আগ্রা মথুরা বৃন্দাবন
(৩০)
অভিদের প্রথম স্টপেজ হল আগ্রা ফোর্ট। দেখতে অনেকটা দিল্লির
লাল কেল্লার মতই। আসলে এখান থেকেই সম্রাট শাহ্জাহান দিল্লিতে তাঁর রাজধানী সরিয়ে নেন
আর তাজমহলের স্থপতি সেখানে গড়েন লাল কেল্লা।
আগ্রা দিল্লির নাম প্রায়ই এক সাথে উচ্চারিত হয় বলে অভির ধারণা ছিল শহর দুটো
সমসাময়িক।
আগ্রা মুঘল সাম্রাজ্যের প্রাক্তন রাজধানী। এখন মূলত তার খ্যাতি তাজমহলের কারণে। দিল্লির
তুলনায় যদিও শিশু, আগ্রার ইতিহাস তারপরেও প্রায় হাজার বছরের। রাজধানী দিল্লি থেকে ২০৬
কিলোমিটার দক্ষিণে এই প্রাচীন শহর আগ্রা যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। পারস্যের কবি মাসুদ
সাদ সালমানের ১১ শতকের লেখায় প্রথম আগ্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। এটা ছিল গজনীর মাহমুদ
কর্তৃক রাজা জয়পালের আগ্রা দুর্গ আক্রমণের কাহিনী। এর পূর্বে আগ্রা সম্পর্কে কোন লিখিত
তথ্য পাওয়া যায় না। দিল্লিতে স্থায়ীভাবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক পরে ১৫০৪
সালে দিল্লির সুলতান সিকান্দর লোদি তাঁর রাজধানী আগ্রায় স্থানান্তরিত করেন। সপ্তদশ
শতকের কিছু দলিলপত্র থেকে জানা যায় যে সিকান্দর লোদি যখন আগ্রায় রাজধানী স্থানান্তরিত
করেন তখন সেখানে প্রাচীন জনপদের নিদর্শন থাকলেও সেটা ছিল বড়জোর এটা গ্রাম। তাই অনেক
ঐতিহাসিক সিকান্দর লোদিকেই আগ্রার প্রতিষ্ঠাতা বলে গণ্য করেন।
১৫২৬ সালে সিকান্দর লোদির পুত্র ইব্রাহিম লোদি প্রথম পানিপথের
যুদ্ধে বাবরের হাতে পরাজিত ও নিহত হন। এভাবেই ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটে। ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার
সাথে সাথে শুরু হয় আগ্রার স্বর্ণযুগ। সম্রাট বাবর যমুনা তীরে প্রথম পার্সি বাগান আরাম
বাগের ভিত্তি স্থাপন করেন। শের শাহ্ সুরি ১৫৪০ থেকে ১৫৫৬ সাল পর্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য সুরি
সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেও হুমায়ূন
ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। ১৫৫৬ সালে দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে আকবর
পুনরায় আগ্রা দখল করে এর নামকরণ করেন আকবরাবাদ।
এই শহর সম্রাট আকবর,
জাহাঙ্গীর ও শাহ্জাহানের রাজত্বকালে ১৫৫৬ থেকে ১৬৪৮ সাল পর্যন্ত প্রায় একশ বছর ছিল
মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী। ১৬৪৮ সালে সম্রাট শাহ্জাহান রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তরিত করার আগে পর্যন্ত আগ্রাই ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান শহর। ফলে মুঘল আমলে এখানে বিভিন্ন নির্মাণকর্ম সাধিত হয়। লাল কেল্লা বা আগ্রা দুর্গ তৈরি ছাড়াও সম্রাট আকবর আকবরাবাদকে শিক্ষা, শিল্প, বানিজ্য ও ধর্মীয় কেন্দ্রে পরিণত করেন। এ ছাড়াও আগ্রা থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে ফতেহপুর সিক্রিতে আকবর নতুন রাজধানী স্থাপন করেন, তবে সেটা পরবর্তীতে পরিত্যক্ত হয়। আকবর পুত্র প্রকৃতি প্রেমী জাহাঙ্গীর গাছপালা পছন্দ করতেন। ফলে লাল কেল্লা বা আগ্রা দুর্গের ভেতরে বিভিন্ন বাগান গড়ে তুলেন। স্থাপত্য প্রেমী শাহ্জাহান আকবরাবাদ বা আগ্রাকে সবচেয়ে মুল্যবান উপহার দান করেন। স্ত্রী মমতাজ মহলের সমাধি এই তাজমহলের কাজ শেষ হয় ১৬৫৩ সালে। তবে এর আগে ১৬৪৮ সালে শাহ্জাহান তাঁর সাম্রাজ্যের রাজধানী শাহজাহানবাদে বা অধুনা দিল্লিতে নিয়ে যান। কিন্তু তাঁর পুত্র আওরঙ্গজেব রাজধানী পুনরায় আকববাবাদে স্থানান্তরিত করেন। সে সময় ক্ষমতাচ্যুত সম্রাট শাহ্জাহান আগ্রা দুর্গে বন্দী ছিলেন। কথিত আছে আগ্রা দুর্গে বন্দী অবস্থায় শাহ্জাহান যমুনার অপর পাড়ে অবস্থিত তাজমহলের দিকে তাকিয়ে দিন কাটাতেন।
