সুখ

(১৫)

এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল

দোস্ত, আমার কাজ শেষ তুমি কোথায় আছ?

দুলাল আমার হাত থেকে ফোনটা নিল

ভাই, আপনি বাসায় চলে যান আরেকটু আড্ডা দিয়ে আমি অভিদাকে আপনার বাসায় পৌঁছে দেব আপনার অসুবিধা হবে না তো?

দুটো গ্লাসে ভদকা ঢেলে দুলাল বলল

খুব ভালো লাগল আপনার সাথে কথা বলে একটুও বদলাননি গত পঁচিশ বছরে মনে হচ্ছিল যেন নিজেই সেই যৌবনে ফিরে গেছি আমি কারো সাথে যোগাযোগ রাখতে চাই না, তাই ভাইকে বাসায় ডাকলাম না আমি যাচ্ছি না আপনার সাথে ড্রাইভার আপনাকে পৌঁছে দেবে আমাদের বন্ধুত্ব অটুট থাকুক! চিয়ার্স! তবে তার আগে আরও দু একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই

বল

কেমন আছেন, এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি প্রায়ই বলেন আপনার একটাই অপশন - ভালো থাকা এ ব্যাপারে যদি একটু বলতেন

তুমি মনে হয় বিশ্বাস কর মানুষ সবচেয়ে বেশি মিথ্যা বলে উপাসনালয়ে আর মন খুলে সত্য কথা বলে সরাইখানায়?

হঠাৎ এ পশ্ন?

তুমি একথা আমকে আগেও জিজ্ঞেস করতে পারতে কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ধরে রেখেছ যাতে একটু বেশি পান করে আমি অনেক বেশি রিল্যাক্সড হই, তাই তো? যাকগে ঠাট্টা করলাম আমার লুকনোর তেমন কিছু নেই তাই কী পানের আগে, কী পানের পরে – কথাগুলো মোটামুটি একই রকম তবে ঐ যে বললাম না, লুকনোর কিছু নেই, সেটাও একেবারে সত্যি নয় আমরা তো আর রবিনসন ক্রুসো নই আমাদের জীবন মানে ইন্টার‌্যাকশন বা মিথস্ক্রিয়া কখনও নিজের সাথে নিজের কথা বলা, তবে অধিকাংশ সময়ই অন্যদের সাথে বোঝাপড়া তাই একজনের জন্য কোন কথা ক্ষতিকর না হলেও অন্যের জন্য সেটা হতেই পারে ভালো বন্ধুরা সেটা মনে রাখে, আর মনে রেখেই কতটুকু প্রকাশ করবে বা করবে না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয় যারা সেটা করে না, বা করতে পারে না, তাদের আর যাই থাকুক বন্ধু হিসেবে ইন্টিগ্রিটি নেই আর ইন্টিগ্রিটি বস্তুটা না থাকলে বন্ধু হওয়া যায় না বন্ধুকেও অনেক সময়ই পারটিজান হতে হয়, মানে অনেক কথা সমাধির মত গোপন রাখতে হয় যাকগে, জানতে চেয়েছিলে আমি সত্যিই ভালো আছি কি না, ভালো থাকি কি না – তাই তো?

হ্যাঁ

আমার উত্তর জানার পরেও যেহেতু প্রশ্নটা করলে, তার মানে সেটার আন্তরিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন আছে ভাবছ আমি জোর করে নিজেকে সুখী বা খুশি দেখানোর চেষ্টা করছি তাই না?

হ্যাঁ আসলে আপনাকে খুব ভালভাবে আমি জানি আর জানি বর্তমান বাজারে টাকার মূল্য ছাত্রজীবনে না হয় একা ছিলেন, এখন সংসার আছে নিজে আদর্শ ধুয়ে জল খেয়ে বাঁচতে পারলেও ছেলেমেয়েরা তো পারে না তাই!

