তরঝক কাশিন কালিয়াজিন

(২৯) 

পরদিন সকালে চঞ্চলের বাসার সামনে থেকে একটা স্কুটার অভিকে তুলে নিয়ে গেল। এভাবেই বিভিন্ন যাত্রীদের ওরা জড়ো করে বড় বাসে। ইতিমধ্যে দুলালকেও নিয়ে এসেছে। শীতের দিল্লি এখনও লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে। ওরা দুজন এক সীটে আরাম করে বসল। অনেকক্ষণের পথ। কিছুটা ঘুমিয়ে আর কিছুটা গল্পে গল্পে কাটাবে ওরা।

আপনি গতকাল তরঝক, কাশিন আর কালিয়াজিনের গল্প শোনাবেন বলেছিলেন। 

মনে আছে। বলছি।

তরঝক অন্যতম প্রাচীন রুশ জনপদের একটি। আমি তরঝক যাই ৪ জুন ২০১১ সালে। আমাদের ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের যে ক্লাব আছে ওরা মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন এস্কারশনের আয়োজন করে। সময় সুযোগ পেলে আমিও যাই ওদের সাথে। এটা ৎভেরস্কায়া অঞ্চলে। দুবনা থেকে কিম্রি হয়ে যেতে হয় ৎভের। ৎভের দুবনা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার। ৎভের এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান শহর। আমি সেখানে প্রথম যাই ১৯৮৮ সালে। সে সময় ৎভেরের নাম ছিল কালিনিন, অক্টোবর বিপ্লবের নেতা, সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্যাপ্টেন বা স্তারস্তা, কৃষক শ্রমিকের প্রেসিডেন্ট নামে খ্যাত সোভিয়েত ইউনিয়নের মন্ত্রীসভার আনঅফিসিয়াল প্রধান মিখাইল ইভানোভিচ কালিনিনের নামানুসারে। ভের জনপদ স্থাপিত হয়  ১১৩৭ সালে যেখানে ৎভেরৎসা তমাকা নদী ভল্গায় এসে পড়ছে সেখানে। অর্থাৎ ৎভের মস্কোর চেয়েও পুরনো।  সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ইয়েকাতেরিনার রাজ্যত্বকালে এই শহর বিশেষ ভাবে ঢেলে সাজানো হয়  মস্কো থেকে সাঙ্কৎ পিতেরবুর্গ যাবার পথে প্রধান  বিশ্রামস্থল হিসেবে। সেই ভের ছাড়িয়ে আরও অনেকটা পথ পেরিয়ে তরঝক। নাম থেকেই বুঝতে পারছ এর মূল তরগ বা ব্যবসা বাণিজ্য। এক সময় ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন এই রুশ শহর। যদিও ঠিক কবে এই শহরের জন্ম সেটা জানা যায় না, তবে ধারণা করা হয় দশম শতাব্দীর শেষ আর একাদশ শতাব্দীর শুরুতে নভগোরাদের সওদাগরেরা  এই শহরের গোরাপত্তন করেন। বিশেষ করে আরকিওলজিক্যাল খনন এই মতবাদের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। তরঝকের নির্ভরযোগ্য লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় নভগোরাদের বার্ষিকীতে। সেখানে সুজদালের রাজপুত্র ইউরি দলগোরুকি কর্তৃক ১১৩৯ সালে এই শহর দখলের উল্লেখ আছে। উল্লেখ্য যে এই  ইউরি দলগোরুকি ১১৪৭ সালে মস্কো শহরের গোরাপত্তন করেন। অর্থাৎ তরঝক ৎভেরের  সমসাময়িক মস্কোর চেয়েও প্রাচীন শহর। ১২৩৮ সালে তরঝক দুই সপ্তাহ তাতার-মঙ্গোল অবরোধে ছিল। এরপরেও বিভিন্ন সময় এই শহর বিভিন্ন রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। পঞ্চদশ শতকের শুরুতে এখানে নিজস্ব রৌপ্য মুদ্রা বের করা হয়।  

