লর্ড অ্যান্ড লুইছিফার

(১৪)

গ্লাস দুটোতে হুইস্কি ঢালতে ঢালতে দুলাল বলে চলল 

বাড়িটা ওভাবেই পড়ে আছে ভাবছি একটা হাসপাতাল করব ওখানে এলাকার লোকজনদের জন্য

আইডিয়াটা খারাপ নয়, তবে ...

তবে কি?

দেখ, হাসপাতাল মানে বিশাল খরচা তাও আবার প্রতিদিন ডাক্তার, নার্স, যন্ত্রপাতি, ওষুধপত্র সে এক এলাহি ব্যাপার এটা যদি তোমার বিজনেস প্রোজেক্ট না হয়, অন্তত ওখান থেকে ইনকামের স্কোপ না থাকে, এর ভবিষ্যৎ অন্ধকার

আপনিও বিজনেসম্যান হয়ে গেলেন?

কি যে বল আমি ভাবছিলাম, তুমি যদি এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাও সেটা কীভাবে এফেক্টিভ করে তোলা যায়?

কোন আইডিয়া?

এমন কিছু করা দরকার যাতে এলাকার লোকজন নিজেরাই সেটাকে সামনে নিয়ে যেতে পারে হতে পারে প্রতি বছর কিছু মেধাবী গরীব ছেলেকে স্টাইপেন্ড দিতে পার ওরা নিজেরা বড় হয়ে এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াবে হতে পারে এমন কোন প্রোজেক্ট যেখান থেকে এলাকার মানুষের আয়ের একটা ব্যবস্থা হয়

ঠিক আছে আমি এখনও কোন সিদ্ধান্তে আসিনি আপনার প্রস্তাবটাও ভেবে দেখব

হুম তোমার বাবার কথা কিছু বলবে না?

যোগাযোগ তো হলই আজ আর না তাছাড়া চাইলেই তো মস্কো আসতে পারি তখন না হয় বলব

এটা আমাদের মনে হয় আমরা সারা জীবন অনেক কিছুই চাই টাকা পয়সা, গাড়ি বাড়ি, সাফল্য – এসব চাওয়ার ভিড়ে বন্ধুর সাথে দেখা করতে চাওয়াটা কখন যে হারিয়ে যায় তা আমরা টেরই পাই না তাছাড়া পারাটাও কিন্তু এত সোজা নয় কাজ থেকে ছুটি ঠিকই নেওয়া যায়, কিন্তু নিজের কাছ থেকে ছুটি নেওয়া খুব কষ্ট একদিক সামলাবে অন্য দিকে আটকে পড়বে তাই চাইলেই পারি – বলাটা যত সহজ করাটা তত নয় তাছাড়া মানুষ যত উঁচুতে ওঠে তার পায়ের নীচ থেকে মাটি তত দূরে সরে যায়, অক্সিজেন কমে আসে, স্বর্গটাও আশেপাশেই ঘোরাফেরা করে নরকটাও

সে আর বলতে! আপনি স্বর্গ নরকে বিশ্বাস করেন?

কেন বল তো?

মানে আগে তো আমরা কেউ এ সবের ধার ধারতাম না এখন অবশ্য অনেকেই ধার্মিক হয়ে গেছে তাই জিজ্ঞেস করলাম

পাপ করে কিনা তাই পাপ না করলে তো আর পুণ্যের জন্য ধর্না দিতে হত না আসলে এখন আমাদের সমাজে ধর্মের চাহিদা প্রবল। ধর্ম এখন শুধু স্বর্গেরই নয়, সামাজিক ভাবে উপরে ওঠার সিঁড়ি। একটা গল্প বলি। একদিন আমার এক কলাবোরেটর এসেছে আমার কাছে। চা খাচ্ছি বসে, ফেসবুকে ছবি দেখছি। একবন্ধুর কপালে কালো দাগ দেখে জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের মেয়েরা কপালে লাল ফোঁটা দেয়, অনেক সময় ছেলেদের কপালেও লাল বা সোনালী (চন্দন) দাগ দেখেছি। কিন্তু এমন কালো ফোঁটা তো দেখিনি। এটা কী?“ কি বলব? হেসে বললাম “এটা স্বর্গে যাওয়ার সিরিয়াল নম্বর। একই সাথে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক।“ তাই ধার্মিক হয়ে গেছে বলাটা ঠিক হবে না, আমি বরং বলব অনেকেই ধর্মের সাথে কন্ট্রাক্ট ম্যারেজে আবদ্ধ হয়েছে। যেকোনো বিয়ের মত এখানেও কেউ সুখী, আবার কেউ সুখের কথা না ভেবে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলছে লোকলজ্জার ভয়ে।     

আপনি আবার এড়িয়ে গেলেন কথাটা স্বর্গ নরকে বিশ্বাসের কথা

আচ্ছা সে নিয়ে ভাবিনি, তবে স্বর্গে যাওয়ার শখ খুব একটা নেই

কেন?

