মস্কোর বাংলাদেশি
(১৩)
মস্কোর খবর বলবেন না?
কি জানতে চাও বল?
কারা কারা আছে? কি করছে?
মস্কোয় এখন প্রচুর লোক, যদিও বছর দশেক আগে যত ছিল তার অর্ধেকও নেই। মানুষের ব্যবসা বানিজ্য আগের মত নেই, বিশেষ করে ২০১৪ সালের পর থেকে যখন সম্মিলিত পশ্চিমী দুনিয়া রাশিয়ায় উপর এমবার্গো আরোপ করেছে। অবশ্য এদের বেশির ভাগই ব্যবসায়িক বা চাকরির কারণে মস্কো এসেছে। ভিপুস্কনিকদের সংখ্যাও কম নয়, অনেকেই অন্যান্য শহর থেকে এসেছে। আর যারা প্রথম থেকেই মস্কো ছিল তাদের সংখ্যা তেমন বেশি নয়, জনা চল্লিশেক হবে। আমাদের সার্কেলের লোকের সংখ্যা আরও কম - জনা কুড়ি। এর মধ্যেও অনেকেই চলে যাবে বলে ভাবছে। মস্কোয় আজকাল আর লাভে ক্ষতি হয় না, সত্যিকার অর্থে ক্ষতি হয়। অন্তত ব্যবসায়ী বন্ধুরা তো তাই বলে। তাছাড়া আমি নিজেও মস্কো থাকি না। লোকজনের সাথে দেখা হয় মূলত কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ রাশিয়ার কথা আগেই বলেছি। এছাড়া ছুটির দিনে হলে দুতাবাসের অনুষ্ঠানে যাই। কখনও বা ফোনে কথা হয়। এতো গেল বাংলাদেশী কমিউনিটির কথা। মস্কোর দুর্গা পূজা এখন আরও বড় করে করে ইন্ডিয়ার বন্ধুরা। সেখানে বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের সাথে দেখা হয়। মস্কো অ্যাজ এ হোল বদলে গেছে অনেক, প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। মনে আছে অনেকদিন পরে ২০০৯ সালে যখন রেগুলার মস্কো যেতে শুরু করি, দুবনার ট্রেন থেকে নেমে মেট্রোতে ঢুকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হত স্থানীয় কোন লোকের, মানে মস্কোভিচের দেখা পেতে। এখন তো শহরকে চেনাই যায় না। রাস্তা ঘাট সব অন্যরকম। গাড়ি ঘোড়ার চেহারা অন্য রকম। দোকানপাট সব বদলে গেছে। হাইপারমার্কেটে গেলে মনে হয়না মস্কো আছি। বিদেশী দিয়ে ভরা। কোন কোন মার্কেটে চাইনিজদের সংখ্যা এত বেশি যে মনে হয় চীন দেশে বেড়াতে এসেছি। আর রাস্তাঘাটে, মেট্রোতে অড জব করে মূলত মধ্য এশিয়ার লোকজন। পাবলিক ট্র্যান্সপোর্ট, ট্যাক্সি ড্রাইভার – এসবের একটা বিরাট অংশও মধ্য এশিয়ান। তবে রিনক মানে বাজারগুলো এখনও আজারবাইজান আর জর্জিয়ানদের দখলে। মানুষের পোশাক পরিচ্ছদে বিরাট পরিবর্তন। আগের মত দোকানে বিশাল বিশাল কিউ নেই। মনে আছে ম্যাকডোনাল্ড যখন প্রথম খুলল পুশকিনস্কায়ায় আমরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা? এখন প্রতি পদে পদে ম্যাকডোনাল্ড, কেএফসি, বার্গার কিং, পিতসা। নতুন নতুন রাশান ফাস্টফুডের কর্নার হয়েছে। মুমু এদের একটি। আছে বিস্ত্র। ট্র্যাডিশনাল পুঁজিবাদী দেশে যেমনটা হয় আর কি? আগে লোকজনের হাতে পয়সা ছিল কিন্তু কেনার তেমন কিছু ছিল না। এখন দোকানপাট হাজারো রকমের জিনিসপত্র দিয়ে ভর্তি, শুধু খুব কম মানুষের সামর্থ্য আছে সেসব কেনার। আমাদের ছাত্র জীবনে কলার জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হত, এখন