১৪৭৮ সালে মস্কোর জার তৃতীয় ইভান নভগোরাদ রাজ্যের সাথে তরঝকও মস্কো রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। রুশ রাজ্যে তরঝক নভতরঝস্কি এলাকার কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। ১৫৬৫ সালে জার ইভান গ্রোজনি রুশ দেশকে নতুন করে ঢেলে সাজান। তরঝক তখন জেমশিনায় পরিণত হয়। ১৫০৯ সালে তরঝক পোল্যান্ড ও লিথুনিয়ার আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করলেও ভীষণ রকম ক্ষতিগ্রস্থ হয়।  ১৭০৩ সালে পিটার দ্য গ্রেট সাঙ্কত পিতেরবুর্গ শহরের গোরাপত্তন করলে তরঝক মস্কো থেকে সাঙ্কত পিতেরবুর্গ যাওয়ার পথে অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৭১০ সালে তরঝক ৎভের প্রভিন্সের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৭২৭ সালে একে আবার নভগোরাদ গুবেরনির অংশ করা হয়। আবার ১৭৭৫ সালে একে পুনরায় ৎভেরের অংশ করা হয়। ১৭৮০ সালে সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ইয়েকাতেরিনা তরঝকের প্রতীক নির্ধারণ করেননীল আকাশে তিনটি সোনালী তিনটি রূপালী কবুতর।         

১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের পর নভেম্বরের শেষ দিকে তরঝক বলশেভিকদের অধীনে আসে। বর্তমানে তরঝক ক্ষয়িষ্ণু এক শহর। প্রায় সমস্ত ছোট ছোট শহরের মতই তরঝকের ভাগ্য। একসময় পুশকিন সহ অনেকেই এখানে বিশ্রাম নিতেন সাঙ্কত পিতেরবুর্গ থেকে মস্কো যাওয়ার পথে। তবে দুই রাজধানীর মধ্যে আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থার ফলে তরঝক সেই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। রুশ সাম্রাজ্যের প্রাচীন যেসব শহর গোল্ডেন রিং-এর আওতায় ছিল সোভিয়েত আমলে তাদের গুরুত্ব ছিল ভিন্ন। উল্লেখ্য গোল্ডেন রিং তৈরি হয় সোভিয়েত আমলে। বিদেশীদের মস্কো আর তার আশেপাশের ঐতিহাসিক শহরগুলো দেখানোর প্রচেষ্টা থেকে কিছু শহরকে এর অন্তর্ভুক্ত করে  বিশেষ যত্নে সংরক্ষণ করা হয়। জাগোরস্ক (সেরগিয়েভ পাসাদ), ভ্লাদিমির, সুজদাল, রোস্তভ ভেলিকি, পেরেস্লাভল জালেস্কি, কাস্ত্রোমা, ইয়ারোস্লাভল ইভানোভো। বিদেশীরা বেড়াতে এলে এসব শহরেই নিয়ে যাওয়া হত বিধায় বিশেষ যত্ন ছিল এদের প্রতি। ইদানীং কালে কিছু কিছু প্রাচীন শহর আবার লাইম লাইটে আনার চেষ্টা চলছে। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ, এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৈচিত্র্যময়, ইতিহাস হাজার বছরের তবুও পর্যটন ততটা উন্নত নয়। ফলে এমনকি এদের নিজেদের লোকজনই বাইরে যায় বিশ্ব দর্শনে। এ সূত্র ধরেই তরঝক, মুরম, কালিয়াজিন, কাশিন, আলেসান্দ্রভ, ইউরিয়েভ পলস্কি, উগ্লিচ ইত্যাদি নাম সামনে চলে আসছে। আমি যখন তরঝক যাই তখন অনেক কিছুরই রিকনস্ট্রাকশন চলছিল। ভেরসা নদীর ধারে বরিসোগ্লেবস্কি মনাস্টেরি বা মঠের কাজ চলছে পুরাদমে। ভস্ক্রেসেনস্কি মহিলা মঠের কাজ শেষের পথে। খৃস্টের জেরুজালেম প্রবেশ আর স্পাসো-প্রিওব্রাঝেনস্কি চার্চ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে নদীর ধারে। শহরের মিউজিয়াম বেশ সমৃদ্ধ। পুশকিন সহ বিভিন্ন খ্যাতিমান লোকজন যারা বিভিন্ন সময় তরঝক এসেছেন তাদের স্মৃতি অতি যত্নে সংগৃহীত। তরঝক সেলাইয়ের জন্য বিখ্যাত ছিল, বিশেষ করে ট্র্যাডিশনাল রুশ পোশাকের জন্য। অনেকটা পাটের মত লিওন বা লনের পোশাক এখানে তৈরি হয়। সোভিয়েত আমলে এর উপর বিশেষ ইনস্টিটিউট পর্যন্ত ছিল। এখন ইলেকট্রনিক্স, লোকোমোটিভ সহ বিভিন্ন শিল্প এখানে গড়ে উঠছে। আমার বিশ্বাস যথাযথ ব্যবস্থা নিলে তরঝক সেন্ট্রাল রাশিয়ার অন্যতম ট্যুরিস্ট সেন্টার হয়ে উঠবে।

