পূর্ণতা

(১৭) 

সত্যি উঠবেন?

কেন বলতো?

আরও কিছু কথা জানার ছিল

তাই? কি কথা?

১৯৮৫ সালে আপনার সাথে যখন প্রথম পরিচয় হয়, তখন আপনি ছিলেন কট্টর সমাজতন্ত্রী কিন্তু এখন মনে হয় অনেকের চেয়ে অনেক বেশি লিবারেল কী বদলালো?

সোজা উত্তর হতে পারত, দেশ বদলালো বা সে দেশই নেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, যদিও পতন শব্দটি ঠিক হবে না, কেননা দেশ নেই, তবে আমরা আছি, আছে তৃতীয় বিশ্বের স্বাধীন দেশগুলো, এমন কি পুঁজিবাদী পশ্চিমা বিশ্ব যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের কারণে নিজেদের পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে, তাই সোভিয়েত ইউনিয়নের একটা সুদূর প্রসারী প্রভাব, আমি বলব পজিটিভ প্রভাব রয়ে গেছে, থাকবে যুগ যুগ ধরে যাহোক, দেশটা যখন নাই হয়ে গেল, দেশে দেশে বামপন্থীরা দক্ষিণে ঘেঁষে গেল, তাই আমার বদলানো একটা সহজ উত্তর ওখানেই হতে পারত ছাত্রজীবনে একমনা ও সিপিবির সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত থাকায় ভেতরের অনেক কিছুই দেখেছি তাছাড়া মস্কো থাকার ফলে সিপিবি, ন্যাপ সহ বিভিন্ন বাম দলের প্রথম সারির নেতাদের খুব কাছ থেকে দেখেছি। যখন তুমি দূর থেকে কিছু দেখ তখন তার একটা জেনারেল চিত্র পাও, কাছ থেকে দেখলে অনেক ডিটেইলস বেরিয়ে আসে যেটা সব সময় সুখকর নয়। আমি অনেক সময় মানুষের ছবি তুলি, বিশেষ করে মেয়েদের। সুন্দরী, পূর্ণ যৌবনা। কিন্তু যখন ফটোশপে এডিট করি, ধরা পড়ে অনেক বিচ্যুতি যেটা জীবনেও দেখার সম্ভাবনা ছিল না। তাই খুব কাছ থেকে দেখার পড়ে বাম রাজনীতির ভালোর সাথে সাথে মন্দ দিকটাও চোখে পড়ে কিন্তু তুমি যখন ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে কোন কালেক্টিভে ঢোক আর সেখানেও বিভিন্ন রকম অযৌক্তিক কাজকর্ম দেখ, মনে বিভিন্ন প্রশ্ন জাগে আগেই বলেছি, আমি যাকে বলে টপ টু বটম একজন পদার্থবিদ মানে আমার জীবনের সব কিছুর ব্যাখ্যা আমি  ফিজিক্সের নিয়মে ফেলেই করি এর মধ্যে আমি আপেক্ষিক তত্ত্ব পড়লাম, কোয়ান্টাম থিওরি পড়লাম, জানলাম ওয়েভ- পারটিকল মেকানিজম, হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার সুত্র, মনে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দিল  বলতে পার ডগমা থেকে বেরিয়ে এসে আমি প্রশ্ন করতে শিখলাম, এমনকি আজ যেটা অসম্ভব সেটাও যে একদিন সম্ভব হতে পারে সমাজ জীবনেই, সেটার সম্ভাবনা আর উড়িয়ে দিলাম না তাই ধীরে ধীরে নিজে বদলে গেলাম আর এই বদলে যাওয়ার মধ্য দিয়েই সমাজতন্ত্রের আদর্শ, মার্ক্সিজম নতুন ভাবে চিনতে, বুঝতে ও গ্রহণ করতে শিখলাম একটু অন্য কথা বলি ফটো প্রিন্ট করার জন্য সেটা বিশেষভাবে এডিট করতে হয় সেজন্যে কম্পিউটার স্ক্রিন বিশেষ ভাবে আডজাস্ট করতে হয় যদিও প্রিন্ট করে সিএমওয়াইকে (CMYK) কালার স্পেসে, আমরা সেটা রেডি করি আরজিবি (RGB) স্পেসে ওখানে কালো থেকে সাদা প্রচুর টোন কালোয় লাল, সবুজ আর নীল – সব গুলোর মান শূন্য, সাদার এদের সবার মান ২৫৫ মাঝামাঝি ৫০% গ্রে, যেখানে সবার মান ১২৮ করে এরপরেও আছে অসংখ্য কম্বিনেশন এই যে বিভিন্ন টোন, বিভিন্ন কম্বিনেশন সেটাই ছবিকে ছবি করে তোলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি যত রিজিড, দেখার শক্তি তত কম, উদার দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের গভীরভাবে সবকিছু দেখতে শেখায়, আমাদের জ্ঞানকে বা জ্ঞান অর্জনের পরিসরকে বাড়িয়ে দেয়  

