অর্থ ও অর্থহীনতা

(১৬)

আরেকটা প্রশ্ন করব?
অবশ্যই
আপনি তো আস্বীকার করেন না যে বাঁচতে গেলে টাকাপয়সা দরকার কিন্তু আপনার কথা বার্তায় এক ধরনের উন্নাসিক ভাব, যেন টাকাপয়সা এটা কোন ভাবনার বিষয় নয়  এটা কি ঠিক তাই, নাকি এক ধরণের ভাব দেখানো?

যেহেতু তোমার মনে হচ্ছে ভাব দেখানো, তার মানে তুমি সেভাবেই ভাবছ সে অধিকার তোমার আছে সেটা যে কেউই ভাবতে পারে তোমার ধারণা ভুল প্রমাণ করার ইচ্ছে আমার নেই যেটা আমি পারি, সেটা নিজের ভাবনাটা বলা বিশ্বাস করা না করা সেটা তোমার ব্যাপার

বলুন

দেখ, টাকাপয়সার দরকার নেই সেটা আমি কখনোই বলিনি শুধু তাই নয়, আমি খুব ভালভাবে সেটা জানি, অনুভব করি তোমরা অনেকেই ব্যবসা শুরু করেছ অর্থনৈতিক কারণে চাকরি করে, বিশেষ করে আমার মত চাকরি করে সংসার চালানো যে কঠিন সেটা তোমরা জানতে বলেই অন্য লাইনে চলে গেছ নব্বইয়ের দশকে এমন সময়ও গেছে যখন ইনফ্ল্যাশনের ধাক্কায় মাসের অর্ধেক বাকি থাকতেই বেতন শেষ হয়ে গেছে, অনেক সময় বেতন দিতে দেরি করেছে ছেলেমেয়েরা ছোট ছিল অসহায় বোধ করতাম, কিন্তু বিশ্বাস হারাইনি এখন বেতন বেড়েছে, নুন আনতে পান্তা ফুরায় না তবে সেসব দিনের কথা মনে করে খারাপ লাগে তখন কোন কোন দিন আমাদের নির্ভর করতে হয়েছে পাশের বনের গ্রিবি (ব্যাঙের ছাতা) আর বুনো ফলের উপর কিন্তু এ নিয়ে সংসারে অশান্তি ছিল না কষ্টগুলো আমরা হাসিমুখে ভাগ করে নিয়েছি এখন কখনও যদি ওদের জিজ্ঞেস করি সেসব দিন নিয়ে ওদের কোন অভিযোগ আছে কিনা, ওরা বলে «পাপা, তোমার তো চেষ্টার ত্রুটি ছিল না, তুমি তো কী তখন, কী এখনশেষ কোপেকটা আমাদের জন্য দাও»  আসল কথাটা ওখানেই কাছের মানুষদের বোঝানো, তাদের সাথে পাওয়া আসল কথা কি জান, তুমি যাদের জন্য কর, যাদের সাথে থাক, তারা যেন তোমার ভালবাসাটা, তাদের জন্য তোমার কেয়ারটা ফিল করে এই বিশ্বাসটা যেন থাকে যে তোমরা একে অন্যের জন্য খুব জরুরী

কিন্তু এসব করতে হলে তো টাকাপয়সা দরকার

অবশ্যই কিন্তু প্রশ্ন হল কতটা দরকার ছাত্র জীবনে আমার কাছে কয়েকশ' ডলার ছিল ঘরেই পড়ে থাকত আমাদেরই এক বন্ধু, যে প্রায়ই সিঙ্গাপুর যেত, মাঝে মধ্যে টাকাটা নিত, ফিরে এসে দিয়ে দিত তখন তিন চারশ ডলারে ওখানে কিছু কিনে এনে কয়েকগুন বেশি দামে বিক্রি করা যেত কখনও কখনও আমাকে এক শ, দু' শ রুবল দিয়ে বলত কিছু কিনতে একবার ও আমাকে জিজ্ঞেস করল, «আমি আপনার টাকা নিয়ে জিনিস এনে বিক্রি করে অনেক লাভ করছি আপনি যান না কেন?» «আচ্ছা, তুমি বলতে পার, কত টাকা হলে তোমার আরও উপার্জন করার ইচ্ছে পূরণ হবে?» «এই ধরুন, মিলিয়ন ডলার» «আমি জানি না, ঠিক কত টাকা হলে আমার আশা মিটবে তবে দু এক মিলিয়নে মিটবে বলে মনে হয় না তাই আমি বরং পড়াশুনা করব, বিশ্বটা জানার চেষ্টা করব» আসলে সমস্যা ওখানেই আমি যখন জানার সন্ধানে বেরুই, পড়াশুনা করিএই প্রশ্ন আমাকে ভীত করে না, টাকাপয়সার ক্ষেত্রে সেটা হয় তাই আমি চেষ্টা করি নিজের চাওয়াটাকে সাধ্যের মধ্যে রাখতে পাওয়াটা আমাদের হাতে না, সেটা অনেক বাহ্যিক ফ্যাক্টরের উপর নির্ভরশীল, চাওয়াটা একান্তই আমার যদি কোন কিছু খুব করে চাই, অপেক্ষা করলে সেটা এক সময় পাই অন্তত এতদিন পর্যন্ত সেটাই হয়েছে আমি অপেক্ষা করতে জানি দুলাল