 

দেখতে দেখতে ওরা অনেকটা পথ পেরিয়ে এল। খুব ভোরে রওনা হয়েছে, তাই প্রায় কেউই ব্রেকফাস্ট করতে পারেনি। পথে ওদের গাড়ি একটা কমপ্লেক্সে এসে থামল। বিভিন্ন রকম দোকানপাট, টয়লেট বাথরুম। এক কথায় ফ্রেশ হওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা ওখানে। একজন রঙবেরঙের পোশাক পরে গান গাইছিল, সাথে এক বাচ্চা মেয়ে। ওরা দাঁড়িয়ে শুনল, কিছু টাকাও দিল। ব্রেকফাস্ট ওখানেই সারল সবাই মিলে। দেখতে দেখতে কেটে গেল আধ ঘণ্টা। আবার পথে নামার পালা। 

 

আমি কিন্তু কাশিন আর কালিয়াজিনের কথা ভুলিনি। দুলাল মনে করিয়ে দিল।

বলব, বলব। কালিয়াজিন নামটি আমার পরিচিত। সেখানে ভল্গার মাঝে একটা চ্যাপেল বা বেল টাওয়ার আছে। আমাদের ক্লাবের অনেকেই সেখানে গেছে ছবি তুলতে। তাই আমার অনেক দিনের ইচ্ছে ওখানে যাবার। যখনই বোর্ডে কালিয়াজিনের এক্সারশনের নোটিশ দেখলাম ভিড়ে গেলাম ওদের দলে। তবে সেবার ছিল এক সাথে দুই শহর ভ্রমণ। কাশিন আর কালিয়াজিন। কালিয়াজিন ভল্গার তীরে হলেও কাশিন ভল্গা থেকে দূরে, কাশিন নদীর তীরে। কাশিন বাঁ দিক থেকে ভল্গায় পড়ে আর দুবনা ডান দিক থেকে। 

নদীর আবার ডান বাঁ কী?

বা রে, জান না নাকি?

না। বলুন শুনি।

নদীর স্রোতের দিকে মানে ভাঁটির দিকে তাকালে হাতের বাঁ দিকে যে তীর সেটা বাঁ পাড়, আর ডান দিকের তীর ডান পাড়। ঠিক রাস্তার মত।

সেটা আবার কী?

