কাজান
(৩১)
গাড়ি ছুটছে দিল্লির পথে। চারিদিকে অন্ধকার। বাসে প্রায় সবাই
ঘুমিয়ে পড়েছে। অভির মানসচক্ষে ভেসে উঠছে বাদশাহী আমলের দিনগুলো। রাজপুত্র রাজকন্যারা
ঘুরে বেড়াচ্ছে আরাম বাগে। তানসেন মাতিয়ে তুলছেন জলসা। আকবর বাদশা মোল্লাজি দোপেয়াজার
কাছে জানতে চাইছেন তাঁর রাজ্যে কাকের সংখ্যা। অভি ভাবছে বাদশাহ আকবর যদি সুবাহ বাংলায়
বর্তমান কাকদের কথা জানতেন তিনি মিছিমিছি সেনাপতি মান সিংহকে এ মুল্লুকে পাঠাতেন না
বারো ভূঁইয়ার সাথে যুদ্ধ করতে।
অভি দা, কাজানের গল্প শোনান। - কানের কাছে ফিস ফিস করে বলল
দুলাল।
শোনাবো নিশ্চয়ই। তবে তার আগে আমরা কেন নিজেদের ভারতীয় ভাবতে,
নিজেদের ভারতীয় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারি ভাবতে দ্বিধা করি এ নিয়ে দুটো কথা বলে নিই। এটা
আমার মনে হয় ভারতবর্ষের বর্তমান পরিস্থিতিতে খুবই সময়োপযোগী।
বলুন।
আজকাল ধর্ষণ ও পোশাক নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। এটা অবশ্য নতুন কিছু
নয়। নিজের অক্ষমতা অন্যের ঘাড়ে চাপানোর ইচ্ছা থেকেই এসব বলা। এসব শুনে আমার মনে বেশ
কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হয়। এদেশের অধিকাংশ মানুষ মনে হয় নিজেদের হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী
সভ্যতার উত্তরসূরি মনে করে না। ইসলামের বহু আগেই পৃথিবীতে বিভিন্ন সভ্যতা বিরাজমান
ছিল। মিশর, মেসপটেমিয়া, গ্রীক, রোমান, চীনা, ভারতীয় - কত কী! এমন কী আর্যরা ভারতে আসার
আগেও এখানে ছিল উন্নত নগর সভ্যতা হরপ্পা আর মহেঞ্জোদারোতে। আমরা কি সেই সভ্যতার উত্তরসূরি
নই? বা পরবর্তী যুগে ভারতবর্ষে বিভিন্ন জাতির সংমিশ্রনে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছে তার? তাই
যদি হয় তাহলে কী প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য সংস্কৃতি আমাদের পথ দেখাতে পারে না? ছোটবেলেয়ায়
মহাভারত সহ বিভিন্ন প্রাচীন শাস্ত্রে বিভিন্ন গল্প পড়েছি। বৌদ্ধ শাস্ত্রেও এসব আছে।
প্রহ্লাদ, রাবন থেকে শুরু করে গৌতম বুদ্ধ পর্যন্ত অনেকেই যখন ঈশ্বরের সাধনায় ব্যস্ত
কত ধরণের খাবার-দাবার আর সুন্দরী নারীদের তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে তপস্যা ভঙ্গের জন্য।
পৃথিবীতে লোভ সব সময়ই ছিল, সেটা সম্বরণ করাই সাধকের কর্তব্য। এটাই তার পরীক্ষা। একজন
ভালো ছাত্র কি নকল করে? তাই নিজের লোভকে সম্বরণ না করে যারা পোশাকের দোহাই দেয় তারা
আর যাই হোক সাধক নয়, সবচেয়ে লোভী আর হীনমনস্ক। যারা নিজেদের লোভ সামলাতে পারে না তারা
সমাজে বাস করে কেন? নির্জন দ্বীপে চলে গেলেই তো পারে। যে আদর্শ নিজের দোষত্রুটি সংশোধন
না করে প্রতিপক্ষ নিধনের মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের কথা বলে সেটা আর যাই হোক
মানবিক ও মানসিক ভাবে উৎকর্ষ হতে পারে না। যারা নিজেদের লোভ লালসাকে দমন করতে পারে
না তারা অন্যেরা কি পরল না পরল তা নিয়ে কথা
বলার আগে চারপাশে সেসব মানুষ ছিন্ন বস্ত্রে দিন কাটাচ্ছে তাদের পাশে দাঁড়ালেই তো পারে।
