পরনিন্দা পরচর্চা
(১১)
দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলতেই এক ছেলে বিভিন্ন রকমের খাবারের প্যাকেট এনে রাখল টেবিলের ওপর।
বাসায় কেউ নেই। তাই বাইরে খাবারের অর্ডার দিয়েছিলাম। আপনার আপত্তি নেই তো?
না, কোন অসুবিধা নেই। তবে এসব না করলেও পারতে।
মানে?
আমি ঢাকায় থেকে এলে সাধারণত দোস্তের ওখানে রাত কাটাই। ও সারাদিন ব্যস্ত রোগীদের নিয়ে। ফ্রি হয় রাত বারোটার দিকে। বলা আছে। আমাকে নিয়ে যাবে। রাতে সেই ছাত্রজীবনের মত দু’জনে কিছু একটা করে খাই আর গল্প করি সারা রাত। ও কাজে যায় দুপুরের দিকে। যাওয়ার আগে আমাকে কোথাও রেখে যায় যেখান থেকে আমার ভাই কিংবা অন্য কেউ বাড়ি নিয়ে যায়। সে দিক থেকে বলতে পার দেশে এলে আমি অনেকটা পার্সেলের মত, এক হাত থেক অন্য হাতে চলে যাই।
আচ্ছা। উনি বিয়েথা করেননি?
না। আমি ওকে বলি “তুই বিয়ে করিস না। তাহলে ঢাকায় আমার থাকার জায়গা থাকবে না আর।”
ওখানে না গেলে হয় না?
আসলে জান কি, ওর সময় তেমন নেই। মধ্য রাতের পরেই আড্ডা দেওয়ার একটু সময় পায়। আমি তো ছাত্রজীবনে পাভ্লভস্কায়া থাকাকালীন মিকলুখো মাকলায়া এলে ওর ওখানেই থাকতাম। ঐ থেকে অভ্যেসটা রয়ে গেছে। আমাদের হাতে তাছাড়া এখনও প্রচুর সময়। কথার তো শেষ নেই। আগামীর জন্যেও কিছু রেখে দিতে হয়।
আপনার আরেক বন্ধু ছিল। মেডিসিনে পড়ত। এখন কোথায় ?
অ্যামেরিকায়।
যোগাযোগ আছে?
ছিল। এখন নেই।
কেন?
আসলে বুঝলে তো সবাই তাদের নিজের নিজের মত করে আমাকে অসুখী করতে চায়।
যেমন?
ও আগে ফোন করত মাঝে মধ্যে। ওর চাকরি, বাড়ি-গাড়ির গল্প করত। বলত আমাদের ব্যাচে আমি নাকি সবচেয়ে সম্ভাবনাময়দের একজন ছিলাম। রাশিয়ায় পড়ে থেকে আমি সেই সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছি। না আছে বাড়ি, না গাড়ি। যাকে বলে গুড ফর নাথিং।
আপনি কি তাই মাইন্ড করেছেন ওর ওপর?
মাথা খারাপ! শুধু বলেছি, “দ্যাখ আমি খুব সুখে আছি। যে কাজটা করি সেটা খুব প্রিয়। প্রচণ্ড উপভোগ করি এ কাজ। তুই বিশ্বাস করবি না, এই আনন্দের জন্য ওরা আমাকে বেতনও দেয়। ভাবতে পারিস?” এরপর ও আর কখনও ফোন করেনি। কে জানে হয়ত বলা দরকার ছিল, “হ্যাঁ রে, খুব কষ্টে আছি। খুব ভালো করেছিস তুই চলে গিয়ে।“ আসলে সমস্যা কি জান, লোকজন আমাকে সুখ দুঃখের সার্টিফিকেট দিতে বসে আছে, আর আমি সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ করছি না। ক’জন সেটা সহ্য করতে পারে বল?
তা যা বলেছেন।
কে জানে? এটাই হয়ত আমাদের জাতীয় চরিত্র। “নিজে যারে সুখী বলে সেই সুখী নয়, লোকে যারে সুখী বলে সেই সুখী হয়!”
পারেনও আপনি!
না না, এটা আমার ব্যাপার নয়। অনেকে যেখানে চোখ কান খুলে রেখে দিয়ে চলে, সেখানে আমি চোখ কান খোলা রেখে চলি। দেখি মানুষ কি বলে, কেমনে চলে, কি ভাবে। সেটাই বলি। সমস্যাটা মাথায়। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ, আমার মাথায়। কখনও কখনও মনে হয় আমার মাথার খুলির চেয়ে নারকেলের খুলিতে বাস্তব বুদ্ধি অনেক বেশি। বাই দ্য বাই, তুমি এখন গান গাও? বেলোরাশিয়া নিয়ে গানটা তোমার গলায় চমৎকার লাগত!
না, এখন আর হয়ে ওঠে না। মস্কোয় থাকতেই বাদ পড়ে গেছে।
আচ্ছা। আমার দুই বন্ধু খুব ভালো ছবি আঁকত। আন্তর্জাতিক পুরষ্কার পর্যন্ত পেয়েছিল। ওরাও ছবি আঁকা ছেড়ে দিয়েছে। তোমাদের মত ট্যালেন্ট থাকলে আমি গান গেয়ে আর ছবি এঁকেই জীবন কাটিয়ে দিতাম। ছোট বেলায় টুকটাক ছবি আঁকতাম। বিশেষ কিছু নয়। তাই মেয়েকে আর্ট স্কুলে পড়িয়েছি। খারাপ আঁকে না। তবে এটাকে পেশা হিসেবে নেয়নি। ছোটবেলা থেকেই আমার বই পড়ার শখ ছিল আর আগ্রহ ছিল অংকে আর পদার্থবিদ্যায়। ওদের নিয়ে আমি সেই শৈশবেই আটকে রইলাম। বড় হতে পারলাম না তোমাদের মত! তবে ছবি আঁকা না হলেও ছবি তোলা হয়। তখন মনে মনে সেই চুটকি মনে করে হাসি।
কোন চুটকি?
এটা নব্য রাশানদের নিয়ে অনেক চুটকির
একটা। একদিন এক নব্য রাশান ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘুরতে গেছে নভদেভিচি মোনাস্তিরের সামনে
পার্কে। দেখে এক লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছবি আঁকছে। চার্চের ছবি। ছেলেমেয়েরা তো ভীষণ অবাক?
কী করছে লোকটা এখানে এত সময় ধরে দাঁড়িয়ে! বাবাকে জিজ্ঞেস করায় বাবা গম্ভীর ভাবে
উত্তর দিলেন “বুঝলে, আঙ্কেলের পয়সা নেই ভালো ডিজিটাল ক্যামেরা কেনার। তাই বেচারা ঘণ্টার
পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছবি আঁকছে।“ আমি যদিও নতুন রাশান (ঠাট্টা করে বলি নিউ ব্ল্যাক
রাশান) তবে ওদের মত পয়সা নেই খুব দামী ক্যামেরা কেনার। তবে আছে প্রচণ্ড রকম
আলসেমি, তাই ছবি না এঁকে ছবি তুলি।

Nice...
ReplyDelete