দেখ একদল ওখানে শুধু ভালো ভালো খাবার দাবার আর আরাম আয়েশের কথা বলে, আরেক দল শুধু হুরপরী মানে প্রেম ভালবাসার কথা কথা বলে আমি তো চরমপন্থী মানে এক্সট্রিমিস্ট নই আমার দুটোই চাই তাই ওখানে আমার পোষাবে না  

তার মানে কী এই নয় যে আপনি স্বর্গে বিশ্বাস করেন? আর স্বর্গে বিশ্বাস করলে ঈশ্বরেও!

দেখো, এক সময় আমি ছিলাম যাকে বলে যুদ্ধংদেহি নাস্তিক পরে সময়ের সাথে বুঝলাম বিশ্বাস আর অবিশ্বাস – দুটোই বিশ্বাস, দুটোই যাকে বলে হাইপোথেসিস তুমি দুটোর কোন কিছুই প্রমাণ করতে পারবে না, শুধু যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করতে পারবে কারণ হল এটা গাণিতিক লজিকে অমীমাংসিত সমস্যা গণিতের যেকোনো সমস্যা উপস্থাপন করতে হলে আমাদের কোন ব্যাপারে ঐক্য মতে পৌঁছুতে হয় যেমন আমরা যদি বলি ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণ, তাহলে আমাদের এর আগে মেনে নিতে হবে যে আমরা সমতল ভুমিতে কাজ করছি একই রকম প্রতিটি ক্ষেত্রেই আসলে দুজন লোককে একসাথে চলতে হলেই কিছু কিছু ব্যাপারে সমঝোতায় আসতে হয়। এমনকি তুমি গরুকে গরু লিখবে, না গোরু লিখবে সে নিয়েও আইন জারী করতে হয়, যদিও শুধু গরু কেন, গরুর চৌদ্দ পুরুষের (নারীর) এ নিয়ে একেবারেই মাথা ব্যথা নেই। আমার তো ধারণা গরু আর গোরু – দুজনের দুধের স্বাদও একই রকম।  কিন্তু যে লোক দুই মতের কোন একটাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে সে অন্য মত কখনই মানবে না, আর সবচেয়ে বড় কথা এ নিয়ে তর্ক বিতর্ক করে তুমি কোন সমস্যারই সমাধান করতে পারবে না অযথা মারামারি হানাহানি যেহেতু এখানে দুই পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য কোন আক্সিওমা নেই, তাই এর কোন সমাধানও নেই তাই এসব নিয়ে না ভাবাই ভালো কী করলে মানুষের সমস্যার সমাধান হয়, সেটা নিয়ে ভাবা দরকার জান তো আমি কসমোলজির উপর কাজ করি গবেষণার বিষয় মহাবিশ্বের উৎপত্তি, বিবর্তন, গঠন, পরিণাম – ইত্যাদি যেহেতু মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বে উৎপত্তির মুহূর্তে এক ধরণের সিঙ্গুলারিটির উদ্ভব ঘটে, তাই আমরা এর পরের অবস্থা নিয়ে কাজ করি এই ধর তোমার হাতের দামী আইফোন তুমি যদি ওটা কে তৈরি করল সেটা নাও জান, তাতে তেমন কোন ক্ষতি হবে না, কিন্তু সেটটা কীভাবে কাজ করে সেটা না জানলে তোমার আইফোন থাকাটাই বৃথা কেউ এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছে কি না সে প্রশ্ন শুধু বিভেদেরই জন্ম দেয়। কেউ করুক আর নাই করুক, মহাবিশ্ব এখন নিজের মতই চলছে, কারও সাহায্য ছাড়াই। তাই এর চলার মেকানিজম জানাটাই আসল কথা। সেটা মানব সমাজের উপকারে আসবে। কে সৃষ্টি করল, সেটা না জানলেও তেমন ক্ষতি হবে না। তাই কেউ যদি বিশ্বাস করেও তাদের উচিৎ হবে এমন কিছু না করা যাতে সৃষ্টির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশও ক্ষতগ্রস্থ হয়।  তাছাড়া যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে তারা তাঁকে সবচেয়ে নিখুঁত, সবচেয়ে ত্রুটিহীন, সবচেয়ে দয়ালু, সবচেয়ে করুণাময় হিসেবে কল্পনা করে। অন্যান্য ধর্মের কথা বলতে পারব না, তবে হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থে আমি সেরকমই পড়েছি। বাইবেলেও ঈশ্বর করুনাময়, ভালবাসার অবতার। তবে ওল্ড টেস্টামেন্ট পড়তে গিয়ে একটু ধাঁধাঁয় পড়ে গেছিলাম। এটা টোরার পাশাপাশি ইহুদীদের ধর্মীয় গ্রন্থ। সেখানে ঈশ্বর ছিলেন প্রচণ্ড রাগী, যিনি পান থেকে চুন খসলেই মানুষকে শাস্তি দেওয়ার জন্য উদগ্রীব। তারপরেও সাধারণ মানুষ ঈশ্বরকে দয়ালু, করুণাময়, ক্ষমাশীল বলেই বিশ্বাস করে। আবার একই সময় ঈশ্বরের নাম নিয়েই তাঁর ভক্তরা হাজার হাজার