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে
বিভিন্ন রাজন্যবর্গ দিল্লির সম্রাটের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। আগ্রা প্রায়ই এসব আক্রমণের
শিকার হয়। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ভরতপুরের জাঠেরা মুঘল সাম্রাজ্যের উপর একের পর এক
আক্রমণ চালিয়ে আকবরাবাদ দখল করে। পরবর্তীতে শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠিরা ভারতের অন্যতম
শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। মারাঠিরা আকবরাবাদকে নিজেদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে
এবং পুনরায় এর নাম রাখে আগ্রা। পরবর্তীতে আগ্রা গোয়ালিয়র রাজ্যের অধীনে চলে যায়। আর
১৮০৩ সালে আগ্রা ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত
হয়। ১৮৩৭-১৮৩৮ সালে আগ্রা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের শিকার হয়। সম্বত পঞ্জিকা অনুযায়ী এটা ছিল
১৮৯৪ সাল, তাই লোক মুখে এটা চুরানব্বইএর মন্বন্তর নামে খ্যাত। এছাড়া আগ্রা ছিল ১৮৫৭
সালে সিপাহী বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
আমরা আমেরিকাকে ইমিগ্র্যান্টদের দেশ বলি, কিন্তু ভারত কি কোন অংশে কম? যেন নিজের সাথে
কথা বলে উঠল দুলাল।
না, একদম না। আদিবাসী বলে একটা কথা আছে। আর সেটা প্রায় সব দেশেই আছে। এই শব্দটাই বলে
দেয় পৃথিবীর প্রায় সব দেশই ইমিগ্র্যান্টদের হাতে তৈরি। শুধু কেউ এসেছে হাজার হাজার
বছর আগে, কেউ বা কয়েক পুরুষ আগে। তবে আমি সিওর নই আদিবাসীরা অভিবাসীদের কিভাবে দেখে
- স্থপতি হিসেবে নাকি বিনাশকারী হিসেবে। তবে সবার ক্ষেত্রেই এটা সমানভাবে প্রযোজ্য
নয়। আমেরিকার আদিবাসীরা মানে রেড ইন্ডিয়ানরা সে দেশের সবচেয়ে অবহেলিত, নির্যাতিত জাতি।
এমন কী তারা ভোটাধিকার পেয়েছে মাত্র বছর পঞ্চাশেক আগে। ইউরোপিয়ানরা এখানে এসে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে
নির্মম ভাবে ধ্বংস করে। যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তাদের পাঠায় রিজার্ভ এরিয়ায়। এটা স্তালিনের
গুলাগের চেয়ে কম কিছু ছিল বলে মনে হয় না। স্প্যানিয়ার্ডরা একই ভাবে শুরু করলেও এক সময়ে
এসে স্থানীয় জনগণের সাথে মিশে যায়। যার ফলে ল্যাটিন আমেরিকায় এসব জাতি ধ্বংস হয়ে যায়নি।
রাশিয়ায় এটা ঘটে একেবারে ভিন্ন ভাবে। রাশিয়ার জারেরা সাইবেরিয়ার ব্যাপারে কখনই তেমন
আগ্রহী ছিলেন না। এরমাকের মত কিছু দলছুট সেনাপতি একরকম বিনা যুদ্ধে এসমস্ত এলাকার
জনগণকে বশ মানায় আর জারকে রাজী করায় এসব এলাকা রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে। যার ফলে কী
জার আমল, কী সোভিয়েত
আমল, কী নতুন রাশিয়ায় আমরা দেখি এসব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। এসব
ক্ষুদ্র জাতির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা – ইত্যাদি টিকিয়ে রাখতে মস্কো সব আমলেই সচেষ্ট
ছিল। এখনও আছে। আসলে এটা ভালো বা মন্দের ব্যাপার
নয়। এটা মনে হয় জেনেটিক্যাল কোড। ব্রিটিশরা অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডেও কিন্তু একই