কিন্তু সেটাও তো সম্ভব হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়েছেন বলেই তাই নয় কি?

দেখ, এই প্রশ্নটাই ভুল আসলে যেকোনো প্রশ্ন যার উত্তর হ্যাঁ বা না শব্দের মধ্যে দেওয়া যায়, সে প্রশ্নই ভুল এ অর্থে যে এখানে তোমার চিন্তা করার, ভাবার সুযোগ থাকে না এটা সেই সাদা কালোর মত আর জীবন প্রচণ্ড কালারফুল তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? এ প্রশ্ন করে আমরা সঠিক  উত্তর পাচ্ছি না মনে আছে স্কুলে অংক করার সময় দশমিকের পরে তৃতীয় ঘরে, মানে সহস্রাংশে পাঁচের কম হলে সেটা আমরা শূন্য আর পাঁচের বেশি হলে ১০ ধরতাম মানে ৫০% গ্রের নীচে সব কালো আর উপরে সব সাদা ভাবতে পার কত ইনফরমেশন আমরা এভাবে হারাচ্ছি? কিন্তু ব্যখ্যা করার সুযোগ থাকলে তোমার পশ্নের উত্তর বিভিন্ন রকম হতে পারে প্রতিটি মানুষ নিজের জায়গা থেকে উত্তর দেয় তবে যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের সব ভালো দেখে, দেখতে চায় সেটাও যেমন ক্ষতিকর, আবার যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের সব খারাপ বলে – সেটাও ক্ষতিকর আমি ইন্ডিভিজুয়ালিস্ট আমি কখনো নামী দামী স্কুল কলেজে পড়িনি গ্রামের স্কুল, এলাকার কলেজ, যদিও মানিকগঞ্জ সরকারি স্কুল বা ঢাকা কলেজে পড়তে কোনই সমস্যা ছিল না ঢাকা কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে সব ঠিকঠাক করে শেষ মুহূর্তে ভাইকে বললাম, আমি বাড়ি থেকে পড়ব, মানিকগঞ্জ ভর্তি হব গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ও আহামরি কিছু নয় কিন্তু নিজের আগ্রহের কারণেই চেষ্টা করেছি যতদূর সম্ভব জানার আমাদের সাথে দেশি বিদেশি কত ছেলেমেয়েই তো ছিল এখন অনেক ভালো ভালো চাকরি করছে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিন্তু কথা হল, আমি বা আমরা যে যা হয়েছি সেটা নিজেদের কারণেই – সেটা ভালই হই আর মন্দই হই আমাদের সবাই কিন্তু সফল হইনি, সবাই ব্যর্থও হইনি। আমার কিছু ক্লাসমেট ছিল দেশে স্ট্যাণ্ড করা। তারা কিন্তু সেরকম রেজাল্ট করতে পারেনি। সে দায় তো শুধু তাদের নয়, এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থারও। বেশ কয়েক বছর আগে আমার এক লেখার উপর মন্তব্য করতে গিয়ে একজন বললেন, আমিও তো সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলাম ভালো মানুষ হতে, কিন্তু ওরাই তো আমাকে লোভ দেখিয়ে ব্যবসায় নামালো, আমার মধ্যে যে সহজ সরল আমি ছিল সেটা ওদের কারণে আমি ধরে রাখতে পারলাম না” কিন্তু কেউ তো তাকে জোর করে এ পথে নামায়নি, সিদ্ধান্ত তার নিজের আমি বলছি না এটা ভালো বা মন্দ কিন্তু সমস্যা হল নিজের কৃত কর্মের জন্য বিভিন্ন অজুহাত খোঁজা আমরা সবাই ন্যায়ের পক্ষে কথা বলি, সবার জন্য সমান অধিকার চাই, কিন্তু নিজের জন্য একটু বেশি চাই এখানেই সমস্যা ধর তোমার বাসায় ঢুকতে দারোয়ান আমাকে দাড় করিয়ে রাখলে বিরক্ত হই, অথচ অন্য কাউকে দাড় করিয়ে রাখলে ভাবি এটাই করা উচিৎ এই যে নিজেকে সব সময় বিশেষ অবস্থানে দেখা, নিজের জন্য বিশেষ সুবিধা খোঁজা, নিজেকে সব সময় ঠিক মনে করা এটা আইনস্টাইনের বিশ্ব দর্শনের সাথে যায় না কারণ এই বিশ্বে কোন বিশেষ বিন্দু বা বিশেষ দিক নেই – সব বিন্দু, সব দিকই সমান আমরা মানুষেরা যখনই নিজেদের সৃষ্টির সেরা জীব বলে ঘোষণা দিয়েছি তখনই এই সাম্য নষ্ট করেছি সেই বিশ্বাসের হাত ধরে এসেছে নিজেকে বিশেষ ভাবার, নিজের বিশেষ অধিকারের ভাবনা  এটাই সকল সমস্যার মূল এই দেখ, আমেরিকা গণতন্ত্রের কথা বলে, চর্চা করে, অথচ নিজেদের এক্সক্লুসিভ জাতি মনে করে, এমন কি রাষ্ট্রপ্রধানরা সেটা ঘোষণাও করেন এটা আর যাই হোক মানুষে মানুষে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব আর ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ নয় 