মানুষ খুন করে একই ঘটনা ঘটায় যারা অন্য পথে গিয়ে মানবতাবাদের কথা বলে আবার মানবাতার নামেই ভিন্ন মতের লোকজনদের কচুকাটা করে সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র – এসবের নামে কী কম মানুষ খুন হয়েছে? তাই আমার সব সময়ই প্রশ্ন জাগে মানুষ ঠিক কোন ঈশ্বরে বিশ্বাস করে। তাদের ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান হয়, কেন মানুষকে ঈশ্বরের মান রাখতে, তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতে অন্যদের খুন করতে হবে। গীতায় তো তিনি নিজেই বলেছেন “যখন পৃথিবী পাপে পরিপূর্ণ হয় তখন দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য আমি যুগে যুগে আবির্ভূত হই।“ এটাই যদি হয় তাহলে তাঁর ভক্তদের কেন  ঈশ্বরের কাজটা নিজেদের করতে হবে? এ প্রসঙ্গে আমার প্রায়ই ১৯৯৭ সালের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে। আমি সেবার পুনা গিয়েছিলাম একটা কনফারেন্সে। ভাবলাম দেশ হয়েই যাই। তাই মস্কো থেকে ইন্ডিয়ার ভিসা নিয়ে আসিনি দেশে করে নেব বলে। এখানে এসে দেখি বিশাল সিরিয়াল। এক বন্ধুকে বললাম ভিসা করে দিতে। ও ভিসা করিয়ে দিল দালালের মাধ্যমে। আমি ফ্লাই করলাম কলকাতার পথে। এয়ারপোর্টে এসে দেখি আগের ফ্লাইটে সীট খালি। ওরাই বলে কয়ে প্লেনে উঠিয়ে দিল। কোলকাতায় নেমে দাঁড়ালাম কাস্টমসে। আমার অবশ্য তাড়া ছিল না। দাদারা জানতো আমি পরের ফ্লাইটে আসব, তাই সেভাবেই নিতে আসবে। সবাই প্রায় বেরিয়ে গেছে। এবার এল আমার পালা। আমি স্বাভাবিক ভাবেই ডিক্লিয়ার করেছি পুনা যাব। হয়তো এখান থেকেই সন্দেহ শুরু। রাতের বেলা, কীভাবে যাব ইত্যাদি। যাহোক, শেষ পর্যন্ত বলল “আপনার ভিসা জাল”। “মানে?” পাশে অন্য এক অফিসারের কাছে আরেক ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে দেখিয়ে বলল, “ওর ভিসার নম্বর আপনার চেয়ে কম, অথচ ভিসা পেয়েছে আপনার পরে।“ লজিক আর কি? আমি বললাম, “আপনি তো দুটো ঘটনা দিয়ে বলতে পারেন না কার ভিসা জাল আর কার ভিসা জাল নয়। এর জন্যে কম করে হলেও আরেকটা ভিসা দরকার।“ ওরা জিজ্ঞেস করল, “আপনি নিজে ভিসা করেছেন”। উপায় ছিল না, বললাম “নিজে”। সেই সাথে পুনার ইন্টার ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রনমি ও অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের আর ভুবনেশ্বর ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ফিজিক্সের ইনভাইটেশন দেখালাম। ওখানে আমার ইন্সটিটিউটের নাম লেখা ছিল। বললাম আমি রাশিয়া থাকি। এমনকি বউ ছেলেমেয়ের ছবিও দেখালাম। হঠাৎ এক লোক জিজ্ঞেস করল, “আমি যাই এর রুশ কি?” বললাম। তারপর উনি জিজ্ঞেস করলেন “রাতে পুনা কীভাবে যাবেন? টিকেট আছে?” বললাম, দাদাদের ওখানে থাকব। নিতে আসবে। আমি আগের ফ্লাইটে চলে এসেছি তাই দেরি হচ্ছে। এরপর আমাকে ফোন করতে দিল। বউদি ওদের সব খুলে বলার পর ছাড়া পেলাম। আমি ঐ ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি রুশ জানেন?” “না।” “তাহলে জিজ্ঞেস করলেন যে?” আপনার উত্তর দেখেই বুঝলাম ভাষাটা আপনি জানেন।“ এয়ারপোর্ট থেকে বেরুনোর পর ঐ ছেলেটা এত করে আমাকে ধন্যবাদ দিতে শুরু করল, যে মনে হল ওর ভিসারই কোন সমস্যা ছিল। বুঝলে এ গল্প কেন করলাম?  
না তো।
আমরা কিন্তু শুধু ঈশ্বর আর শয়তানের ধারণা থেকে একজনকে বেছে নিচ্ছি। ধার্মিকেরা ঈশ্বরকে কল্পনা করে দয়ালু, করুণাময় হিসেবে, কিন্তু তাঁর নামে যেসব কাজ করে তাতে মনে হয় ধার্মিকেরা প্রায়ই পথ ভুলে শয়তানের ডাকে সাড়া দেয় আর ঈশ্বর ভ্রমে শয়তানের আজ্ঞাবাহী হয়। 

 



Comments

Popular posts from this blog

সোভিয়েত থেকে রাশিয়া

কাজান

আগ্রা মথুরা বৃন্দাবন