ভাবে স্থানীয় জনগণকে নিশ্চিহ্ন করেছে আবার ইন্ডিয়া বা আফ্রিকায় সেটা করেনি বা করতে
পারেনি, যদিও দু জায়গা থেকেই অসংখ্য মানুষকে দাস হিসেবে নিয়ে কাজ করিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন
এলাকায়। এর ফলে আমেরিকায় যেমন দেখবে আফ্রো-আমেরিকানদের, ক্যারিবিয়ায় তেমনি ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের।
কিন্তু যদি ঘড়ির কাঁটা আরও পেছন দিকে ঘোরাও চলে যাবে সেই প্রাক-আর্য ভারতে, হরপ্পা
মহেঞ্জোদারো সভ্যতার যুগে। দেখবে ভারতের দিকে দিকে শুধুই দ্রাবিড় আর আদিবাসীদের রাজ্যত্ব।
রামায়ণ, মহাভারতে যেসব রাক্ষস, বানর, ভালুক (সুগ্রীব দোসর জাম্বুবান) ইত্যাদির কথা
বলা হয় অনেকের মতে এরা আসলে স্থানীয় জাতি উপজাতির মানুষ। এরপর এক সময় আর্যরা ভারত দখল
করবে। দ্রাবিড়রা চলে যাবে দক্ষিণ ভারতে। আর শত শত ক্ষুদ্র জাতি উপজাতি যারা এক সময়
ছিল এ ভূমির একচ্ছত্র অধিকারী তারা হয়ে যাচ্ছে অধিকারবিহীন উপজাতি বা আদিবাসী। হ্যাঁ,
আমরা আমাদের দেশ গড়েছি, গড়ছি। কিন্তু সাঁওতাল, গারো, চাকমা, মারমাসহ শত শত উপজাতির কাছে আমরা হানাদার বই
কিছু নই।
কিন্তু মুসলিম রাজন্যবর্গও তো ভারতবর্ষের জন্য অনেক কিছুই করে গেছেন। সেটাও তো অস্বীকার করার উপায় নেই।
অস্বীকার
তো কেউ করছে না। ইংরেজ আমলে কোলকাতা, মুম্বাই আর চেন্নাইয়ের মত শহর গড়ে উঠেছে, রেল লাইন, রাস্তাঘাট কত কিছুই তো তৈরি হয়েছে। ভারতবর্ষে প্রথম মুসলিম আক্রমণ হয় ৬৩৬ সালে, মুম্বাইএর কাছে। এরপরে বিভিন্ন
ভাবে আরব দেশ থেকে লোকজন ভারতে আসে ইসলামের বার্তা নিয়ে। আমার জোড় দিয়ে বলতে পারি এমন
কি ইসলাম ধর্ম আবির্ভাবের পূর্বেও আরবের সাথে ভারতের যোগাযোগ ছিল। আরব বনিকরাই ছিল
ভারত ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক পণ্যরূপী চিঠিপত্র আদান প্রদানের অন্যতম কবুতর। তবে
প্রথম দিকে ভারতে ইসলামের প্রচার হয় মূলত ধর্ম প্রচারকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে। এরপর বিভিন্ন সময়
ভারতের উপর আক্রমণ আসে। ১০০১ সালে গজনীর সুলতান মাহমুদ গান্ধাররাজ (বর্তমানে আফগানিস্তানের
কান্দাহার) জয়পালকে পেশোয়ারের যুদ্ধে পরাজিত করেন। এই রাজা জয়পালের সাথে সুলতান
মাহমুদের যুদ্ধ হয় আগ্রা দুর্গের দখল নিয়েও। দশম শতকের শেষ দিকে গজনীর সুলতান বার বার
ভারত আক্রমণ করে ব্যাপক হারে লুটতরাজ চালায়। এসময় উত্তর ভারতে বিশেষ করে আধুনিক আফগানিস্তান
ও পাকিস্তানে একাধিক যুদ্ধ সংগঠিত হয়। বিভিন্ন মুসলিম রাজন্যবর্গ নিজেদের আধিপত্য স্থাপনের
জন্য একে অন্যের সাথে এসব যুদ্ধে লিপ্ত হন। ১১৯১ সালে শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘোরি আজমীরের
তৃতীয় পৃথ্বীরাজকে আক্রমণ করে তরাইনের যুদ্ধে পরাজিত হন। পরবর্তী বছর তিনি পুনরায় তরাইনে
সৈন্য সমাবেশ করেন। এবার তিনি জয়ী হয়ে পৃথ্বীরাজকে
হত্যা করেন। লাহোরসহ উত্তর ভারতের অনেকটা এলাকা নিজের রাজ্যভুক্ত করলেও তিনি গজনী ফিরে যান। ১২০৬
সালে শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘোড়ি নিহত হলে তাঁর সবচেয়ে দক্ষ সেনাপতি কুতুব-উদ্দীন আইবেক
ভারতীয় প্রদেশসমুহে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেকে দিল্লির সুলতান বলে ঘোষণা
করেন। তবে এর আগে ১২০১ সালে বখতিয়ার খলজি বাংলা আক্রমণ করেন। তাই অনেকের মতে ভারতবর্ষে স্থায়ীভাবে মুসলিম শাসন
শুরু হয় ১২০১ সাল থেকে। দিল্লির সুলতান, বিশেষ করে মুঘল আমলে ভারতে মুসলিম সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে। মুসলিম বিশেষ করে মুঘল সম্রাটরা ছিলেন