সেটা করবে না, কারণ অন্যের ভালো করা তাদের স্বভাবজাত নয়। তাদের সমস্ত পড়াশুনা, সমস্ত
বই পুস্তকের রেফারেন্স হয় অন্যদের সমালোচনা করার জন্য, নয়তো নিজেদের অন্যায়, অপরাধকে
জাস্টিফাই করার জন্য। যে ধর্ষিতা হল, যে অন্যায়ের শিকার হল তার পাশে না দাঁড়িয়ে তারা
ধর্ষকের জন্য রক্ষা কবচ খুঁজে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন পুস্তকের রেফারেন্স টানছে। এতে করে
তারা কি সেসব পুস্তককেই বিতর্কিত করছে না? এভাবে তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে কি ধর্ষণের
দর্শন প্রচার করছে না? যতদিন পর্যন্ত সমাজ এদের ঘৃণার চোখে না দেখবে, রাষ্ট্র এদের
আইনের আওতায় না আনবে, ধর্মের নামে খুন, ধর্ষণ, ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার ডাক দেওয়াকে অপরাধ
হিসেবে গন্য করে আইন প্রয়োগ না করবে অবস্থার উন্নতি ঘটবে না। আর এসব হচ্ছে এ জন্যে
যে আমরা নিজেদের অতীত ভুলে, নিজেদের ঐতিহ্য ভুলে বিস্মৃতির অতল জলে ডুবে আছি। তুমি
যখন প্রশ্ন করেছিলে ভারতবর্ষ গঠনে মুসলিম শাসকদের অবদানের কথা এর উত্তর এখানেই। সবার
প্রচেষ্টায় গড়া এই দেশ থেকে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, শিখ, পারসিক, খৃস্টান – কারও অবদানকে
আলাদা ভাবে দেখতে পার না। আমরা কি কোলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই বাদ দিয়ে এখন ভারতের কথা
কল্পনা করতে পারি? যদি না পারি তাহলে ইংরেজদের অবদান অস্বীকার করব কিভাবে? আমাদের বুঝতে
হবে এই উপমাহাদেশ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষ একেকটা
ইটের মত। তুমি যদি কোন এক ধরণের ইট বেছে বের করতে চাও পরিণামে দালানটাই ভেঙ্গে পড়বে।
সবাই অসম্পূর্ণ আইডেন্টিটি নিয়ে জীবন কাটাবে। আজকে আমাদের দেশে দেশে যে সামাজিক সমস্যা,
সংস্কৃতির সমস্যা – তার মূল এখানেই – আমরা দেশই ভাঙ্গিনি, আমাদের অতীত, আমাদের সাহিত্য,
সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্য এ সবও ভাগাভাগি করতে শুরু করেছি। যাকগে, চল এখন কাজানের পথে
পা রাখি।
আমরা যারা সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশুনা করতে গেছি তাদের কাছে কাজানের
অন্যতম পরিচয় ছিল ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ মানে লেনিন কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন আর
বিপ্লবী কাজকর্মের জন্যে বহিষ্কৃত হন। যেন এটাই কাজানের অন্যতম প্রধান ঘটনা। কাজান
ইউনিভার্সিটির মূল ভবনের সামনে, ক্রেমলভস্কায়া রাস্তার উল্টোদিকে সেই ভবনের দিকে মুখ
করে দাঁড়িয়ে আছেন লেনিন। তবে আমাদের দেখা অভ্যস্ত লেনিন নন, ছাত্রাবস্থার লেনিন। হয়তো
এক সময় এটা ছিল কাজানের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এখন মাঝে মধ্যে অবশ্য এর চারিদিকে যে
বেঞ্চগুলো আছে সেখানে ছাত্রছাত্রীরা আড্ডা দেয়, তবে লেনিনের দিকে মনে হয় ফিরেও তাকায়
না। কিন্তু কাজানের ইতিহাস অনেক পুরনো। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী কাজানের এক বয়স হাজার বছরের বেশি।
