সোভিয়েত থেকে রাশিয়া

(৬)
এরই মধ্যে দুলাল চলে গেছে শহরে
হোস্টেলে থেকে ব্যবসা করা অসুবিধে তখনও মোবাইল ফোনের যুগ শুরু হয়নি আর ব্যবসা মানেই কম্যুনিকেশন, মানে ফোন, ফ্যাক্স ইত্যাদি তাই শুধু দুলাল নয়, যারা ব্যবসার সাথে সিরিয়াসলি জড়িত হয়ে পড়েছিল  তাদের অনেকেই চলে যায় শহরে তখন মস্কোয় দু ধরণের ব্যবসা ছিল বিদেশিদের জন্য একটা ছিল সিঙ্গাপুর থেকে কম্পিউটার, ফোন, ফ্যাক্স, প্রিন্টার, স্ক্যানার ইত্যাদি ইলেকট্রনিক সামগ্রী বা তুরস্ক থেকে বিভিন্ন রকমের পোশাক এনে  বিক্রি করা আরেকটা ছিল ডলার কেনাবেচা সোভিয়েত সমাজে ব্যবসা মানেই ছিল কালোবাজারি বা স্পেকুলেশন যদিও এর মধ্যে ব্যবসার আইনকানুন শিথিল করা হয়েছিল  কিন্তু সাধারণ মানুষ তখনও এসব কাজ খুব ভালো চোখে দেখত না আসলে কোনটা আইনি আর কোনটা বেআইনি তা নিয়ে বিভিন্ন রকমের কনফিউশন ছিল যার সুযোগ নিত পুলিশ, কাস্টমসের লোকজন আর বিভিন্ন স্তরের আমলারা   খোলা বাজার অর্থনীতির আগমনে তখন এ দেশের মানুষের, বিশেষ করে বৃদ্ধ/বৃদ্ধাদের, অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয় তাই অনেকেই নিজের ফ্ল্যাটের একটা রুম ভাড়া দিতেন এখানে থাকত ফোনের সুবিধা অনেকে সে সময় বিয়েও করে এ দেশে ব্যবসায়ের বাড়তি কিছু সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্যে শহরে বাস করার ফলে এর পর দুলালের সাথে অভির আর দেখা হয়নি মাঝে কার মুখে যেন অভি শুনল, দুলাল ফ্ল্যাট কিনেছে বিয়েও করেছে মস্কোর বাংলাদেশীদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ব্যবসায়ী ও তখন মস্কোয় বিদেশি গাড়ি তেমন একটা দেখা যেত না যাও ছিল তা ভলভো, মার্সিডেজ এসবের মধ্য সীমাবদ্ধ তাই নতুন মডেলের কোন গাড়ি কেউ কিনলে সেই খবর যাকে বলে গ্রামময় রাষ্ট্র হয়ে যেত এভাবেই কানে এল দুলালের খুব নামকরা একটা মডেলের গাড়ি কেনার কথা