সমরখন্দের। পিতার দিক থেকে তারা ছিলেন চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরি, মায়ের দিক থেকে তৈমুর
লং-এর। তবে নিজেরা তুর্ক (এটা তুর্কি বা অধুনা
তুরস্কের অধিবাসী নয়, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরঘিজস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তান - মানে সোভিয়েত মধ্য এশিয়ায় বসবাসকারী যাযাবর জাতি) বংশোদ্ভূত হলেও মনে প্রাণে চেষ্টা করেছেন ভারতীয়
হতে। উল্লেখ করা যেতে পারে রুশ দেশের জারেরা যেমন জার্মানির প্রিন্সেসদের রানী করতেন,
মুঘল শাসকেরাও ঠিক তেমনই করে রাজপুত রমণীদের রানী করতেন। ঠিক জানি না ইংরেজদের প্ররোচনায় কি না, এক সময় মুসলিম সম্প্রদায়
নিজেদের ভারতীয় হিসেবে পরিচয় দিতে কুণ্ঠিত বোধ করতে শুরু করে। মুসলিম লীগ মুঘলদের ঐতিহ্য
নিজেদের বলে মনে করলেও নিজেদের ভারতীয় বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। এখনও কী পাকিস্তান, কী বাংলাদেশ হতে পারে ভারতেরও মুসলমানদের একটা বিশাল অংশ
তাদের ভারতীয় অতীতকে অস্বীকার করে নিজেদের আরবদের উত্তরসূরি বলে মনে করে। আমাদের দেশের
অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবার নিজেদের পূর্বপুরুষদের এই অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা বলে পরিচয়
দিতে লজ্জিত হয়। অনেকেই বিভিন্ন সময়ে আরব ভূমি থেকে বিভিন্ন ভাবে আগত লোকজনদের নিজেদের
পূর্বসূরি ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আমার মনে হয় এটা এই উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ
ট্র্যাজেডি। যদিও প্রশ্ন করতেই পার হিন্দু বা বৌদ্ধরা নিজেদের আর্যদের উত্তরসূরি ভাবতে
পারলে মুসলিমদের আরবদের উত্তরসূরি ভাবলে দোষের কী আছে? ব্যাপারটা দোষ বা গুনের নয়। প্রাচীন কাল থেকে শুরু
করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারতবর্ষ বিভিন্ন জাতির আক্রমণের শিকার হয়েছে। তাদের একটা
বিরাট অংশ এখানে রয়ে গেছে। গ্রীক আর ইংরেজদের বাদ দিলে এরা সবাই স্থানীয় জনগণের সাথে
মিশে নিজেদের ভারতীয় ভাবতে শুরু করেছে। ইউরোপ আমেরিকায় এখনও এ এলাকার মানুষকে ভারতীয়
বলেই উল্লেখ করা হয়, যদিও ভারতীয় বলতে তারা উপমহাদেশের কথাই বোঝায়। নিজেদের ভারতীয়
ভাবার অর্থ এই নয় যে আমাদের দেশকে ভারতের অংশ হতে হবে, কথা হচ্ছে এই ভাবনার মধ্য দিয়ে আমরা
নিজেরা হাজার
বছরের ভারতীয় সংস্কৃতির অংশ হতে পারি। কই, আমরা তো ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিকাল মিউজিক বলতে
দ্বিধা করি না, ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট বলতে দ্বিধা করি না। দক্ষিণ ভারতে তুলনামূলক ভাবে
কম, তবে উত্তর ভারতের তথা বাংলার সংস্কৃতি, স্থাপত্য এসবই প্রাচীন ভারতীয়, আরব্য, পারস্য – এসববের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে।
একটাকে বাদ দিয়ে তুমি অন্যটা নিতে পার না। তাই তোমার প্রশ্নের উত্তর একটাই – ওই সময়ের
মুসলিম শাসকেরা নিজেদের ভারতীয় মনে করতেন আর এই মনোভাব নিয়েই এদেশের সবকিছুকে নিজেদের
মত করে গড়ে তুলেছিলেন আরবি আর পারসিক উপাদান
মিশিয়ে। সেটা খাবার বল, মিউজিক বল আর স্থাপত্যই বল। তাছাড়া সেসব রাজা বাদশাহরা আরব
বা পারস্য থেকে নিয়ে আসা শিল্পকলাকে ইসলামি শিল্পকলা না ভেবে আরব্য বা পারসিক বলেই