কাজানকা আর ভোলগা নদীর তীরে অবস্থিত কাজান তাতারস্তানের রাজধানী। কথিত আছে প্রাচীন কালে কাজানকা নদীর তীরে ব্যবসায়ীরা বিরিয়ানী রান্না করে খেত। বিরিয়ানী রান্না করার পাত্রের নাম ছিল কাজান। সেখান থেকেই কাজান নামের উৎপত্তি।
তোমার মনে আছে তাতার-মঙ্গোলীয় ইগো মানে জোয়ালের কথা? ভাবছ জোয়াল কেন? বলদের কাঁধে জোয়াল চাপিয়ে
কৃষক যেমন কাজ করিয়ে নেয়, তাতার-মঙ্গোলেরা এক সময় রুশদের কাঁধেও খাজনার জোয়াল চাপিয়ে দিয়েছিল, তাই এ নাম। অবশ্য এ নিয়ে বিভিন্ন মত আছে। ট্র্যাডিশনাল ইতিহাস এটা বললেও ফোমেঙ্কো, গুমিলিয়েভ একটু অন্যভাবে ঘটনাগুলো বর্ণনা করেন। ফোমেঙ্কো এক্ষেত্রে সাহায্য নেন ম্যাথেম্যাটিক্যাল মডেলের, গুমিলিয়েভ এথনোগ্রাফি বা নৃতত্ত্বের। এক সময় এ এলাকায় বুলগারদের শক্তিশালী রাজত্ব ছিল। সেটা ছিল কাজান থেকে ভাটিতে। পরে ওরা এ এলাকা থেকে বলতে গেলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ওদের এক দল পরে অধুনা বুলগেরিয়ায় বসবাস করতে শুরু করে। বর্তমানে বুলগার নতুন করে গড়ে তোলা হচ্ছে। তবে সে গল্প এখানে নয়। এক সময় কাজানের খানেরা মস্কোসহ বিভিন্ন রুশ রাজ্যের উপর খবরদারী করলেও ইভান গ্রজনির সময় থেকে স্রোত উল্টো দিকে বইতে শুরু করে। ইভান গ্রজনি তাঁর দলবল নিয়ে আসেন কাজান দখল করতে। প্রথমে তাঁরা ঘাঁটি গাড়েন যমেইনায়া গারা বা সাপের পাহাড়ে। ২০০৯ সালে সেখানে গেছিলাম একটা কনফারেন্সে যোগ দিতে গিয়ে। ঐ সময় এই কনফারেন্সগুলো হত ইয়ালচিক
নামে এক হ্রদের তীরে, পাইনীয়ার লাগেরে বা ক্যাম্পে। কাজান থেকে প্রায় সত্তর কিলোমিটার
দূরে অবস্থিত এই জায়গাটা মারি-এল রিপাবলিকের অন্তর্গত। পরে কোন এক দিন সময় করে সে গল্প করা যাবে। যা হোক
সাপের পাহাড়ে কিছুদিন কাটিয়ে
দলবল নিয়ে তিনি আসেন ভোলগার তীরে সভিয়াঝেস্ক নামে এক জায়গায়। ভোলগার বুকে এই দ্বীপে এখন কতগুলো গির্জা শোভা পাচ্ছে। ইভান গ্রজনিই এখানে প্রথম গির্জা তৈরি করেন। খুব সুন্দর জায়গা। সেখানে গেছিলাম ২০১৪ র সামারে। যাহোক
সেখান থেকে তিনি বলতে গেলে কাজান অবরোধ করেন ১৫৫২ সালে। আসলে সেসব দিনকালে নদী ছিল
অন্যতম তো বটেই একমাত্র যোগাযোগের উপায়। তাই কোথাও যদি নদী অবরোধ করা হত, তাহলে আশেপাশের
শহর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। যদিও কাজানের খানদের সাথে মস্কোর সম্পর্কের টানাপোড়ন শুরু হয় ১৪৬০ সালে তবে রুশদের কাজান জয়ের অভিযান শুরু
হয় অনেক পরে। ১৪৮৭, ১৫২৪, ১৫৩০ ও ১৫৫০
সালের পরে ১৫৫২ সালে রুশদের কাজান জয়ের এ চেষ্টা ছিল পঞ্চম অভিযান। সে সময়ে কাজান ছিল দুই আগুনের মধ্যে। চেঙ্গিস খান ও তাঁর উত্তরসূরিরা এক সময় প্রায় সমস্ত দক্ষিণ রাশিয়া পদানত করেন। তখন মস্কো বলতে গেলে ছিলই না। কিয়েভ থেকে শুরু হয় রুশ সাম্রাজ্যের যাত্রা। এখানেই ৯৮৮ সালে আলেগ খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তাঁর বংশধরেরা ভ্লাদিমির, সুজদাল, নভগোরাদ ইত্যাদি জনপদ স্থাপন