এরপর সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর মানচিত্র থেকে উধাও হয়ে গেল পেছনে পড়ে রইল কোটি কোটি মানুষ হারিয়ে যাওয়া সেই দেশের স্মৃতি বুকে করে সামনে শুধুই অনিশ্চয়তা, পেছনে ফেরার পথ নেই কত স্বপ্ন যে সেই আগস্টে উল্কাপাতের মত ঝরে পড়েছিল কে জানে! একই সাথে নতুন স্বপ্নে, নতুন আশায় বুক বাঁধছিল হাজারও মানুষ আজ পেছন ফিরে তাকালে বুঝতে পারা কষ্টকর ভাঙ্গা গড়ার সেই হিসেবে কে জিতল আর কেই বা হারল পেরেস্ত্রইকা অভির মনে আশার আলো জাগিয়েছিল যে বিশ্বাস নিয়ে ও সোভিয়েত ইউনিয়নে এসেছিল অল্প কিছু দিনের মধ্যেই সেটা ভেঙ্গে যায় মনে পড়ে বিদায় বেলায় জ্যাঠামশায়ের উপদেশ “ভালো মানুষ মন্দ মানুষ সব জাগায়ই আছে ভালো মানুষের সাথে মিশবে, খারাপ মানুষদের এড়িয়ে চলবে” আর নিজের গর্বিত ও গর্হিত উত্তর “সোভিয়েত ইউনিয়নে খারাপ মানুষ নেই“ কিন্তু খুব অল্প সময়ের অভি জ্যাঠামশাইয়ের কথা হাড়ে হাড়ে টের পায় বুঝতে পারে নিজের ভুল, বুঝতে পারে কোন কিছুকে অন্ধ ভাবে বিশ্বাস করতে নেই এটা অভিকে ভবিষ্যতে অনেক ভুল এড়াতে সাহায্য করে, যদিও এ জন্যে কম মূল্য দিতে হয়নি তাই পেরেস্ত্রইকাকে ও সাদরে গ্রহণ করে, বদ্ধ গুমোট পরিবেশে একটু আশার আলো দেখে সমস্যা কি এক দলে ছিল? ভিন্ন মতের অভাব কী এ জন্যে দায়ী? ভিন্ন মত যে একেবারেই ছিল না তা নয় ভিন্ন মত ছিল, ছিল বেশ বড় রকমের তবে তা ছিল আত্মগোপনে, যাকে বলে কিচেনে সাধারণ মানুষ রাজনীতি নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় যদি তার নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব না থাকে তাই হয়তো তারা নিজেদের অসন্তোষ খুব একটা প্রকাশ করত না বা করতে ভয় পেত স্ত্যালিনের দানোসের (অন্যদের সম্পর্কে গুপ্ত পুলিশের কাছে সত্যমিথ্যা বিভিন্ন অভিযোগ করা) স্মৃতি তখনও দাউদাউ করে জ্বলছে অনেকের বুকে কিন্তু কিছুদিন পরে যখন দেখা গেল গরবাচেভের ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথার মধ্যে বার্তা কিছুই নেই, অভি সমর্থন করতে লাগল ইয়েলেতসিনকে বন্ধুদের সাথে তাঁর পক্ষে তর্ক করল, তর্ক করল পার্টি নেতাদের সাথে বিভিন্ন এক্সারশনে আয়োজিত ভস্ত্রেচা বা সভায় ১৯৯১ সালে বেলি দমের ব্যারিকেডে দাঁড়িয়ে ইয়েলতসিনের পক্ষে স্লোগান দিল, আবার কিছুদিন পরে, বিশেষ করে ১৯৯৩ সালে সেই বেলি দমে ইয়েলতসিনের ট্যাঙ্ক আক্রমণের পরে সে আবার হতাশ হল রাজনীতির নোংরা চেহারা দেখে অভির কাছে ভারত বিভাগ ছিল জনগণের প্রতি রাজনীতিবিদদের বিশ্বাসঘাতকতা যে স্বপ্ন দেখিয়ে, সেসব সমস্যা সমাধান করতে দেশভাগ – তা আজ শুধু অসম্পূর্ণই নয়, বরং আরও প্রবল বেগে সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে সাম্প্রদায়িক সমস্যা জিইয়ে রাখাই আজ রাজনীতির লক্ষ্য, কেননা পরস্পর বিরোধী স্লোগানই আজ উপমহাদেশে ভোটে জেতার অন্যতম মোক্ষম অস্ত্র ভারত বিভাগ ছিল রক্তাক্ত আজও অনেকের বুক থেকে এ রক্ত ঝরছে আষাঢ়ের গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মত সোভিয়েত ইউনিয়নকেও বিরাট মুল্য দিতে হয়েছে কত মানুষ যে হারিয়ে গেছে চিরতরে কে জানে? এখনও মানুষ সেই শক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি অনেক সমস্যা ছিল সেখানে, তবুও শান্তি ছিল, ছিল মানবিক সম্পর্ক আজ সেটার বড়ই অভাব এরকম এক রাজনৈতিক, সামাজিক আর মানসিক পরিস্থিতিতে অভি ১৯৯৩ সালে অভি থিসিসের কাজ শেষ করে থিসিসের সাথে আসে ভালবাসার ফসল অভিকে থেকে যায় রাশিয়ায় যে কারণে ১৯৯৪ সালে কাজ নিয়ে চলে যায় মস্কোর অদূরে দুবনা নামে ছোট্ট এক শহরে মস্কোয় থেকে যায় ওর ফ্যামিলি সে সময় মস্কো আসত ছুটির দিনে, ব্যস্ত থাকত সংসার নিয়ে কালেভদ্রে যেত বন্ধুদের আড্ডায় এরকম এক আড্ডায় অভি শুনল দুলালের ব্যবসায় সমস্যার কথা আসলে তখন সবাই ছিল সমস্যা জর্জরিত ছাত্রজীবনে প্রায় সবাই একসাথে শুরু করেছিল ব্যবসা তখন টাকা পয়সার চেয়েও বড় পুঁজি ছিল পরিশ্রম, পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস তখনও ব্যবসায়িক পার্টনাররা ছিল একে অন্যের কমরেড কিন্তু ক্যাপিটাল যখন বাড়তে শুরু করল টান পড়ল বন্ধুত্বে, বিশ্বাসে কে কাকে আগে ঠকাবে এটাই ছিল দেখার বিষয় এভাবে কত লোকের ব্যবসা যে লাটে উঠল, কতজন যে পথে বসল তার হিসাব কে রাখে! শুনলাম দুলালের সাথেও এরকম কিছু ঘটেছে ১৯৯৬ সালে অভির ফ্যামিলি দুবনা চলে আসে, তাই মস্কো আর যাওয়া হত না ওর যদিও অনেকের সাথে ই-মেইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করত, সেটা বিভিন্ন কারণে তেমন প্রম্পট ছিল না ১৯৯৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মস্কোয় আসা হত কালেভদ্রে বাংলাদেশী বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ হত আরও কম তখন কার কাছে যেন ও শুনতে পেল দুলাল রাশিয়া ছেড়ে চলে গেছে কেউ বলল মালয়েশিয়া কেউ বলল সিঙ্গাপুর এক সময় দুলাল সেন্ট পিটার্সবার্গে থাকে বলেও শোনা গেল কিন্তু কোন ভাবেই ওর সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি, সে চেষ্টাও করেনি  




Comments

Popular posts from this blog

কাজান

আগ্রা মথুরা বৃন্দাবন