ছোটবেলা
(১)
অনেক দিন আগে এক গাঁয়ে দুলালের জন্ম। এখন তাকে আর অজ পাড়াগাঁ বলা যায় না, তবে আজ থেকে অর্ধ শতাব্দী আগে এটা অজ পাড়াগাঁই ছিল। ঐ সময় আসলে এ অঞ্চলের অধিকাংশ গ্রামই ছিল এ রকমের। শুধু মাত্র বড় রাস্তার (হাই ওয়ে) পাশের বা বড় নদীর ধারের গ্রামগুলো এ বিশেষণ মুক্ত ছিল। অন্য গ্রামগুলো ছিল সভ্যতার থেকে অনেক দূরে। বর্ষাকালে নৌকা পথে সেখানে যাওয়া গেলেও শুকনো মরসুমে নিজের চরণ যুগলই ছিল একমাত্র ভরসা। মাঝেমধ্যে ভাগ্য অনুকূলে থাকলে অবশ্য গরুর গাড়িতে পা ঝুলিয়ে বসে সেখানে যাওয়া যেত, তবে সেটা ঘটত কালেভদ্রে। এমনই এক অজ পাড়াগাঁয়ে দুলালের জন্ম, বেড়ে ওঠা। শিশুকাল তার কেটেছে গাঁ সংলগ্ন বিশাল মাঠের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আর ঐ যে অনেক দূরে যেখানে আকাশটা টুপ করে নেমে এসেছে মাঠের সবুজে, বড় হয়ে সে সেখানে যেতে পারবে কিনা এই ভেবে। শীতের শেষে তার সময় কাটত আদিগন্ত বিস্তৃত মাঠে হলুদ রঙের সর্ষে ফুল দেখে। সে সময় সে অবশ্য চোখে সর্ষে ফুল দেখার একটাই মানে জানত – আর তা ছিল মাঠের পরে মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা হলদে আর সোনালী সর্ষে ফুলের সোনা ঝরা হাসি আর ভাবত এটাই তার সোনার বাংলা।
দুলাল ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সে সেময় অবশ্য মধ্যবিত্ত বলতে তাদেরই বোঝান হত যাদের ছিল কিছু জমিজমা বা গ্রামের বাজারে ছোটোখাটো একটা দোকান, দু’ একটা গরু, যে বাড়ির ছেলেমেয়েরা বাড়ির কাজের ফাঁকে স্কুলে যেত। অল্প জমি আর ছোটোখাটো ব্যবসার মত তাদের স্বপ্নগুলোও ছিল ছোট ছোট। ছেলেমেয়ে একটু লেখাপড়া শিখবে, মেয়েদের ভালো পাত্রে বিয়ে হবে, ছেলেরা বড় হয়ে বাড়ির ছোট ব্যবসায়ের দায়িত্ব নেবে। যদি ভাগ্যে থাকে কোনমতে বি.এ. পাশ করবে। তখন ছেলে বি.এ. পাশ মানে এক বিশাল ব্যাপার।
দুলালও অবশ্য তখন এসব নিয়ে ভাবত না। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সম্পর্কে তার তখন কোন ধারণা ছিল না বললেই চলে। আসলে ইঞ্জিনিয়ার শব্দটাই সে জানত না। অসুখ বিসুখ হলে নিম পাতা, চিরতা বা পাট পাতার জলই ছিল প্রথম ও প্রধান ওষুধ। কখনও বা হলুদ বাটা। অবস্থা একটু গুরুতর হলে পাড়ার কবিরাজ বা পাশের বস্তির ফকির আসত ঝাড়ফুঁক করতে। কালেভদ্রে কয়েক গ্রাম পেরিয়ে আসতেন রেবতী ডাক্তার তার ভাঙ্গা সাইকেলে চড়ে। এসেই চাইতেন এক কাপ চা। দুলালদের বাড়িতে এমনিতে চা খাওয়ার রেওয়াজ ছিল না। দুলালের মনে হত শুধু মাত্র রেবতী ডাক্তারের জন্যই ওদের বাড়িতে চা রাখা হয়। বুড়ো রোগা মানুষটা দুলালের পেটে কান পেতে শব্দ শোনার চেষ্টা করতেন। আসলে ওনার কান থেকে যে নলটা ঝুলত (দুলাল পরে জেনেছে সেটার নাম স্টেথোস্কোপ) সেটা শরীর স্পর্শ করা মাত্রই দুলালের সুড়সুড়ি শুরু হত আর ও হেসে একেবারে কুটিপাটি। তাই এই ব্যবস্থা। কখনও নাড়ি দেখতেন আবার কখনও নিজের জিহ্বা দিয়ে ওর জিহ্বা ছুঁয়ে দেখতেন। এতে সিগারেট আর মুখের দুর্গন্ধ সব মিলিয়ে দুলালের সে যে কী অবস্থা! আর সব শেষে ছিল যত রকমের তেতো ওষুধ। তাই ডাক্তার কখনই দুলালের মনে দাগ কাটেনি। আর যাই হোক দুলাল ডাক্তার হতে চায়নি।
Comments
Post a Comment