শুধু কলা কেন, সবই পাওয়া যায় – শুধু পয়সা থাকলেই হল। নব্বইয়ের দশকের বিশৃঙ্খল অবস্থার পরে রাস্তাঘাট আবার আগের মতই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, তবে অনেক বেশি সাজানো গোছানো। সর্বত্র একটা মেলা মেলা ভাব। নব্বই-এর দশকে মানুষ যে রকম অ্যাগ্রেসিভ ছিল এখন সেটা নেই। এক কথায় দেশ সামনের দিকে এগুচ্ছে। ধীর গতিতে। তবে অন্যান্য দেশের মতই সমাজের খুব ছোট্ট একটা অংশই এই উন্নয়নের ফসল ঘরে তুলছে, মানে সমাজের বেশির ভাগ মানুষ উন্নয়নের ফসল অন্যের ঘরে তুলছে, স্বল্প মজুরির বিনিময়ে।
যাব একবার মস্কো দেখতে।
চলে এস। আচ্ছা, আমি তো আমার গল্প বলেই সন্ধ্যেটা কাটিয়ে দিলাম। এবার তোমার কথা বল।
আমার কথা আর কি বলব? দেখছেনই তো ভালো আছি। দেশে ফিরে একটা শপিং মল করেছিলাম। বিভিন্ন বিজনেস আছে। কয়েকটা দেশে বাড়ি আছে। নাগরিকত্ব আছে কয়েকটা দেশের। ভালো আছি।
কয়েকটা দেশের নাগিরকত্ব কি ভালো থাকার লক্ষণ, নাকি নিরাপত্তাহীনতার লক্ষণ?
আমি ওভাবে ভাবি নি। মনে হয় এটা সচ্ছলতার লক্ষণ।
কে জানে? কয়েক বছর আগে যখন দেশে ফিরলাম, মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন বন্ধুদের ওখানে থাকতাম। তুমি ওদের চেন। আমাদের সবার শেকড় গ্রাম বাংলায়, মধ্যবিত্ত পরিবারে। তবে এখন সবাই ঢাকায় (মানে যাদের সাথে দেখা হয়েছে)। চাকরি করছে। এক বা দুই সন্তান। নিজেদের ফ্ল্যাট। ছিমছাম পরিবেশ। তবে একটা জিনিস খুব অবাক করল। সবাই কেমন যেন একটা খাঁচায় নিজেকে বন্দী করে রাখছে। মানে নিচে গেটকিপার। উপরে তালা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে অফিসে যাওয়া। এক কথায় পৃথিবীর সব আলো বাতাস, সব কোলাহলকে পর করে তারা নিজেরা সোনার খাঁচার বাসিন্দা হয়েছে। আসলে আমরা যখন দেওয়াল তুলি, সেটা শুধু অনাকাঙ্খিত লোকজনের চলার পথেই বাধা সৃষ্টি করে না, আমাদের নিজেদের গতিবিধিও নিয়ন্ত্রিত করে। তাই আমার কিন্তু মনে হয় সচ্ছলতা শুধু স্বাধীনতা দেয়ই না, কোন কোন ক্ষেত্রে সেটা কেড়েও নেয়। আর সেটা হয় আমরা যদি নিজেরাই নিজেদের টাকার গোলাম বনে যাই।
তাহলে আপনি কি আমার সচ্ছলতাকে ভালো মনে করছেন না?
কি যে বল? মোটেই না। আমি বরং খুশি হই বন্ধুরা সচ্ছল হলে। আর যাই হোক, ওদের দুঃখের কথা ভেবে মন খারাপ করতে হবে না।
তাহলে?
আমার পয়েন্টটা ভিন্ন। আমরা নিজেরা অনেক কষ্টের ভেতর দিয়ে গিয়ে এ পর্যায়ে এসেছি। আমাদের এক ধরনের ইম্যুনিটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েরা কি সেটা পাচ্ছে? সচ্ছলতা নিঃসন্দেহে ভালো। তবে মাঝে মধ্যে একটু দেওয়ালের ওপাশের বাস্তবতার গন্ধ নিলে মন্দ হয় না। ঐ দেখ আমি আবার মাইক্রোফোনটা নিয়ে নিলাম।
না না, ঠিক আছে। বলুন, আমি শুনছি।
গ্রামের বাড়িতে কে আছে? ওদিকটায় যাও?
এখন আর কেউ নেই। বাবা মা মারা গেছেন।
স্যরি!

Comments
Post a Comment