করে রাজত্ব শুরু করেন। এক সময় ভ্লাদিমির, সুজদাল এসব তাতার ও মঙ্গোলদের অধীনস্ত হয়। কিন্তু ইভান গ্রজনির সময়ে মস্কো নিজেকে শক্তিশালী রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলে। কাজান, বুল্গার এসব রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে অবশ্য এসব রাজ্য ইসলাম গ্রহণ করে মস্কোর খৃস্টান রাজ্যের বিরুদ্ধে। তখন ক্রিমিয়ার তাতারেরাও ছিল বেশ শক্তিশালী ও কাজানের খানদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কে আবদ্ধ। কাজানে মস্কোপন্থী আর ক্রিমিয়ার তাতারপন্থী গ্রুপ ছিল একই রকম শক্তিশালী। আর এই দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বই কাজানের কাল হয়। ইভান গ্রজনি যাত্রা করেন কাজান বিজয়ে। কাজান বিজয় ইভান গ্রজনির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কেননা এই বিজয় পরবর্তীতে আস্ত্রাখান জয়ের দুয়ার খুলে দেয়। যদিও ইভান গ্রজনির কাজান জয় ছিল দীর্ঘ ও সুপরিকল্পিত রণকৌশলের ফল তবে এর চেয়েও বেশি জনপ্রিয় লোককথা। যাহোক সে সময়ে কাজানের খান ছিলেন নাবালক শিশু, তাঁর হয়ে রাজকার্য চালাতেন তাঁর মা সিউউম্বিকে। কথিত আছে কাজানের খানেরা তখন বিস্তীর্ণ স্তেপে যেসব যাযাবর জাতি বাস করত তাদের সুন্দরী মেয়েদের বিয়ে করে রানী করতেন। তবে রাজপ্রাসাদের অন্তঃকলহের এরা এসব বিয়ে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করত। সিউউম্বিকে ছিলেন ভিন্ন রকমের। তিনি ভয় না পেয়ে এ গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন এবং জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাই তাঁকে কৃষকের রানী বলা হত। সেই যুদ্ধে কাজান পরাজিত হয়, সিউউম্বিকে বন্দী হন। তাঁকে মস্কো নিয়ে আসা হয় ও পরবর্তীতে কাসিমভের মস্কোপন্থী খান আলী শাহের সাথে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়।
তবে লোকমুখে পাওয়া যায় ভিন্ন ইতিহাস। সেই লিজেন্ড অনুযায়ী ইভান গ্রজনি সিউউম্বিকেকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিলে তিনি বলেন যদি ইভান গ্রজনি সাত দিনের মধ্যে কাজান ক্রেমলিনে সুউচ্চ টাওয়ার তৈরি করে নিজের ভালোবাসার প্রমাণ দিতে পারেন তবেই তিনি আত্মসমর্পণ করবেন। রুশ জার ইতালীর শিল্পীদের দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে টাওয়ার তৈরি করেন। তখন রানী সিউউম্বিকে টাওয়ার থেকে লাফিয়ে আত্মবিসর্জন দেওয়া শ্রেয় মনে করেন।
বর্তমানে এই টাওয়ার সিউউম্বিকে টাওয়ার নামে পরিচিত। মজার ব্যাপার হল বাস্তবে এই টাওয়ারটি
তৈরি করা হয় কাজান বিজয়ের বেশ কয়েক বছর পরে।
ইতিহাস তো শুনলাম, এবার আপনার কাজান ভ্রমনের অভিজ্ঞতা বলুন।
আমার কাজান প্রথম যাওয়ার অভিজ্ঞতা বেশ বাজে। সেটা ২০০৭ সাল।
যাচ্ছি একটা কনফারেন্সে। ট্রেন স্টেশনে আমাদের মিট করে নিয়ে গেল অদুরেই একটা ইনস্টিটিউটে।
পরে জানলাম এটা পেডাগগিক্যাল ইনস্টিটিউট। বলা হল ঘণ্টা দুই পরে আমরা রওনা হব ইয়ালচিকের
উদ্দেশ্যে।
ইয়ালচিক কি? এটা কোথায়?