মনে করতেন। আরবে বা পারস্যে ইসলাম আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই উন্নত স্থাপত্য শিল্প ছিল।
মিশর, সিরিয়া বা
অধুনালুপ্ত ব্যাবিলনের সভ্যতা সে কথাই বলে। হ্যাঁ, দরবারের ভাষা ছিল ফার্সি, তবে মনে
রাখা দরকার প্রথম দিকের মুসলিম শাসকেরা হিজরি পঞ্জিকা ব্যবহার করলেও সম্রাট আকবর নতুন পঞ্জিকা তৈরি
করেন যেটাকে আমরা বর্তমানে বাংলা পঞ্জিকা হিসেবে ব্যবহার করি। ওনার অভিষেক হয়েছিল ৯০০
হিজরি সালে। এ পর্যন্ত দুটো পঞ্জিকাই হাতে হাত রেখে চলে আর এর পর থেকে তাদের পথ বেঁকে
যায়। হিজরি পঞ্জিকা আগের মতই চাঁদের সাথে পথ চলে আর বাংলা পঞ্জিকা সূর্যের সাথী হয়।
এর কারণ ছিল অর্থনৈতিক। আমার বিশ্বাস আরবে কৃষিকাজ হয় না বলে সৌর পঞ্জিকার প্রয়োজন
সেখানে ততোটা ছিল না, বরং ব্যবসায়ীদের কাফেলা রাতের বেলা এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে যাতে
নির্বিঘ্নে যেতে পারে সে
জন্যে চাঁদের গুরত্ব ছিল অপরিসীম। কিন্তু ভারত ছিল কৃষি নির্ভর, আর জানই তো কৃষিকার্যের
জন্যে সূর্য অন্যতম প্রধান ফ্যাক্টর। এই সূর্যের অবস্থানের উপর নির্ভর করে শস্যের চাষাবাদ,
নির্ভর করে রাজকোষের খাজনা। তাই সম্রাট আকবরকে সৌর পঞ্জিকা করতে হয়েছিল। অর্থনৈতিক
কারণে হলেও মুসলিম রাজন্যবর্গকে ভারতীয় অনেক রীতিনীতি মেনে নিতে হয়েছিল। তাই আমি অবদান
না বলে বলব মানিয়ে নেওয়া আর পরস্পরকে ঋদ্ধ করা। মনে আছে ইতিহাস বইয়ে পড়েছিলাম বাংলা ভাষার বিকাশে মুসলিম সুলতানদের বিশেষ করে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্-এর অবদানের কথা? কিন্তু এখন দেশে অনেকেই সেটা ভুলে গিয়ে বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতিতে শুধুই হিন্দুয়ানী দেখে।
এভাবে কথা বলতে বলতে হাঁটছিল ওরা আর দেখছিল আগ্রা দুর্গের মিউজিয়াম যেখানে সাজিয়ে রাখা আছে সে আমলের পোশাক আশাক, অস্ত্রশস্ত্র। ছিল আর্ট। হঠাৎ দুলাল বলে উঠলো
দেখুন দেখুন, যমুনার ওপারে তাজমহল দেখা যাচ্ছে।
হ্যাঁ, এই সেই তাজমহল। অভির মনে পড়বে ছোটবেলায় শোবার ঘরে তাজমহলের ছবির কথা। তাজমহলসহ বিভিন্ন ঠাকুর দেবতার ছবি ছিল দেওয়ালে। ও মোটা কাগজে সেগুলো আঠা দিয়ে লাগিয়ে
দেওয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছিল। আগ্রা দুর্গ আর তাজমহলের মাঝে বয়ে যাচ্ছে যমুনা নদী। এখন অবশ্য অনেকটা শুকিয়ে
গেছে। শীতকাল বলে, নাকি দেশের নদীগুলোর মত যমুনাও আজ দৈন্য অবস্থায় ভুগছে কে জানে? তবে এলাহাবাদে তাকে এত অভাবী মনে হয়নি। নদীর এ পাড়ে বিশাল চর। সেখানে গরু আর মহিষ চড়ে বেড়াচ্ছে। সম্রাট শাহজাহান দেখলে নিশ্চয়ই কষ্ট পেতেন। দু একটা হাঁস সাঁতার কাটছে যনুমার জলে। «ওগো নীল যমুনার জল» কথাটা এখানে বড়ই বেমানান মনে হচ্ছে। সকালের রোদে ঝলমল করছে তাজমহলের মিনারগুলো।
জান, এখানে বসেই নাকি গৃহবন্দী সম্রাট শাহজাহান তাজমহলের দিকে তাকিয়ে জীবনের শেষ বছরগুলো কাটিয়ে দিয়েছিলেন। বাদশাহী আমলে এখানে তো দূরের কথা, দুর্গের আশেপাশে আসার কথা চিন্তা করতে পারতে না।
আগ্রা ফোর্ট অনেকটা দিল্লির লাল কেল্লার মতই দেখতে। মনে হয় উস্তাদ আহমাদ লাহোরি আগ্রা ফোর্টের অনুকরণেই লাল কেল্লা তৈরি করেছিলেন। লাল রঙের
বলে আগ্রা ফোর্টকেও লাল কেল্লা বলা হত। বিশাল চত্বরের উপর তৈরি এটা
দুর্গ তো নয় ছোট খাটো একটা শহর।
জলসা ঘর বা নাট্য মঞ্চ। সেখানে কী একটা
অনুষ্ঠান মত হচ্ছিল। মাঠ, মসজিদ আর বিভিন্ন মহল। রং বেরঙের মানুষ এদিক সেদিক ঘুরছে।