দেখ, নব্বইয়ের দশকে যখন অবস্থা যারপর নাই খারাপ ছিল, যখন হাতপাতার কোন জায়গা ছিল না, মাঝে মধ্যে নিজেকে অসহায় মনে হত কেননা তখন দুবনায় চলে গেছি, পরিচিত মানুষজন তেমন নেই। যাও দু একজন আহচে সবাই একই চাকরি করি, বেতন পেলে সবাই এক সাথে পাই, না পেলেও সবাই একসাথে খালি হাতে বসে থাকি তখন আমার বস আমার বউকে বলত “অভি কী “হলি সোল” (святой дух) খেয়ে বাঁচে নাকি?” আসলে ঘটনা ওখানে হয় আমি যখন সুখের কথা বলি, সেটা অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলি আমি যে সমস্যা নিয়ে কাজ করি, সেখানে প্রায়ই সেলফ কনসিস্টেন্ট সমাধান খুঁজি এর মানে হল অংশগ্রহণকারী সবাই একে অন্যকে বদলায় স্পেস-টাইম যেমন ম্যাটারের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তন করে, ম্যাটারও তেমনি স্পেস-টাইমের জ্যামিতি বদলায় তোমার মনে আছে আমাদের বন্ধুত্বের প্রথম দিকের কথা? আমরা অনেক কাজই একসাথে করতাম, কখনও তুমি উদ্যোগ নিতে, কখনও আমি প্রতিটি মানুষই স্বতন্ত্র যত মিলই থাকুক না কেন, দুজনের মধ্যে অমিলও কম থাকে না একজন মানুষ যখন আরেকজনের সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়, সে তখন যেসব বিষয়ে তাদের মিল আছে সেগুলো খোঁজে, আর শত্রুতা করতে চাইলে অমিলগুলো খোঁজে ভালো বন্ধু গুনগুলো খুঁজলেও দোষগুলো অন্ধভাবে গ্রহণ করে না, সময় সুযোগে সেটা বলে, সাহায্য করে দোষগুলো কাটিয়ে উঠতে তাই বন্ধুত্ব মানে শুধু সম্মতি নয়, অসম্মতিকে গ্রহণ করার মানসিকতা এক সময় আমাদের বন্ধুত্বে যে ফাটল ধরেছিল তার কারণও আমরা একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করিনি, নিজেদের মত করে একে অন্যেকে দেখেছি আর নিজের কল্পনা আর বাস্তবে অমিল দেখে কষ্ট পেয়েছি, একে অন্যের থেকে দূরে চলে গেছি যাক ফিরে আসি আমার কথায় বাবা বলতেন “নিজের বিবেকের কাছে সৎ থেকো এমন কিছু করো না, যাতে পরে নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হয়“ আমি সে কথাটাই মেনে চলি যেকোনো ব্যাপারে মনে প্রশ্ন জাগলে অন্যের পরামর্শ নিই, কিন্তু সিদ্ধান্তটা নিজেই গ্রহণ করি তাই ভাল বা মন্দ, সাফল্য বা ব্যর্থতা – কোন কিছু গ্রহণ করতেই আমার কষ্ট হয় না, কেননা আমি জানি জীবন থেমে থাকে না, থেমে থাকবে না ভালো না থাকলে কখনই নতুন সুযোগ গ্রহণ করতে পারব না তাই বলি ভালো থাকাটাই আমার একমাত্র অপশন এতে ভাল বা মন্দের কিছু নেই, এরসাথে আর্থিক, সামাজিক বা অন্য কোন অবস্থা জড়িত নয় এটা স্টেট অফ মাইন্ড, ফ্রেম অফ মাইন্ড – বলতে পার জীবনদর্শন এটা কীভাবে আমার কাছে এসেছে জানি না একদিনে আসেনি মনে আছে রানার কথা? ওকে তুমি চিনতে আমার ক্লাসমেট পশ্চিম বঙ্গের ও যখন আমেরিকা চলে যায় আমার কাছে কিছু বই রেখে যায়। সুকুমার রায়ের “হজররল”, “ভাগবত গীতা” ইত্যাদি গীতায় একটা শ্লোক আছে,

কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন
মা কর্মফলহেতুর্ভূর্মা তে সঙ্গোহস্ত্বকর্মণি||
 

অর্থাৎ কর্মেই তোমার অধিকার, কর্মফলে কখনও তোমার অধিকার নাই। কর্মফল যেন তোমার কর্মপ্রবৃত্তির হেতু না হয়, কর্মত্যাগেও যেন তোমার প্রবৃত্তি না হয়।