ইয়ালচিক একটা লেকের নাম। এটা কাজান থেকে প্রায় সত্তর কিলোমিটার দূরে মেরি এল রিপাব্লিকে।
সেখানে এই ইনস্টিটিউটের সামার ক্যাম্প। এটা ছিল সেপ্টেম্বর মাস। ক্যাম্প ফাঁকা। ওখানেই
আমাদের কনফারেন্স। তাই তখন কাজান দেখা হয়নি। তাছাড়া ছিল বৃষ্টি। সেপ্টেম্বরে যেটা হয়। রাস্তাঘাট মেরামতের কাজ চলছে, চারিদিকে ভাঙ্গা দালানকোঠা।
মনে হল মধ্য যুগে ফিরে
এলাম। পরে শুনেছি সেটা ছিল ২০১২ সালে ইউনিভারসিয়াডের প্রস্তুতির জন্য এই কর্ম যজ্ঞ। ও হ্যাঁ ইয়ালচিক সম্পর্কে দু' কথায় বলা যাবে না, পরে সময় করে সে গল্প শোনাবো। এরপরে কাজান যাই ২০০৯ আর ২০১০ সালে। এ দুবারই ইয়ালচিকের পথে কাজানে কয়েক ঘণ্টার অবস্থান। ২০১২ সাল থেকে আমাদের কনফারেন্সের ঠিকানা বদলে যায়। আমরা এরপর থেকে ৫-৬ দিন কাজানেই কাটিয়েছি, ঘুরেছি অনেক। এক সময় কাজান শহরটাকে ভালবেসে ফেলেছি। তবে এটা ঠিক আমরা মূলত থাকি কাজান ক্রেমলিন থেকে দু কিলোমিটার দূরে, তাই কনফারেন্সের সেশনগুলোর পরে যে সময় থাকে তাতে ওর আশাপাশ দিয়েই ঘোরাফেরা হয়। মস্কোয় যেমন আরবাত, কাজানে তেমনি আছে বাউমেন স্ট্রিট। প্রচন্ড সুন্দর হাঁটা রাস্তা। সব সময় লোকে লোকারণ্য, ফেস্টিভ মুড। যেন মেলা বসে আছে সারা দিনমান। ওখানে বিভিন্ন পুরনো বাড়িঘর ছাড়াও আছে চ্যাপেল, পাশেই বিখ্যাত রুশ গায়ক শালিয়াপিনের ভাস্কর্য। কথিত আছে শালিয়াপিন এখানে ভর্তি হতে এসে টেস্টে ফেল করেন আর ম্যাক্সিম গোর্কি চান্স পান। এই ভাস্কর্যের পাশেই শালিয়াপিন হোটেল। এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাওয়া যায় ক্রেমলিনে। অন্যদিকে একটা ব্যস্ত রাস্তা পার হলে দেখা যাবে এক বিশাল দোকান, নাম রিং বা কালতসো, অনেকটা মস্কোর গুম বা ৎসুমের মত। এরপাশেই আবার হাঁটা রাস্তা। নাম পিটারসবারগ স্ট্রিট। ২০০৫ সালে কাজান যখন হাজার বছর পূর্তি উৎসব পালন করে তখন পিটারবারগ এই রাস্তা উপহার দেয়। দেখার মত। অনেকটা পিটারবারগের রাস্তাঘাটের অনুকরণে তৈরি। আরেকটা জিনিস যা না বললেই নয় তা হল মসজিদ আর গির্জার ব্যাপকতা। প্রায়ই পাশাপাশি দেখতে পাবে এদের। সমস্ত তাতারস্তানে কিনা জানিনা, তবে কাজানে মুসলিম আর খৃস্টান প্রায় সমান সমান। যদিও এক সময় তাতার জাতি ইসলাম গ্রহণ করে, রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরে অনেকেই খৃস্টান হয়ে যায়। ফলে শহরের প্রতি পদে পদে দেখা যায় মসজিদ আর গির্জা। এমনকি ক্রেমলিনের ভেতরের আছে বিশাল গির্জা আর মসজিদ। গির্জা অনেক পুরনো, তবে বর্তমান মসজিদ নতুন রাশিয়ায় তৈরি, তুরস্কের সাহায্যে। এর নাম কূল শরীফ। এটা মসজিদ কাম মিউজিয়াম, মানে যে কেউ সেখানে ঢুকে স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে। তবে মেয়েদের মাথায় কাপড় দিতে হয় যেমনটা করতে হয় গির্জায় ঢোকার সময়।
