মস্কোর পথে

(৩)

স্কুলের পাট শেষ হলে এল কলেজে ভর্তির পালা
রেজাল্ট ভালো করেছিল তাদের স্কুল থেকে এর আগে এত ভালো রেজাল্ট কেউ করেনি বাবার মনে যেটুকু সন্দেহ ছিল, স্কুলের শিক্ষকদের কথায় সেটা ঘুচে গেল ঠিক হল দুলাল এলাকার মফঃস্বল শহরের কলেজে পড়াশুনা করবে কথাটা যত সহজ কাজটা তত সহজ নয় বাড়িতে থাকতে দুলালের জন্য আলাদাভাবে রাঁধতে হয়নি শহরে যাওয়া মানে তার জন্য আলাদা খরচ এ ছাড়া আছে হোস্টেল চার্জসহ আনুষঙ্গিক খরচ তাছাড়া বাড়ি থাকাকালীন দুলাল শুধু খেতই না, সব সময় বাড়ির বিভিন্ন কাজেকর্মে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত সেদিক থেকেও দুলালের শহরে যাওয়া ছিল ওর বাবার উপর শুধু অর্থনৈতিকই নয়, শারীরিক ও মানসিক চাপও তারপরও ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে দুলালের বাবা একদিন দুলালকে নিয়ে এলেন শহরে দুলাল ইচ্ছা করেই গেল সরকারী হাসপাতালের পাশ দিয়ে গ্রামের টিনের আর শনের কুঁড়েঘরের পাশে হাসপাতালের পুরনো একতলা বিল্ডিংও দুলালের চোখে প্রাসাদের মত মনে হল সে আবার ভাবল ডাক্তারি পেশার কথা শহরের চাকচিক্য দেখে, নিওনের আলোতে দোকানপাট, গাড়ি ঘোড়া দেখে দুলালের বাবাও স্বপ্ন দেখলেন তার ছেলে ডাক্তার হয়ে কীভাবে শুধু তাদের বংশেরই নয়, গ্রামের মুখও উজ্জ্বল করছে    

কলেজেই দুলাল পরিচিত হল ছাত্র রাজনীতির সাথে
বিভিন্ন দলের নেতারা তাকে নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করল নিজেদের নীতি আদর্শের কথা বোঝাল তবে দুলাল খেয়াল করল যে সবাই ভালো ভালো নীতি আদর্শের কথা বললেও শুধুমাত্র ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেমেয়েরা কিছুটা হলে তা মেনে চলে অন্যেরা ভালো ভালো কথা বললেও ব্যক্তিজীবনে তার ধারকাছ দিয়েও যায়না আদর্শ তাদের কাছে শুধুই শ্লোগান তাছাড়া ন্যায়ের পক্ষে কথা বলা, দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো দুলালের সহজাত প্রকৃতি তাই দ্বিধা না করে সে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিল ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ল খেলাঘর, উদীচী এসব সংগঠনের সঙ্গে লেখাপড়াও চলল একই সাথে অভাবনীয় ভালো রেজাল্ট করল সে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পরের বছর ছাত্র ইউনিয়নের বৃত্তি নিয়ে সে পড়তে এল সোভিয়েত ইউনিয়নে সেটা ছিল ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বর এখানেই দুলালের সাথে অভির পরিচয়, বন্ধুত্ব আর সেই বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই এই গল্পের অবতারনা

মস্কো তখনও বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের তীর্থভূমি দেশ বিদেশের বিপ্লবীরা এখানেই খুঁজত সমর্থন মস্কোই তাদের পথ দেখাত, বিভিন্নভাবে সাহায্য করত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে সে সমস্ত সাহায্যের একটা ছিল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ছেলেমেয়েদের আধুনিক ও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা, যাতে বিপ্লব পরবর্তী দেশ গড়তে তারা কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে বাংলাদেশ থেকেও প্রতি বছরই সোভিয়েত ইউনিয়নে আসত প্রচুর ছেলেমেয়ে স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ ব্যাপারে সোভিয়েত দেশের সাথে এক চুক্তি করেন শুনেছি প্রথম ব্যাচগুলোর ছাত্রছাত্রীদের সাথে বঙ্গবন্ধু নিজে দেখা করে তাদের এ ব্যাপারে ব্রিফিং করতেন তবে পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশে ভারতের মতই সোভিয়েত ইউনিয়নও আর বন্ধুর তালিকায় ছিল না তাই সরকারিভাবে খুব কম সংখ্যক ছেলেমেয়েই এ দেশে পড়তে আসত এ সময় সিংহভাগ ছেলেমেয়েই আসত সিপিবি, সোভিয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতি, ন্যাপ, বাকশাল, ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক বা গণসংগঠনের মাধ্যমে সরকারী অনুমোদন না থাকায় এসব ছিল বেআইনী, তাই এদের আসতে হত মিথ্যে বলে, যেমন সোভিয়েত দেশে অধ্যয়নরত ভাইবোন বা অন্য কোন আত্মীয়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে বলে ব্যাপারটা ছিল ওপেন সিক্রেট সবাই সব জানত, তারপরেও এটুকু রাখঢাক করে চলত অভি নিজেও যেহেতু মাত্র দুই বছর আগে, মানে ১৯৮৩ সালে সিপিবির স্কলারশিপ নিয়ে মস্কো এসেছিল, তাই এসব বেশ ভালভাবেই জানত



Comments

Popular posts from this blog

সোভিয়েত থেকে রাশিয়া

কাজান

আগ্রা মথুরা বৃন্দাবন