রাস্তায় দাঁড়িয়ে সামনে তাকিয়ে যদি দেখ হাতের ডান দিকের বাড়ির নম্বর ইভেন বা জোড় বুঝবে তুমি রাস্তার নীচের দিকে যাচ্ছ, মানে যতই সামনে যাবে বাড়ির নম্বর ততই বাড়বে। নদীর মত এটাও হব ভাঁটির দিক। নদী যেমন যতই ভাঁটির দিকে যায় তার দৈর্ঘ্য তত বাড়ে, রাস্তারও তাই, বাড়ির নম্বর বাড়ার সাথে সাথে রাস্তার দৈর্ঘ্য বাড়ে। আর আর যদি হাতের ডান দিকের বাড়ির নম্বরগুলো অড বা বিজোড় হত বুঝতে তুমি উজানে মানে সেন্টারের দিকে যাচ্ছ। তাই যদি কেউ রাস্তার ডান দিক বা বাঁ দিক বলে বুঝতে হবে সামনের দিকে তাকিয়ে হাতের ডান দিকে বাড়ির নম্বর ইভেন হলে সেটা হবে রাস্তার ডান দিক, আর অড হলে সেটা হবে বাঁ দিক।   যাকগে চল আমাদের গল্পে ফেরা যাক। তরঝকের মত কাশিন আর কালিয়াজিন শহর দুটোও ৎভেরস্কায়া অঞ্চলে। তরঝক ৎভেরের উত্তর-পশ্চিমে  আর কাশিন কালিয়াজিন উত্তর-পূর্বে। দুবনা থেকে তরঝক অনেক দূরে। সে তুলনায় কাশিনকালিয়াজিন দুটো শহরই বেশ কাছে আর প্রায় একই দূরত্বে অবস্থিত         

কাশিন আর কালিয়াজিন গেলাম ৩০ আগস্ট ২০১৪। এবার গেলাম একটা ট্যুর কোম্পানির সাথে। তবে পরিচিত অনেকেই ছিল। তরঝক যখন যাই আমাদের পথ ছিল কিম্রি থেকে ভেরের দিকে, এবার কিম্রি থেকে গেলাম উল্টো দিকে। বছরের এ সময় অলরেডি ঠাণ্ডা পড়ে যায়। বিশেষ করে সকালে আর সন্ধ্যায়। আগে থেকেই বলে দিয়েছিল কাশিন মিনেরাল ওয়াটারের জন্য বিখ্যাত। আসলে সেটা এমনিতেই জানতাম, কেননা কাশিন নামে মিনেরাল ওয়াটার বেশ জনপ্রিয়। যেহেতু এক্সারসনের একটা স্পট হবে কাশিন স্যানাটরিয়াম, তাই চাইলে ওখানে থেকে বোতলে করে জল আনা যাবে।

 

কাশিন ৎভেরস্কায়া অব্লাস্ত বা অঞ্চলের পুরনো শহর গুলোর অন্যতম। এর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১২৩৮ সালের বর্ষ লিপিতে। কাশিনে আমাদের এক্সারশন শুরু হল ভস্ক্রেসেনস্কি সাবর বা কাশিন ক্রেমলিন দিয়ে। এর সামনেই আন্না কাশিনস্কায়ার মূর্তি। বিশাল এই মঠে তখন মেরামতের কাজ চলছিল। রাশান চার্চগুলো বাইরে থেকে তেমন বড় মনে না হলেও ভেতরে ঢুকলে একেবারে ভিন্ন রূপ ধারণ করে। এখানে চাইলেই একেবারে চুড়ায় ওঠা যায়। জন্যে টিকেট কাটতে হয়। আগে রাশান চার্চে ছবি তোলা নিষেধ না থাকলেও ভক্তদের কেউ কেউ তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতেন। এখন ছবি তোলার জন্য আলাদা টিকেট কাটতে হয় ৫০ বা ১০০ রুবল দিয়ে। টাকা চার্চের মেরামত কাজে ব্যবহার করা হয়। এতে চার্চের যেমন লাভ আমাদের মত যারা ছবি তুলতে যায় তারা নিশ্চিন্তে ছবি তুলতে পারে। এটা এখন সব জায়গাতেই। মঠের  একেবারে উপরে রয়েছে বিশাল বিশাল ঘণ্টা। এত কাছ থেকে ঘণ্টা দেখার অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। তবে এটাও ঠিক সব প্রাচীন শহরে স্কাই স্ক্রাপারের আগমন এখনও ঘটেনি। তাই গির্জার চূড়া এটা একই সাথে পর্যবেক্ষণ ডেক। পুরো শহরটাই শুধু নয়, শহর ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায় এখান থেকে। নীচে কাশিন নদীর চলার পথ, বাজার, দোকানপাট, বনসে এক অপূর্ব দৃশ্য। নীল আকাশে সাবরের নীল চূড়া মিলেমিশে একাকার। এই প্রথম এত উপর থেকে, এত কাছ থেকে মঠের কুপলা বা চূড়া দেখলাম। সে এক অন্য ধরণের অভিজ্ঞতা। এই সাবরের উল্লেখ পাওয়া যায় ১৩৮০ সালের ক্রনিক্যালে। তখন সাবর ছিল কাঠের। পাথরের চার্চ তৈরি হয় ষোড়শ শতকের শুরুতে। বিভিন্ন সময়ে এই চার্চ পুনর্নির্মাণ করা হয়। বর্তমানের চার্চের কাজ শুরু হয় দ্বিতীয় ইয়েকাতেরিনার সময়। এর শেষ হয় ১৮১৭ সালে।  সোভিয়েত আমলে  এখানে ছিল কালচারাল সেন্টার বা দম কুলতুরি। আসলে অনেক চার্চের  কপালেই এমন দুর্দশা  ঘটেছিল। মনে আছে তোমার দনস্কায়া থেকে সেরপুখভস্কি ভাল হয়ে পাভ্লভস্কায়া যাওয়ার পথে খাভস্কায়ার চার্চের কথা। পেরেস্ত্রইকার সময় তো ওখানে ক্যাফে খোলা হয়। এর আগে ছিল গোডাউন। কয়েকবার সেখানে খেয়েছিও। যাহোক ২০০৯ সালে ভস্ক্রেসেনস্কি সাবর রাশান অর্থডক্স চার্চের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই সূত্র ধরেই এখন চলছে রিকনস্ট্রাকশনের কাজ। ২০০৯ সালেই এখানে স্থাপন করা হয় আন্না কাশিনস্কায়ার মূর্তি।       