কিন্তু সোভিয়েত শিক্ষা – সেটাই কি আমাদের আমরা হয়ে উঠতে সাহায্য করেনি আপনার কি মনে হয়না ওই শিক্ষা না পেলে আপনার শিক্ষাটা অপূর্ণ থেকে যেত?

পূর্ণতা বলতে আমরা কী বুঝি? এখানেও সেই অন্ধের হাতি দেখা সোভিয়েত শিক্ষা পাওয়ার সাথে সাথে আমি অন্যান্য দেশের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছি আমি যখন অন্য দেশের শিক্ষার কথা বলি, সেটা আমি গড়পড়তা শিক্ষা বোঝাই না সেটা বলতে আমি বুঝি কেমব্রিজ, সারবনে, এমআইটি, ক্যালটেখ ইত্যাদি আমাদের শিক্ষাটা কী? সেটা আমাদের অভিজ্ঞতা অভিজ্ঞতা শুধু বই পড়ে হয় না, হয় অন্যদের সংস্পর্শে এসে এখানে একটু ভারতীয় দর্শন নিয়ে কথা বলা দরকার পৃথিবীতে অনেক ধর্ম আছে আমার বিশ্বাস এসবই সেসব দেশের মানুষের চাল-চলন, আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি ইত্যাদি থেকে যুগ যুগ ধরে লব্ধ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এমন কি অধিকাংশ ধর্মগ্রন্থই সময়ের সাথে পরিবর্তিত বা সংযোজিত হয়েছে প্রথমে সেসব মুখে মুখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে এসেছে, এরপর এক সময় সেসব লিপিবদ্ধ করা হয়েছে বাইবেলের দেখ কত ভার্সন রামায়ণ তো বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন রকম। এমন কি নায়ক আর ভিলেন পর্যন্ত দেশ ভেদে রোল পরিবর্তন করে। তবে সেমিটিক ধর্মগুলোর মানে ইহুদি, খ্রিস্ট ও ইসলাম ধর্মের প্রচুর মিল – সেটা তাদের এক ভুমিতে, একই ভৌগলিক পরিবেশে উৎপত্তির কারণে বলেই মনে হয় একই ভাবে দেখব হিন্দু, বৌদ্ধ বা জৈন ধর্মের মিল যাকগে, যেটা বলতে চেয়েছিলাম, ভারতীয় দর্শনে মূলে আছে ইন্টার‌্যাকশন বা মিথস্ক্রিয়া যদি সেমিটিক ধর্ম দেখ, দেখবে মহাবিশ্বের উৎপত্তি ঈশ্বরের ইচ্ছায় উনি চাইলেন আকাশ, জল, স্থল, জীবজগত, মানুষ তৈরি করতে – ছয় দিনে সেটা তৈরি করলেন অর্থাৎ এখানে ঈশ্বরের ইচ্ছেটাই মূল এদিক থেকে ভারতীয় বিশেষ করে বৈদিক ধর্মে দেখবে সেটা একটা আকস্মিক প্রক্রিয়া চণ্ডীতে আছে “মহাপ্লাবনের পর অনন্ত নাগের উপর ভগবান বিষ্ণু নিদ্রামগ্ন অনন্ত নাগ সাত মাথা দিয়ে তাঁকে ঢেকে রেখেছে প্রথমত অনন্ত, অন্তহীন – এই নামের মধ্যেও এক অসীমের ইঙ্গিত সাপের লেজ সরু থেকে ক্রমে স্ফীত হতে হতে মুখে বিশালকায় ধারণ করেছে সেটা কি ক্রম বর্ধিষ্ণু বিশ্বের কথাই বলে না? এরপর দেখ বিষ্ণুর নাভি থেকে যে পদ্ম গজিয়েছে, তার তার উপর বসে ব্রহ্মা ধ্যানমগ্ন কেউ নিদ্রামগ্ন, কেউ বা ধ্যানমগ্ন। কোন রকমের মিথস্ক্রিয়া নেই। এ সময় বিষ্ণুর কান থেকে খৈল বেরোয়, যেটা মধু আর কৈটভ নামে দুই অসুরের জন্ম দেয় তারা