরা বাইরে থেকে দেখি বলে, এ সবের সাথে আগের মত ওতপ্রোত ভাবে জড়িত নই বলে মনে হয় সব বদলে গেছে। কিছুই বদলায় নাই। ডিএনএ লেভেলে মানুষের চরিত্র হাজার হাজার বছরে খুব একটা বদলায়নি, শুধু বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় বিভিন্ন বাঁধা নিষেধের কারণে সেসব অনুভূতি কোথাও ভোঁতা, কোথাও বা তীক্ষ্ণ হয়েছে। নিজেদের ছাত্র জীবনে শিক্ষকদের দেখে মনে হত বিশাল কেউ। এখন ছাত্রদের দেখে অবাক হয়ে ভাবি যে এক সময় আমিও এমন ছিলাম। হয়তো ওরাও আমাকে দেখে বিশাল কিছু একটা ভাবে। পরীক্ষা দিতে এসে ভয় পায়। নিজেরই হাসি পায়। ছাত্র পোড়াতে গিয়ে এত কিছু শিখছি যে কল্পনা করতে পারবি না। আগে নিজে যখন ছাত্র ছিলাম কিছুটা বুঝতাম, কিছুটা মুখস্ত করতাম আর ভয় পেলেও জানতাম শিক্ষক অনেক বেশি বুদ্ধিমান, বুঝে নেবেন। এখন জানি ছাত্ররা আমার কথা বিশ্বাস করে, তাই ভুল করার কোন অবকাশ নেই। অনেক কিছু নতুন করে শিখতে হয়, ওরা যাতে বুঝে সেভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়। আগে মনে হত ক্লাস নেওয়া সোজা। এখন ক্লাস নেওয়ার জন্য এত সময় ধরে প্রস্তুতি নিতে হয় যে নিজের কাজ করার সময় পাইনা। এটা নিজের উপর কনফিডেন্স বাড়ায়। পড়াতে না এলে এ দিকটা কোনদিনই জানা হত না।

ভালো লিখছে, লেখার ধরণও পাল্টে গেছে। মনে পড়লে, সময় পেলে তোমার এদিকটায় ঘুরে যাই।
ReplyDeleteভালো কথা তোমার ও লিখাটা পড়ে আমার এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা না বল্লেই নয়। ঐযে বল্লে না নিজের বিষয়ের পরেও ভাষা, দর্শন ও রাজনৈতিক অর্থনীতি পড়ানোর কারনে দেশে বিদেশে যত প্রশিক্ষণে বা স্টাডি কোর্সে অংশগ্রহণ করেছি তখনই অনুভব করেছি আর সকলের চেয়ে আমরা আলাদা আমাদের সার্বিক বুঝ তড়িৎ কাজ করে। দেশে তো বটেই মিশরে আল হামরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নামকরা অধ্যাপক (ওরা সব আমেরিকায় বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, কাজ করায় অভিজ্ঞ) আমাকে জিজ্ঞেসই করে বসলো, আমি ফিলোলজি আর পেডাগজির ছাত্র হয়ে জটিল অর্থনীতি'র বিষয়গুলো এত তাড়াতাড়ি ধরতে পারি কেমন করে?
আমার উত্তর কী হবে তা তোমার জানা। আমি বিশেষ করে পল্লী উন্নয়ন একাডেমীতে কাজ করেছি হরেক রকম কারবারির সাথে কিন্তু কেহই আমাকে আন্ডার এস্টিমেট করতে আসেনি শুধু সোভিয়েতে পড়াশোনা করেছি বলে। আমার জন্য এ এক বিরল অভিজ্ঞতা!
আমি কনফিডেন্টলী বলতে পারি যে আমাদের সবাই এমন পরিস্থিতিতে তাদের ভালোটাই দেখাতে পেরেছে।
ভালো থেকো বিজন।
ধন্যবাদ হামিদ ভাই। হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রেই আমরা ওদের থেকে অন্য রকম, একটা একটা পজিটিভ দিক। তবে আমার বিশ্বাস এগুলো আমাদের অনেকের ব্যক্তিগত আগ্রহ। আমি অনেককেই দেখেছি মস্কোতেও অন্য সাব্জেক্তগুল শুধু দায়সারা গোছের পড়ে যায়। সিস্টেমের কৃতিত্ব আছে, তবে সেটা তত বেশি নয়, যতটা আমাদের নিজেদের আগ্রহ।
Deleteহতে পারে, তবে আমার আশপাশ ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেরকে এসব চর্চা করতে দেখেছি।
Deleteযতই দিন যাচ্ছে সেটা ততই কমছে। আমাদের সময় খুব কম লোকই এসব করত। আমরা কত সময় যে নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিয়ে নষ্ট করেছি, অথচ কত সুযোগ ছিল বিভিন্ন দেশের কালচার সম্পর্কে জানার, রুশ দেশের কালচার জানার। আপনারা যখন এসেছেন, সদ্য স্বাধীন দেশ হিসেবে অন্যদের বাংলাদেশের পরতি যে আগ্রহ ছিল, আমাদের সময় ততটা ছিল না। বরণ (শেখ মুজিবুর) রহমানকে হত্যা করায় আমাদের প্রতি একটু বাঁকা দৃষ্টিতেই তাকাত লোকজন।
Delete