এরপর আমরা যাই জেরুজালেম প্রবেশ চার্চে। এখানে কাশিনের আঞ্চলিক যাদুঘরও অবস্থিত। সেখান থেকে আমরা যাই স্যানেটরিয়ামে। যদিও রুশ দেশের লোকজন কিস্লাভোদস্ক, মিনভদ, এসেনতুকি সহ বিভিন্ন দক্ষিণের স্যানাটরিয়ামে যেতেই পছন্দ করে আবহাওয়ার কারণে, কাশিনে চিকিৎসা করতে বা রেস্ট নিতে আসা লোকের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। বিশাল এলাকা নিয়ে এই স্যানাটরিয়াম। সোভিয়েত আমলে সরকার থেকে এসব স্যানাটরিয়ামে আসার ব্যবস্থা করা হত, এখন কমার্শিয়াল টিকেটেও আসা যায়। আমাদের গ্রুপের মূল লক্ষ্য ছিল এখান থেকে জল সংগ্রহ করা। অনেকগুলো ট্যাপ থেকে জল পড়ছে। একেকটার স্বাদ একেক রকম। পাশে লেখা কোন ট্যাপের জল কোন অসুখে খেতে হয়।

কাশিনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মঠ হল ভজনেসেনস্কি ক্যাথেড্রাল। কিছুদিন আছে এর রিস্টরেশনের কাজ শেষ হয়েছে। ১৯৯৩ সালে সেখানে আনা হয়েছে রানী আন্না কাশিনস্কায়ায় মৃতদেহ বা মসি। এখানে উপাসনালয়গুলো তিনটি বিভিন্ন নামে পরিচিতকোনটা  সাবর বা ক্যাথেড্রাল বা মঠ, কোনটা ৎসেরকভ বা চার্চ বা গির্জা আর কোনটা খ্রাম বা টেম্পল বা মন্দির। এছাড়া আছে মনাস্তির বা মনাস্টেরি যেটাকে বলা যায় আবাসিক বিদ্যালয়। মনাস্তেরিতে মঙ্ক বা ধর্মকে যারা পেশা হিসেবে নেয় তারা বাস করে, সেখানেই তাদের শিক্ষা দীক্ষা, থাকা খাওয়া। ঠিক জানি না এসবের মধ্যে পার্থক্য কী, তবে এসব নামই ব্যবহৃত হয়।