সারা বিশ্বের লোক যেন মিশে গেছে এই আগ্রায়। আজ অভিদের বিশাল প্রোগ্রাম। ফতেহপুর সিক্রি ছিল না বলে অভি
একটু মনঃক্ষুণ্ণ, তবে সেটা থাকলে কোন কিছু ভালো ভাবে দেখা হত না বলেই ওর মনে হয়। এখান
থেকে ওরা যাবে পাশেই কোথাও লাঞ্চ করতে। এরপর কয়েক ঘণ্টা তাজমহলে। সেদিন পূর্ণিমা রাত।
কী লোভই না হচ্ছিল পূর্ণিমা রাতে তাজমহল দেখতে! তবে সে সুযোগ নেই। এরপর ওরা যাবে মথুরা
আর বৃন্দাবন। যতদূর মনে হয় ওদের সাথীরা ট্যুরিস্ট কাম তীর্থযাত্রী। তাই এই ব্যবস্থা।
আগ্রার দুর্গ থেকে বেরিয়ে ওরা গেল একটা মার্কেটে। সেখানে স্যুভেনির জাতীয় জিনিসপত্র
কেনাকাটা আর খাওয়া দাওয়া। দেখে মনে হয় ট্র্যাভেল কোম্পানিগুলো আগে থেকেই এদের সাথে
কথা বলে রাখে, আর ওভাবেই নিয়ে যায় যাতে যতদূর সম্ভব অল্প সময়ে খাবারের কাজটা সারা যায়।
তাজমহলের গেটে ওরা প্রথম বারের মত কড়া চেকিং-এর সম্মুখীন হল।
সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মের ফলে এখন সব জায়গায়ই বেশ কড়াকড়ি। তবে এখনও পর্যন্ত এয়ারপোর্টের
বাইরে ওরা তেমন কোন চেকিং-এর মুখোমুখি হয়নি। তাজমহলে অবশ্য অন্য ব্যাপার। চেক পোস্টের
পরে অনেকটা হেঁটে যেতে হল আরেকটা গেটের সামনে। দেখে মনে হয় তাজমহলে ঢোকার তোরণ। অনেকটা
বিভিন্ন দেশে বিজয় তোরণের মত। ওখান থেকে অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে তাজমহল। সামনে একের
পর এক ফোয়ারা, তাদের দুই ধারে রাস্তা। অনেকটা সাভারে জাতীয় স্মৃতি সৌধে যেমন। তবে এ
এক অন্তহীন পথ। লাল কেল্লায় ঢুকে যেমন এখানেও তেমনি অভির মনে হল মুঘল স্থাপত্যের বিশালতার
কথা। মনে পড়ল মস্কো আর সাঙ্কত পিতেরবুরগের ক্রেমলিন আর শীত প্রাসাদের কথা। কিন্তু লাল
কেল্লা, আগ্রা দুর্গ বা তাজমহলের কাছে সব যেন ম্লান হয়ে যায়। যদিও মস্কোর ক্রেম্লিনের
সাথে রেড স্কয়ার, গুম এসব যোগ করলে অথবা সাঙ্কত পিটারবুরগের শীত প্রাসাদের সাথে দ্ভরতসভায়া
প্লসাদ মানে প্যালেস স্কয়ার যোগ করলে অনেকটা এ রকমই হবে। তবে অভির মনে হল দিল্লির বা
আগ্রার লাল কেল্লা বা তাজমহলের টোটাল কমপ্লেক্সের
সাথে তুলনা করা যায়
পিতারগফকে। অভি মনে মনে তাজমহলের একটা ছবি এঁকেছিল সেই ছোটবেলাতেই, কিন্তু এটা যে এত
বিশাল সেটা কল্পনা করতে পারেনি। পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি তো তাজমহল এমনি এমনিই হয়নি!
বিভিন্ন দেশে অভি এরচেয়ে উঁচু, এরচেয়ে
বড় স্থাপত্য দেখেছে, কিন্তু তাজমহলকে কোন কিছুর সাথেই তুলনা করা যায় না, সে অতুলনীয়,
অন্য এক গাম্ভীর্যে ভরপুর। এখানেও বিশাল লাইন। অভির মনে পড়ল সোভিয়েত আমলে লেনিনের মাউসিলিয়ামের দীর্ঘ কিউয়ের কথা যেখানে শীত নেই গ্রীষ্ম নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত লোকজন লেনিনকে একটু দেখার জন্য। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে ওরা উঠল তাজমহলের বেদিতে। অন্যদের বলে লাইনে জায়গা রেখে বিভিন্ন কোণ থেকে ছবি তুলল তাজমহলের মিনারগুলোর, ছবি তুলল যমুনা নদীর। তবে ভেতরটা ওকে ততটা নাড়া দিল না যতটা দিয়েছিল মস্কোর রেড স্কয়ারে শায়িত লেনিন। হয়তো রাজনৈতিক সিম্প্যাথি তখন লেনিনের পক্ষে ছিল বলে। এখানেও বিরাজ করছে পিন পতন নীরবতা। সবাই নিঃশব্দে চলে যাচ্ছে মমতাজ বেগমের কবরের পাশ দিয়ে।
বাইরে এসে অভি আর দুলাল ওদের গ্রুপের কাউকে খুঁজে পেল না, আসলে ওদের গ্রুপের কথা মনেই ছিল না। মনের আনন্দে শেষবারের মত দেখছিল অস্তগামী সূর্যের আলোয় ঝলমলে তাজমহল। এমন সময় দিল্লি থেকে ফোন এলো বন্ধু চঞ্চলের।
তোরা কোথায়?