ব্রহ্মাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হলে বিষ্ণু জেগে ওঠেন এরপর ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর আর সব দেবতারা নিজেদের তেজ দিয়ে তৈরি করেন মহামায়াকে একটু ভাবলে দেখব এই শান্ত পরিবেশে কানের ময়লা পড়া, মানে সামান্য ভারসাম্যহীনতার তৈরি আর তারপর থেকে বিভিন্ন ধরণের মিথস্ক্রিয়া অর্থাৎ ভারতীয় দর্শনের মূলে আছে মিথস্ক্রিয়া আসলে আমাদের জীবন তো কাজ, আর কাজ মানেই মিথস্ক্রিয়া এই যে তুমি আমাকে দেখছ, সেটা আসলে আমার শরীর থেকে তোমার দামী ঝাড়বাতির আলো প্রতিফলিত হয়ে তোমার চোখে পড়ছে আলোর মাধ্যমে তোমার আর আমার মিথস্ক্রিয়ার ফলেই তুমি আমাকে দেখছ শুনছও একি পদ্ধতিতে, এবার শুধু শব্দ তরঙ্গ তোমার কানের পর্দায় ঢাক বাজাচ্ছে কথাটা কেন বললাম আমরা যখন পড়াশুনা করতাম, এক দিকে আমাদের সুযোগ ছিল শিক্ষকদের সাথে সময়ে অসময়ে দেখা করার, প্রশ্ন করার, জানার সেটা কি বাইরে আছে? আমি হাতে গণা দুয়েকটা জায়গায় গেছি, তাই তেমন বলতে পারব না তবে স্বল্প দেখায়, অন্যদের কাছে শুনে যেটা বুঝেছি – বাইরে এতটা ঠিক পাওয়া যায় না সময় তাদের জন্য খুব মূল্যবান কিন্তু আমাদের সময় চাইলেই আমরা, বিশেষ করে বিদেশিরা যেকোনো ইনস্টিটিউটে গিয়ে কোন লেকচার শুনতে পারতাম না, অনেক নামকরা ইনস্টিটিউটে যেতে পারতাম না পশ্চিমা দেশগুলোতে যতদূর জানি, সেটা অনেক সোজা অর্থাৎ এক ধরণের ইন্টার‌্যাকশন থেকে বঞ্চিত হলেও অন্য ধরণের সুযোগ আসছে তার বিনিময়ে তাই আমি যখন বলব সোভিয়েত ব্যবস্থা ভালো না মন্দ আমাকে এসব মনে রাখতে হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের ফিজিক্স ও ম্যাথেম্যাটিক্সের কদর সারা বিশ্বে কাজের জন্য আমাকে অনেকের সাথে চলতে হয়, মিশতে হয় সেক্ষেত্রে বিশ্বের প্রথম সারির অনেক বিজ্ঞানীদের দেখার, তাদের কথা শোনার, তাদের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে কিন্তু কখনই কাউকে বলতে শুনিনি সোভিয়েত শিক্ষা ব্যবস্থা ভালো, পশ্চিমের খারাপ বা উল্টোটা সোভিয়েত বা রুশ বিজ্ঞানীরা যারা পশ্চিমা বিশ্বে কাজ করছেন, যারা দুটো ব্যবস্থাই ভেতর থেকে জানেন – কেউই সেটা বলেননি এক্ষেত্রে এখনকার অন্যতম প্রধান কসমোলজিস্ট আন্দ্রে লিন্দের একটা গল্প উল্লেখ করা যায় উনি স্তারবিনস্কির সাথে ইনফ্ল্যাশন তত্ত্বের আবিষ্কারক, যদিও তাদের প্রায় এক বছর পরে এক্ষেত্রে সাফল্য লাভ করা আলান গুথকেই প্রথম বলে মনে করা হয় পশ্চিমে লিন্দে অনেক বছর আমেরিকা প্রবাসী এখানে কাজ করতেন লানদাউ ইনস্টিটিউতে এক জায়গায় উনি বলেছেন, “তখন মস্কোর এক রুমের বাসায় ছাত্রাছাত্রী নিয়ে যে উদ্যমের সাথে আমরা কাজ করেছি, এই