ভসক্রেসেনস্কি ভজনেসেনস্কি ক্যাথেড্রাল ছাড়াও এখানে আছে ইলিনস্কো-প্রিওব্রাঝেনস্কি, রঝদেস্তভা খ্রিস্টভা, ক্রেস্তোজনামেসস্কায়া, পিটার-পাভেল আর ফ্লোরা-লাভর চার্চ।  আছে ক্লবুকভ, দ্মিত্রভস্কি আর স্ত্রেতেনস্কি মনাস্তির। এর বাইরেও আরও অনেক উপাসনালয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শহরের আনাচে কানাচে। সব মিলিয়ে বলা চলে কাশিন গির্জার শহর। কয়েক ঘণ্টা কাশিনের গির্জায় গির্জায় ঘুরে আমরা রওনা হলাম কালিয়াজিনের উদ্দেশ্যে।     


মস্কো থেকে ১৯১ আর তভের থেকে ১৬২ কিলোমিটার দূরে  কালিয়াজিন ভল্গার দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। আমার বিশ্বাস এখানে আমি এর আগেও গিয়েছি, মানে এর পাশ দিয়ে গিয়েছি। মনে হয় ১৯৮৮ সালে আমরা একটা রিভার ক্রুইজে গিয়েছিলাম ইয়ারস্লাভল থেকে মস্কো। পথে উগ্লিচ আর তভেরে অনেকটা সময়ের জন্য নেমেছিলাম। ইয়ারোস্লাভল, উগ্লিচ এসবই দুবনার ভাঁটিতে আর ভের উজানে। যেহেতু দুবনা আর উগ্লিচের মাঝে কালিয়াজিন তাই এখানে না গিয়ে আমরা পারিনি। তবে নামিনি।

কালিয়াজিন এক সময়ের রমরমা  জনপদ। এই শহরের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় দ্বাদশ শতাব্দীর দিনলিপিতে। পঞ্চদশ শতকে ভল্গার অন্য তীরে কালিয়াজিনস্কি-ত্রইস্কি বা মাকারেভস্কি মনাস্তির স্থাপনের পরে কালিয়াজিনের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।   ১৪৬৮ সালে আফানাসি নিকিতিন এখানে আসেন। তার বিখ্যাত দিনলিপি «খঝদেনিয়ে জা ত্রি মরিয়া» বা «তিন সাগর পেরিয়ে» গ্রন্থে এর  উল্লেখ আছে।  ১৬০৯ সালে কালিয়াজিনে মিখাইল স্কপিনা-শুইস্কির নেতৃত্বে গড়ে উঠে রুশ মিলিশিয়া যা কালিয়াজিনের উপকণ্ঠে পোলিশ-লিথুনিয় দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বিজয় লাভ করে। ১৭৭৫ সালে দ্বিতীয় ইয়েকাতেরিনার নির্দেশে কালিয়াজিন শহরের স্ট্যাটাস পায়। অষ্টদশ-উনবিংশ শতকে কালিয়াজিন গুরুত্বপূর্ণ বানিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। বছরে দুবার এখানে বিশাল মেলার আয়োজন হত। উনবিংশ তাব্দীর শেষ দিকে কালিয়াজিনে জাহাজ নির্মাণসহ বিভিন্ন শিল্প গড়ে ওঠে। তবে সোভিয়েত আমলে কালিয়াজিনের অবস্থার অবনতি ঘটে। ১৯৩৯১৯৪০ সালে উগলিচ হাইড্রোইলেক্ট্রিক স্টেশন তৈরি করার জন্য শহরের এক বিরাট অংশ সলিল সমাধিতে নিমগ্ন করা  হয়। এক সময় বিভিন্ন চার্চের জন্য বিখ্যাত শহরের এখন সবচেয়ে দর্শনীয় বস্তু হল বেল টাওয়ার বা চ্যাপেল। ভল্গার দক্ষিণ পাড় থেকে পঞ্চাশ মিটার মত দূরে নদীর বুক থেকে সে উঁকি দিচ্ছে। শীতে, ভল্গা যখন জমে যায়, ওখানে হেঁটে যাওয়া যায়, অন্য সময় লঞ্চে করে মানুষ এর কাছে যায় অথবা তীর থেকে দেখে। কালিয়াজিনের বিভিন্ন চার্চ ঘুরে আমরা সেখানে গেলাম লঞ্চে। আর সব শেষে এলাম ভল্গার দক্ষিণ তীরে। এখান থেকেই লোকজন বেল টাওয়ারের ছবি তুলে। আমরা এখানে আসার কয়েক মিনিটের মধ্যে শুরু হল বৃষ্টি। মাত্র কয়েকটি ছবি নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। সত্যি বলতে কি, এখান থেকে ছবি তুলব বলেই এই এক্সারশনে আসা। মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু বাসায় ফিরে যখন ছবি এডিট করলাম আর কয়েকটি ফটো সাইটে সেটা আপলোড করলাম মন ভালো হয়ে গেল। বৃষ্টির কারণে আমাদের গ্রুপের লোকেরা দাঁড়িয়ে ছিল ছাতা মাথায়। সব মিলিয়ে পরিচিত জায়গার এক ভিন্ন রকমের ছবি যা চাইলেই পাওয়া যায় না।  