কেন, তাজমহলের ওখানে। অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করছি।
তোদের জন্য গাড়ি ছাড়তে পারছে না। ওরা সবাই অপেক্ষা করছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গেটে চলে যা। নইলে দিল্লি ফেরা আর হবে না।
অন্ধকার নেমে এসেছে। ঠিক কোন দিকে যেতে হবে সেটাও বুঝে উঠতে পারছে না। হঠাৎ দেখে দূরে ওদের গ্রুপের আরও কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। পা চালিয়ের হাঁটল ওরা। গাড়ির ড্রাইভার বা হেল্পারের কাছে অভি বা দুলালের নম্বর ছিল না। চঞ্চল টিকেট কেটেছিল আর নিজের নম্বরটাই দিয়েছিল। তাই ওরা ওকেই ফোন করে। যাহোক শেষ পর্যন্ত ওরা গাড়িতে এসে বসল। যাত্রা শুরু হল মথুরা আর বৃন্দাবনের পথে।
মথুরার কথা অভি রামায়ণ আর মহাভারতেই পড়েছে। কথিত আছে ইক্ষাকু বংশের রাজকুমার রাম
লক্ষণের ভাই শত্রুঘ্ন এখানে লবনাসুর নামে এক রাক্ষসকে হত্যা করে এলাকাটি দখল করেন।
ঘন অরণ্যের কারণে এর ছিল মধুবন। পরবর্তীতে
প্রথমে এর নাম হয় মধুপুর আর এই মধুপুর থেকেই কালক্রমে তা মাথুরা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
মহাভারতের যুগে মধুরা ছিল কংসের রাজধানী। বোন যশোদার পুত্রের হাতে নিজের মৃত্যুর ভবিষ্যতবাণী
শুনে মথুরারাজ কংশ তাঁকে কারাবন্দী করেন। কংসের কারাগারেই এক দুর্যোগপূর্ণ রাতে জন্ম নেন শ্রীকৃষ্ণ। সেদিক থেকে মথুরা নিয়ে
হিন্দুদের আবেগ রাম জন্মভূমি অযোধ্যার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের
মথুরা ছিল সুরসেন বংশের রাজধানী। পরবর্তীতে মথুরা মৌর্যদের অধীনে চলে যায়। ধারণা করা হয় এক সময় মথুরা ভারতীয় গ্রীকদের অধীনে
ছিল। পরবর্তীতে মথুরা কুশানরাজ কনিষ্কের অধীনস্থ হয়। ১০১৮ সালে গজনীর মাহমুদ মথুরা আক্রমণ
করে অনেক মন্দির ধ্বংস করেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে দিল্লির সুলতান সিকান্দর লোদি
মথুরা আক্রমণ করেন। মুঘল সম্রাট আরঙ্গজেব এখানে শাহী ইদগাহ মসজিদ তৈরি করেন এবং মথুরার
নামকরণ করেন ইসলামাবাদ। মথুরাকে ব্রজভুমির হৃদয় বলেও আখ্যায়িত করা হয়। এ ছাড়া মথুরা
ও বৃন্দাবন শহর দুটোকে যমজ শহরও বলা হয়।
মথুরার পথে যাত্রা শুরু করে অভি ফোন করল ওর কলিগ অনিরুদ্ধকে। ও মথুরায় একটা কলেজে আছে। তবে অনিরুদ্ধ ছিল না, কোথাও এক বিয়েতে গিয়েছিল।
পথে ওরা পড়ল ট্র্যাফিক জ্যামে। আসলে সন্ধ্যার পর পর যেকোনো শহর থেকে বেরুনো
বা শহরে ঢোকা খুবই সমস্যার। বিশেষ করে মথুরা আর বৃন্দাবন ছিল আগ্রা থেকে দিল্লি যাওয়ার
পথে। অনেক খড়কুটো পুড়িয়ে ওরা যখন মথুরা এলো বেশ রাত হয়ে গেছে। রাতের অন্ধকার ভেদ করে
ওরা এল এক বিশাল মন্দিরের সামনে। অভির ধারণা দিনের বেলায় এলে ও এর বিশালত্ব দেখে নতুন
করে অবাক হত। মন্দির তো নয়, এক অবরুদ্ধ দুর্গ। এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাজমহল তো দূরের
কথা দেশ বিদেশের এয়ারপোর্টের চেকিং-কে হার মানায়। এমন কি মস্কোর ক্রেমলিনে ঢুকতে এত
তাল্লাসীর সম্মুখীন হতে হয় না। সাথের ছোট বড় সমস্ত ব্যাগপত্র তো স্ক্যানিং করেই, মানুষকে
বিভিন্ন ভাবে চেক করে। ভগবান যে ভক্তদের এত ভয় পায় অভির সেটা জানা ছিল না। অনেক সময়
বিভিন্ন তারকারা ভক্তদের মানে ফ্যানদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ব্যক্তিগত দেহরক্ষী
রাখে। কে জানে কলিযুগে ভগবানও তারকাদের অনুকরণে এসব করেন কি না। তবে বিভিন্ন ধর্মের
অনুসারীরা আজকাল যে ভাবে পরস্পরকে আক্রমণ করে তাতে শুধু ফ্যান নয়, প্রতিপক্ষের আক্রমণ
থেকে রক্ষা পাওয়ার ব্যাপার আছে। তাছাড়া ভক্তদের নিরাপত্তার ব্যাপারটাও অগ্রাহ্য করা
যায় না। এক কথায় উপাসনালয়গুলো আজকাল শুধু শান্তির নীড় নয় যুদ্ধের ময়দানও। দেখে মনে