ওখানে রানা লাল কালি দিয়ে লিখেছিল “হাস্যকর”
এ কারণেই কিনা জানি না, তবে কথাটা আমার মনে গেঁথে যায়, যদিও স্কুলে ধর্ম বইয়ে এটা অনেকবার পড়েছি সময়ের সাথে সাথে সেই শ্লোকের প্রতি আমার ধারণা বদলিয়েছে। আসলে শুধু গীতাই নয়, বিভিন্ন লোক গীতা বা অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থের বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা দেন। এক সময় আমি নিজেও এই শ্লোকের একটা ব্যাখ্যা নিজের জন্য তৈরি করি। তাহল “কাজের আনন্দে কাজ কর। যে কাজ করে কেউ আনন্দ পায়, সে কাজটা সে করে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে। এভাবে কাজ করলে দু দিন আগে হোক আর দু দিন পরে হোক, এর সুফল সে পাবেই পাবে।“ আমার বিশ্বাস প্রতিটি মানুষ যদি নিজের কাজটা সঠিক ভাবে সম্পন্ন করে,  ছাত্র যদি ঠিক মত পড়াশুনা করে, ডাক্তার যদি সঠিক ভাবে চিকিৎসা করে, ব্যবসায়ী যদি কাউকে না ঠকিয়ে ব্যবসা করে, এক কথায় সবাই যদি নিজ নিজ কাজ সঠিক ভাবে করে যায়, শুধু ব্যক্তি জীবনে নয়, সমাজ জীবনে শান্তি আসতে বাধ্য। কার্ল  মার্ক্সের সাম্যবাদের স্লোগান “সবাই তার সাধ্যমত কাজ করবে আর প্রয়োজন মত গ্রহণ করবে” (From each according to his ability, to each according to his need) এর থেকে খুব দূরে নয়। হতে পারে আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই আমাকে গীতার শ্লোকটা এভাবে ব্যাখ্যা করতে অনুপ্রাণিত করেছে। আসলে ধর্ম গ্রন্থকে আমরা ডগমা হিসেবে না নিয়ে যদি যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত দর্শন হিসেবে নিই, অনেক সমস্যাই আর সমস্যা থাকে না। সমস্যা হয় যখন কোন কিছুতে আমরা অন্ধভাবে বিশ্বাস করি। God helps those who help themselves – এটাও একটা মটিভেশনাল কথা। কিন্তু ধার্মিকেরা কী করে? নিজেদের সমস্যাগুলো নিজের কাঁধ থেকে ঈশ্বরের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। আসলে ঘাড় আর কাঁধ পাশাপাশি থাকার এই এক ঝালেমা। অধিকাংশ মানুষ নিজের সমস্যা সমাধানের জন্য অন্যের কাঁধ খোঁজে, কিন্তু তার সমস্যার বোঝাটা কেউ নিজের কাঁধে নিতে না চাইলে সে তার ব্যর্থতার বোঝাটা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে শান্তি পেতে চায়।

মনে পড়ে একসময় যখন ছবি তুলতাম, রেজাল্টটাই ছিল মুখ্য, মানে ভালো ছবি পাচ্ছি কিনা ফলে অনেক সময় দেখা যেত কোন এক্সারশনে গিয়ে শুধু ছবি তুলেই গেছি, ক্যামেরার বাইরে কিছু দেখা হয়নি ফ্যামিলি নিয়ে যখন কোথাও ঘুরতে গেছি, সবাই ঘুরছে আর আমি ছবি তুলতে ব্যস্ত। এখন ক্যামেরা নিয়ে বাইরে গেলে মূলত প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করি আর ভালো লাগে কিছু ছবি তুলি একই ঘটনা অন্য সব ক্ষেত্রেও যাই করি না কেন, সেটা উপভোগ করি, উপভোগ করার চেষ্টা করি এই যে নিজের সাথে এক ধরণের হারমনি তৈরি করা, সেটাই হয়তো আমাকে আমার মত করে থাকতে দেয় আসলে এ বিষয়ে চাইলে আমার সাথে একমত হতে পার আবার দ্বিমতও পোষণ করতে পার জীবনটা আসলে অন্ধের হাতি দেখার মত হাত দিয়ে হাতির যে অংশ স্পর্শ করেছে সে হাতিকে সেভাবেই কল্পনা করেছে আমরা নিজেরাও নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে জীবনের ভালো মন্দ দেখি, সেভাবেই নিজ নিজ ধারণা গড়ে তুলি অধিকাংশ মানুষ ভাবতে চায়না, তারা সুখ দুঃখের গড়পড়তা সংজ্ঞা মেনে অন্যকে সেই বাটখারায় মাপে, কিন্তু চিন্তাশীল মানুষ চলে নিজের পথে কখনও উল্টা স্রোতে, কখনও মূল রাস্তার পাশে যে সরু রাস্তা আছে সে পথে, নিজের মত করে   




         

Comments

Popular posts from this blog

সোভিয়েত থেকে রাশিয়া

কাজান

আগ্রা মথুরা বৃন্দাবন