আমেরিকায় আমরা সেটা এখন চিন্তাই করতে পারি না” তবে কথাটা হল, আমরা যেন আমাদের বিশ্বাসটা ডগমার পরিণত না করি তোমার প্রশ্নের উত্তরে প্রায় সব ভিপুস্কনিক এক বাক্যে সম্মতি জানাবে আমি জানাব না তার মানে এই নয় আমি সোভিয়েত শিক্ষা ব্যবস্থার, আমাদেরকে আজকের অবস্থায় আসতে সোভিয়েত ব্যবস্থার অবদান অস্বীকার করছি দুটো উদাহরণ দিই “সদা সত্য কথা বলবে, কখনও মিথ্যা বলবে না” এর সাথে দ্বিমত পোষণ করার কী কারণ আছে? নেই কিন্তু যদি কখনও তোমার মিথ্যা বলাটা একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন বাঁচায় সেটা কী অন্যায় হবে? আবার দেখ বিশ্বাসীরা বলে “ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়” যারা বিশ্বাস করে বলতেই পারে কোন সমস্যা নেই কিন্তু সমস্যা শুরু হয় এই এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরকে যদি কেউ শুধু নিজের ঈশ্বর বলে মনে করে অর্থাৎ বলতে শুরু করে “আমার ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়” তখন এই এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বর বহু ঈশ্বরে পরিণত হন আর নিজের অজান্তেই বহু প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ান এটা ঠিক তোমার এই প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ  তবে আবেগ দিয়ে এর সমাধান খোঁজার উপায় নেই, সেটা আমাদের আর যুক্তিবাদী রাখে না, বিজ্ঞানমনস্ক রাখে না, ধার্মিকে পরিণত করতে এখানে একটা গল্প বলি মঞ্জুরুল আহসান খান মানে মঞ্জু ভাই বলেছিলেন ১৯৮৮ বা ১৯৮৯ সালে তখন পেরেস্ত্রইকা চলছে পুরোদমে আগে এদেশ থেকে বাইরে যেত সাফল্যের খবর এখন সেই সাথে ব্যর্থতা, করাপশন ইত্যাদির খবর ছাপা হচ্ছে মঞ্জু ভাই একদিন জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনীতে এক সোভিয়েত পত্রিকায় এমন এক আর্টিকেল দেখে খুব অপ্রস্তুত হন আর নিজের অজান্তেই চেষ্টা করেন ওই পত্রিকাগুলো লুকিয়ে ফেলতে “তখন আমার মনে হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজে যেখানে এসব কথা স্বীকার করছে, লিখছে, আমি কেন সেটা লুকিয়ে রাখতে চাই” তাই তুমি যখন প্রশ্ন কর সোভিয়েত শিক্ষা ছাড়া আমার শিক্ষা পরিপূর্ণ হত কিনা আমি উত্তর দেব এভাবে “আমি যেহেতু একই সাথে অন্যান্য দেশে শিক্ষার সুযোগ পাইনি, তাই শুধুমাত্র সোভিয়েত শিক্ষা আমাকে, আমার শিক্ষাকে পূর্ণতা দিয়েছে সেটা বলা ঠিক মনে হয় না আমরা অনেকেই এখানে পড়াশুনা করে জীবনে সফল হয়েছি একই ভাবে এর চেয়ে বেশি মানুষ পশ্চিমা শিক্ষা নিয়ে সফল হয়েছেন আমরা যদি সব ক্ষেত্রেই একটা তুলনামূলক পর্যালোচনা করি, দেখব পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসা স্কলারদের সংখ্যা অনেক বেশি যদি ভালো মানুষদের কথা বলি, মানে যারা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন – সেখান কী চিত্রটা অন্য রকম হবে? কয়জন অশোক সেন, অমর্ত্য সেন, অভিজিৎ বন্দোপধ্যায় আমরা জন্ম দিয়েছি? এঁদের কথা আমি বলছি শুধু বিশেষজ্ঞ হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে তাঁদের অবস্থানের কারণে আমার মনে হয় আমরা এই প্রশ্নের উত্তর দিই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ছাত্রজীবনে চেষ্টা করেছি ভালো পড়াশুনা করতে রেজাল্ট খারাপ করিনি ফলে এক ধরণের শ্লাঘা ছিল দুবনায় কাজ করতে গিয়ে বুঝলাম কত কিছুই জানা হয়নি শুরু হল নতুন করে পুরনো জিনিস জানার চেষ্টা যদি সেখানে আমার পাশে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কলিগ থাকত, আমি হয়তো গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা নিয়ে গর্বিত হতাম তবে এটাও ঠিক এখানেই আমার ভিত্তিটা তৈরি হয়েছিল, সেটা যথেষ্ট শক্ত ছিল বলেই আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে সামনে এগিয়ে যাওয়া আমার মনে হয় আমাদের উচিৎ অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের নয়, সবলদের সাথে নিজেদের তুলনা করা তবে একটা কথা অস্বীকার করা যাবে না রাষ্ট্রীয় দর্শনের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের সমষ্টির একজন হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে, সমষ্টির উন্নতির মধ্যে দিয়ে দেখেছে ব্যক্তির উন্নতি পশ্চিমা বিশ্বে শিক্ষাটা হয় ব্যক্তিকেন্দ্রীক, প্রতিটি মানুষকে নিজের জন্য কাজ করতে শেখানো হয় আর সমষ্টির সবাই ব্যক্তিগতভাবে সফল হলে সমষ্টিও সফল হয় পশ্চিমা বিশ্বে সবকিছু যেহেতু টাকার অঙ্কে হিসেব করা হয়, সেখানে শিক্ষার ক্ষেত্রটা হয় সংকীর্ণ মানে প্রতিটি মানুষ নিজের কাজটা, নিজের বিষয়টা ভালভাবে আয়ত্ব করে সোভিয়েত ইউনিয়নে সেক্ষেত্রে শিক্ষাটা ছিল বহুমুখী আমি নিজে ইনফরমেশন টেকনোলজির ল্যাবরেটরিতে চাকরি করলেও কাজ করছি কসমোলজির উপরে পশ্চিমা বিশ্বে এই স্বাধীনতা থাকত কিনা প্রশ্ন সাপেক্ষ তাছাড়া আমরা প্রতিদিনই নতুন নতুন অনেক কিছু শিখছি এর কোন শেষ নেই, আমার শিক্ষা কোন দিনই পরিপূর্ণতা পাবে না আর পাবে না বলেই আমি সামনে এগিয়ে যাব, শিখব আমাদের প্রতিটি জানা নতুন নতুন অজানার দুয়ার খুলে দেয় অজানা আছে বলেই পথচলা এত আনন্দের যখন জিজ্ঞাসা শেষ হয়ে যাবে, উত্তরও শেষ হয়ে যাবে




Comments

Popular posts from this blog

সোভিয়েত থেকে রাশিয়া

কাজান

আগ্রা মথুরা বৃন্দাবন