সোভিয়েত আমলে বিদেশীদের শুধু বিদেশী কেন নিজেদের দেশের লোকজনের ভ্রমনের অধিকার ছিল হাতে গনা কিছু জায়গায়। ফর্মালি মানা না থাকলেও এসব শহরের বাইরে কেউ যেত না বা যেতে পারত না বিভিন্ন কারণে। তাই এ রকম কিছু শহর সাজানো  গোছানো থাকলেও এক সময়ের বানিজ্য ও ধর্মীয় কেন্দ্রগুলো ছিল অবহেলিত। শুধু মাত্র এসব জায়গা ঘুরতে গেলে বোঝা যায় ধ্বংসের স্কেল। এটা ভালো না মন্দ সেটা বলব না। তবে এটা বাস্তব চিত্র। আগেই বলেছি যেকোনো কিছুকে বিচার করতে হলে তার ভালোমন্দ সবই দেখতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন বলি আর জার রাশিয়া বলি অথবা নতুন রাশিয়া বলি – রুশ সমাজ, রুশ ইতিহাস জানতে চাইলে আমাদের সব দিকেই তাকাতে হবে। জারের আমলে সব খারাপ ছিল এই সোভিয়েত প্রোপ্যাগান্ডা যেমন বর্জনীয়, সোভিয়েত ব্যবস্থায় সব ভালো সেটাও ঠিক নয়। একই ভাবে যারা বলে সোভিয়েত সমাজে সব খারাপ তারাও বোকার স্বর্গে বাস করে।  রাজনৈতিক বা অন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন, কোন দেশ বা সমাজ সম্পর্কে এক চোখা  বিচার বিশ্লেষণ সাময়িক ভাবে মুনাফা জোটালেও দীর্ঘ মেয়াদী বিচারে যারা এটা করে তাদের অজ্ঞতার আর  মূর্খতার বোঝা ভারী হয়। দুদিন আগে হোক আর দুদিন পরে হোক এই অজ্ঞতা, এই মূর্খতা বুম্যেরাং হয়ে ফিরে আসে।        
    

দূরে দেখা যাবে তাজমহলের মিনার। এই সেই আগ্রা। অভির চোখের সামনে ভেসে উঠবে দেশে শোবার ঘরের ছবি। সেখানে বিভিন্ন দেব দেবতার ছবির পাশাপাশি ছিল তাজমহলের ছবিও।

 

http://bijansaha.ru/albshow.html?tag=131

http://bijansaha.ru/albshow.html?tag=108 

http://bijansaha.ru/albshow.html?tag=97





Comments

Popular posts from this blog

সোভিয়েত থেকে রাশিয়া

কাজান

আগ্রা মথুরা বৃন্দাবন