কাজান ক্রেমলিন দাঁড়িয়ে আছে কাজানকা নদীর তীরে। নদীর অন্য দিকে এখন «আক বারস» নামে কাজানের নামকরা ক্লাবের স্টেডিয়াম। সেখানে আছে কাজানকা বা বিরিয়ানি রান্নার পাত্রের আকারে তৈরি এক স্থাপত্য যেখানে বিয়ের রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করা হয়। এর উপরে উঠলে পুরো কাজান শহর দেখা যায়। সে এক অপরূপ দৃশ্য। ক্রেমলিন থেকে হেঁটেই যাওয়া যায় ওপাড়। আবার চাইলে মেট্রো করে যাওয়া যায়। ওখান থেকে ক্রেমলিনের দিকে তাকালে হাতের বাঁ দিকে কিছু বিশাল বিশাল চার্চ চোখে পড়ে। তাদের একটাতেই একসময় ছিল বিখ্যাত কাজানের মেরি মাতার আইকন। এখন সেই গির্জা নতুন করে মেরামত করা হচ্ছে। এই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গেলে পড়ে সুন্দর সুন্দর বাড়িঘর। এখানে কাজানের ধনীদের আবাস। লোকমুখে এ জায়গা কাজানের রুবলোভকা নামে পরিচিত। কাজানকা থেকে বাউমেন স্ট্রীটের সমান্তরালে চলে গেছে একটা খাল মত সেটা গিয়ে পড়েছে কাবান নামে এক লেকে। লেকের পাশেই সুইমিং পুল, থিয়েটার, সুস্বাদু খাবারের রেস্তোরাঁ আর বেশ কিছু পুরনো মসজিদ। কাজানের খাবার আমাদের জন্য বেশ চলনসই, চাকচাক নামে মোয়া জাতীয় একটা জিনিস পাওয়া যায়। একবার তো খুব আগ্রগ করে ঘোড়ার মাংস খেলাম, কিন্তু তেমন পছন্দ হয়নি। একবার ছিলাম ইউনিভার্সিটি হোস্টেলে। ইউনিভারসিয়াডের পরে এসব সম্পূর্ণ নতুন রূপ পেয়েছে। জায়গাটা অবশ্য শহরের উপকণ্ঠে। ওখানে গেলে সাধারণত রুস্তামের সাথে যোগাযোগ করি। ও স্থানীয়। আমার দু বছরের সিনিয়র হলেও আর্মি থেকে ফিরে আমাদের সাথেই ভার্সিটি শেষ করে। আমার ২ নম্বরের ৫১০ নম্বর রুমে প্রায়ই আড্ডা দিত।
গণিতে শেষ করেছে। এখন অবশ্য ব্যবসা করে। ও সময় পেলে আমাকে কাজান ঘুরিয়ে দেখায়। মস্কো আর পিতেরবুরগের পর রাশিয়ার তৃতীয় শহর হিসেবে কাজান নিজেকেই দাবী করে, যদিও নিঝনি নভগোরাদ, যা সোভিয়েত আমলে গোর্কি নামে পরিচিত ছিল, এই দাবীকে প্রায়ই চ্যালেঞ্জ করে।
মস্কোয় এক সময় প্রচুর যুবক-যুবতী বিয়ার হাতে ঘুরত। অনেক সময় ওদের দল বেঁধে আসতে দেখলে ভয় লাগত। এখন অবশ্য সেটা দেখা যায় না, জরিমানা করে। তবে ২০০৭ সালে যখন কাজান যাই সেটা দেখিনি। শত হলেও মুসলিম প্রধান এলাকা অথবা হতে পারে যাকে বলে প্রাচ্যের শিক্ষা। তবে
ইউনিভারসিয়াডের পর কালচারটা বেশ বদলে যেতে দেখেছি। তারপরেও কাজানে গিয়ে রাতবিরাতে চলাফেরা করতে কোন রকম অস্বস্তি অনুভব করি না। এখন অবশ্য মস্কোয়ও আমি রাত বারোটা একটার দিকে মেট্রোতে ঘুরি। যাহোক, ওখানে এখন অনেক পরিচিত। কনফারেন্সের আয়োজকরা সবাই অমায়িক। তাই যখনই ওখানে থেকে ডাক আসে, আমি দ্বিধা না করে চলে যাই।

Comments
Post a Comment