হল মন্দিরটা ইদানীং তৈরি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ভেতরে ঢুকেই জুতা রাখার সুন্দর ব্যবস্থা,
অনেকটা রেলওয়ে স্টেশনে লাগেজ রাখার মত। বোঝাই যাচ্ছে কৃষ্ণের ভক্তদের সংখ্যা দেশের
জনসংখ্যার মতই দিনকে দিন বেড়েই চলছে। মন্দির তো নয়, বিশাল থিয়েটার। বহুতল। অন্যান্য
মন্দির যেখানে প্রাচীন কালের স্থাপত্য দিয়ে দর্শকদের অবাক করে মথুরা মন্দির মানুষকে
আকর্ষণ করে আধুনিকতায়। ঠিক যেমনটা করেছিল দিল্লির লোটাস টেম্পল। অল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন
তলায় ঘুরাঘুরি করে অভি আর দুলাল এসব দেখল। ছবি তুলতে পারছে না বলে অভির মনে একটা অতৃপ্তি
রয়েই গেল। তাছাড়া কোথাও যাওয়া মানে তো সেখানকার সবচেয়ে দর্শনীয় স্থান দেখা নয়, সেখানকার
লোকজন দেখা, একটু হলেও জীবনযাত্রার সাথে পরিচিত হওয়া। কিন্তু শুধু কোন রকমে এই মন্দির
দেখার মধ্য দিয়েই ওদের মথুরা ভ্রমণ শেষ হল।
মথুরা থেকে ওরা রওনা হল বৃন্দাবনের পথে। বৃন্দাবন মথুরা জেলার
ব্রজভূমিতে অবস্থিত। শ্রীকৃষ্ণের বাল্যকালের একটা বিরাট অংশ এখানে কেটেছে বলে ধারণা
করা হয়। এটা বৈষ্ণবদের সবচেয়ে পবিত্র ভূমি। বৃন্দাবনের কথা রামায়ণ বা মহাভারতে পড়েছে বলে অভি মনে করতে পারল না। দেশে নারায়ন সাহার বাড়িতে কৃষ্ণলীলা হত, সেখানে রাধা-কৃষ্ণ আর চৈতন্য দেবের উপর বিভিন্ন কীর্তনের পালা হত। সেসব পালাতেই অভি বৃন্দাবনের কথা জানতে পারে। এই বৃন্দাবনেই রাধার সাথে কৃষ্ণের
প্রেম। সাধারণ মানুষ প্রেম করে, অবতারেরা করেন লীলা। সেই থেকেই কৃষ্ণের প্রেম হল কৃষ্ণলীলা।
তাছাড়া ওর বাবার নাম বৃন্দাবন, তাই মা একে বৃন্দাবন না বলে বড় তীর্থ বলতেন। তাই কখনও এদিকে না এলেও জায়গাগুলো অভির অজ্ঞাত ছিল না। বৃন্দাবনের পথে ওরা পড়ল বিশাল ট্র্যাফিক জ্যামে। ঘণ্টা দুই তো হবেই। শেষ পর্যন্ত যখন এসে পৌঁছুল রাত জেঁকে বসেছে। অনেকটা অনিচ্ছা সত্বেও অন্যদের সাথে গেল। এখানে কোন মন্দির আছে কিনা ঠিক বোঝা গেল না। কোন এক গলির ভেতর দিয়ে
ওরা এসে হাজির হল একটা বিশাল ঘরে। দক্ষিণ ভারতে ও অনায়াসে জুতো খুলে মন্দিরে ঢুকেছে। এখানে সেই পরিষ্কার পরিচ্ছনতা আর নেই। এক ধরণের অস্বস্তি নিয়ে ওরা ঢুকল সেখানে। তবে সেখানে অভি দেখল একেবারেই ভিন্ন জিনিস। ঘরে বলতে গেলে কোন মূর্তি নেই, দেওয়ালগুলো ছোট ছোট শ্বেত পাথরের প্লেট দিয়ে ভরা, অনেকটা নেম প্লেটের মত। সেখানে বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন কিছু লেখা। এক সময় ওর চোখে পড়ল বাংলায় লেখা প্লেট। সেখানে কেউ বাবা মার জন্য স্বর্গ কামনা করেছে। ওর চোখে পড়ল নিজের এলাকা মানিকগঞ্জের কার লেখা একটা প্লেট। এরপর ও খুঁজতে শুরু করল পরিচিত কোন নাম আছে কি না। পেয়েও গেল ওর পরিচিত এক লোকের লেখা প্লেট। ও বুঝল গয়ায় মৃতদের উদ্দেশ্যে পিন্ডিদানের মতই এখানেও লোকজন আসে মৃত আত্মীয় স্বজনের শান্তি কামনা করতে। অন্তত ঐ মন্দিরে সবকিছু দেখে অভির সেটাই মনে হয়েছে। বৃন্দাবনে ওদের আর কোন জায়গায় নেওয়া হয়নি। তাছাড়া অভি কোথাও যায় মূলত ছবি তুলতে, রাতে যেহেতু সেই সুযোগ নেই – ওর আগ্রহও তেমন ছিল না। পরে অবশ্য অভি দেখেছে দুটো শহরেই বেশ
কিছু সুন্দর সুন্দর মন্দির আছে। আছে দেখার
মত স্থাপত্য। এ জন্যে হলে আবার কখনও এসব জায়গা ভ্রমণ করার ইচ্ছে আছে ওর।
বৃন্দাবন থেকে বেরুতে বেরুতে রাত প্রায় বারোটা। চঞ্চলকে ফোন করে জানিয়ে দিল। দিল্লি ফিরতে আরও ঘন্টা দুয়েক। দুলালকে কথা দিয়েছে কাজানের গল্প শোনাবে। চারিদিকে লোকজন ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছে বাস। অভি আর দুলাল প্রস্তুত হচ্ছে কাজানের রাস্তা ঘাটে ঘুরে বেড়ানোর জন্য।

Comments
Post a Comment