(২)
প্রাইমারী স্কুলে পড়ার সময় দুলালের অবসর সময় কাটত পাড়ার ছেলেদের
সাথে ডাংগুলি, দাড়িয়াবান্ধা এসব খেলে। ফুটবল যে খেলত না তা নয়। তবে পা দিয়ে
লাথি মারত বলেই এর নাম ছিল ফুটবল। আসলে সেটা বল ছিল না। পাড়ার বিধবার
বাড়ি থেকে চুরি করা জাম্বুরা বলের অভিনয় করত। কখনও কখনও
মাঠে যেতে হত গরু চড়াতে, কখনও বাবার জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে যেতে হত মাঠে বা দোকানে। এক কথায় দুলালের শৈশব ছিল গাঁয়ের আর দশটা ছেলেরই মত।
হাই স্কুলে পড়ার সময় দুলাল যেন নতুন জগৎ আবিষ্কার করল। হাই স্কুল
ছিল গ্রাম থেকে কয়েক মাইল দূরে, দু’ দুটো ছোট গ্রাম পেরিয়ে। এখানে নিজের
গ্রামের ছেলেমেয়েরা ছাড়াও আশেপাশের গ্রামের অনেকেই পড়াশুনা করে। এই প্রথম পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি নতুন বন্ধুদের কাছ থেকে দুলাল
জানতে পারে নতুন গ্রামের গল্প। সেখানকার
জীবনযাপন, সেখানকার রাস্তাঘাট নিজের গাঁয়ের মত হলেও তাতে কী যেন একটা রহস্যের গন্ধ
ছিল। দুলাল তখন বুঝত না আসলে তার জানার সীমানা
এভাবে একটু একটু করে বিস্তারিত হচ্ছে, আর নতুন জ্ঞান তাকে আরও নতুন কিছু জানার জন্য
আগ্রহী করে তুলছে। আসলে বইয়ের বাইরে, স্কুল কলেজের সীমানার
বাইরেও যে বিশাল জ্ঞানের ভাণ্ডার থাকতে পারে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চলার পথের পাশে সেটা আমরা অনেক সময়
বুঝতেই পারি না। এটাও মনে হয় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার,
আমাদের জীবন দর্শনের একটা বিশেষত্ব।
হাই স্কুলেই দুলাল ডাক্তারি পেশার মহত্বের সাথে পরিচিত
হয়। প্রাইমারী আর হাই স্কুলের প্রথম দিকে গরু, বর্ষাকাল এসবের
রচনার পর সে এখন জীবনের লক্ষ্য রচনা পর্বে প্রবেশ করেছে। শহর থেকে
কিনে আনা এক নোট বই পড়ে সে জেনেছে ডাক্তার মানে রেবতী ডাক্তার নয়। ডাক্তার মানে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, ডাক্তার মানে
গাড়ি-বাড়ি, ডাক্তার মানে ভালো চাকরি বা নিজস্ব প্র্যাকটিস, ডাক্তার মানে মানুষের সেবা
করা। এক কথায় ডাক্তার মানে গ্রামের ছেঁড়া পাজামা পাঞ্জাবি পরা
উসকো খুশকো চুলের বাউন্ডুলে সমাজসেবী নয়, ডাক্তার মানে নামী
দামী, সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সর্বজন শ্রদ্ধেয় সমাজসেবী। ঐ বইয়ে
অবশ্য ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, অ্যাডভোকেটসহ অনেক পেশার কথাই লেখা ছিল, কিন্তু
দুলালের কেন যেন ডাক্তারি পেশাটাই মনে ধরল। তাই সে
তখন থেকেই নিজেকে সেভাবে প্রস্তুত করতে শুরু করল। আর সে জন্যে
যা দরকার, তা ছিল মনোযোগ দিয়ে পড়াশুনা করা, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা। কারণ সে জানত একমাত্র ভাল রেজাল্ট করতে পারলেই তার মধ্যবিত্ত
বাবা ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাকে ডাক্তারি পড়ানোর রিস্ক নেবেন, নইলে গ্রামের অন্যান্য দশটা ছেলের মতই তাকেও বি.এ. পাশ করে বাবার দোকানেই
বসতে হবে।
দেখতে দেখতে চলে গেল কয়েক বছর। সেকালে
জীবনের গতি ছিল এতই মন্থর, এতই ঘটনাবিহীন যে মনে হত চারিদিকে কিছুই বদলায় নি। শুধু বাবার মাথায় কিছু পাকা চুল আর উচ্চতায় বাবাকে ছাড়িয়ে
যাওয়া ছাড়া আর কিছুই সে মনে করতে পারত না। আসলে আগেই
বলেছি যুগটা ছিল ভিন্ন রকমের। বর্তমানের
ডিজিটাল এরায় ঘুম ভাঙতেই হাতে পাই নতুন জেনারেশনের নতুন ডিভাইস। এখন পরিবর্তনের সাথে পাল্লায় মানুষ অনবরত হার মানছে আর
সে যুগে পরিবর্তন ঘটত চোখের আড়ালে। দুলাল তার
নাতিদীর্ঘ জীবনে শুধু একটা ঘটনাই মনে করতে পারে যখন হাজারো মানুষের ঢল নেমেছিল তাদের
আদিগন্ত বিস্তৃত সর্ষে ক্ষেতে। অজানা মানুষের
স্রোত তাদের গ্রামের উপর দিয়ে চলে গিয়েছিল অজানার পথে, জীবনের সন্ধানে। তখন গ্রামের অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সাথে মিলে মিশে সে সাহায্য
করার চেষ্টা করেছিল জনস্রোতে ভেসে আসা এই ছিন্নমূল মানুষগুলোকে। এ ছিল ১৯৭১ সালের কথা। দুলালের
বয়স তখন বড়জোর পাঁচ। জীবনে অনেক
কিছু ভুলে গেলেও সেদিনের ঘটনা এখনও তার মানসপটে উজ্জ্বল হয়ে ভাসছে, যেন এই মাত্র তার
চোখের সামনে ঘটে গেছে এই ঘটনা।
Comments
Post a Comment