তার মানে আপনি যা আছে তাই নিয়ে খুশি
ঠিক তা নয় আমার শিক্ষক শিকিন বলতেন, জীবনে কখনোই পুরোপুরি কন্টেন্ট, মানে সন্তুষ্ট হতে নেই উনি বলতেন অবশ্য গবেষণার প্রেক্ষাপটে যখন তুমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হবে তখন কোন কিছুর প্রতি আর আগ্রহ থাকবে না আর আগ্রহ না থাকলে সামনে চলার, নিজেকে আরও উৎকর্ষ করে গড়ে তোলার মোটিভেশন থাকবে না এই যে আমরা রিসার্চ করি, সেটাও তো নতুনকে জানার জন্য বা প্রচলিত জ্ঞানকে আরেকটু সঠিক করার জন্য একজন বিজ্ঞানীর মন্ত্র হচ্ছে «আমি জানি না, কিন্তু জানতে চাই আমার জানাটাকে আরও সুক্ষ করতে চাই» তার মানে কি? প্রচলিত ধারণাকে অস্বীকার করে নতুন ধারণা খোঁজা, সেটা অংক দিয়ে প্রমাণ করা যদি প্রমাণ করতে পার ভালো, না পারলে প্রচলিত ধারণা স্বীকার করে নেওয়া জীবনেও তাই যেটা আছে সেটা নিয়ে চলা, সেটাকে ভালোর দিকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করা, কিন্তু যদি না পার, এতে ভেঙ্গে পড়ার কিছু নেই আমি বাচ্চাদের বলি, পৃথিবীতে সাত বিলিয়ন মানুষ কয়েক বিলিয়ন আমাদের চেয়ে ভালো আছে, কয়েক বিলিয়ন খারাপ আমাদের চেয়ে যারা ভালো আছে তাদের দিকে তাকানোর সাথে সাথে যারা খারাপ আছে তাদের দিকে তাকিও আর ভেবো তারা কিন্তু এরপরেও বেঁচে আছে জীবন শুধুমাত্র টাকাপয়সা নয় জীবন অসংখ্য ঘটনার সমাবেশ, কিছু বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কিছু কম কিন্তু গুরুত্বহীন বলে কিছু নেই টাকাপয়সার ব্যাপারটাও তেমনি তুমি যখন কিছু জান, জ্ঞান অর্জন কর সেটা তুমি নির্দ্বিধায় অন্যদের মাঝে বিলিয়ে দিতে পার, এতে তোমার জ্ঞান কমবে না, কিন্তু টাকাপয়সা একদিন শেষ হয়ে যায় জানই তো আমি খুব স্বার্থপর মানুষ টাকাপয়সা যদি সব শেষ করতে না পারি, মৃত্যুর সময় সাথে করে নিয়ে যেতে পারব না, জ্ঞানটা পারব তবে সেটা কোথাও কোন কাজে লাগবে কি না সেটা অন্য ব্যাপার সেদিক থেকে ভাবলে কত মানুষই তো প্রচুর পড়াশুনা করে, একের পড় এক ডিগ্রী নেয়, কিন্তু তাদের কয় জন লব্ধ জ্ঞানকে কাজে লাগায় বা লাগাতে পারে? আরও একটা ব্যাপার। এক্ষেত্রে পরিবারের সহায়তা, তাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং খুব দরকার। মস্কোয় এ নিয়ে সমস্যা নেই। আমার স্বল্প আয়ের জন্য কেউ কিছু বলে না। দেশে এলে তো খালি হাতেই আসি। বাড়িতে আমি সাহায্য করব কি, ওরাই আমাকে সাহায্য করে। অনেক সময় সোভিয়েত ফেরত বন্ধুরাও করে। একবার বাড়ি থেকে বলেছিল “ওখানে এত কষ্ট করে থাকিস বাইরে চলে গেলেই তো পারিস।” আমার উত্তর, “লোকজন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য পাগল। আমি মস্কো যাই ইঞ্জিনিয়ার হতে আর প্লেন থেকে নেমেই বলি সাবজেক্ট চেঞ্জ করে ফিজিক্সে পড়ব। সবাই অবাক হয়েছিল, আমি বাদে। আমি যেদিন সেই সিদ্ধান্ত নিই, টাকাপয়সার সাথে একরকম সম্পর্ক চুকিয়েই নিই।” এরপর আর কেউ কোন এ নিয়ে কথা বলেনি, বলে না। অনেক সময় পাড়া প্রতিবেশিরা অবাক হয়, কিন্তু আমি তো কখনই কে কি ভাবছে এ নিয়ে ভাবি না। কাছের মানুষদের, প্রিয় মানুষদের সার্বিক সমর্থন হয়তো আমাকে এভাবে বলতে, ভাবতে দেয়।


জীবনের অর্থ খুঁজে কেউ হিমালয়বাসী
টাকার পাহাড়ে কেউ হাসে অট্টহাসি
কেউ বা অর্থ খোঁজে গ্রন্থে আর কথায়
কেউ কেউ সেটা পায় পথ চলার ব্যথায়
অর্থের রকম ভেদে যে যার পথে যায়

নির্বোধ সে সব পথ যে এক করতে চায়


যাকগে এবার উঠতে হয় ফোন কর, কথা হবে।    

 
   

Comments

Popular posts from this blog

সোভিয়েত থেকে রাশিয়া

কাজান

আগ্রা মথুরা বৃন্দাবন