পূর্ণতার অপূর্ণতা
(১৮)
তাহলে তো দেখা যাচ্ছে যারা সোভিয়েত শিক্ষা পায়নি তাদের শিক্ষাটাও অপূর্ণ। তাই নয় কি?
দেখ, আমি কিন্তু প্রথমেই বলেছি, এসব প্রশ্ন ভুল ধারনার জন্ম দেয়।
এখানে আমার ভোটের কথা মনে পড়ে। যদি
প্রকাশ্য ভোট হয় তুমি পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দিতে পার আবার ভোট দানে বিরত থাকতে পার। সেখানে যে ভোট দানে বিরত থাকে তারও একটা
স্ট্যাণ্ড থাকে, মতামত থাকে।
কিন্তু গোপন ব্যালটে সেটা থাকে না।
সেখানে পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেওয়া যায়। যদি
তুমি ইচ্ছা করে ব্যালট নষ্ট কর, সেটা প্রতিবাদ বা তোমার মত হিসেবে নয় ভুল হিসেবে
ধরা হবে। ভোট দিতে না
গেলে সেটা অনুপস্থিত হিসেবে দেখা হবে।
আসলে জান কী, এসব প্রশ্ন হল কুইজ – যার উত্তর প্রশ্নের ভেতরেই থাকে, তোমাকে চোখে
আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয় উত্তরটা।
তোমার কাজ ভাবা নয়, উত্তরটা লেখা। কুইজ
ভাবতে শেখায় না, টিয়ে পাখির মত রিপিট করতে শেখায়। এটা কী শিক্ষা? এটা কি পরিপূর্ণ শিক্ষিত মানুষের উত্তর?
এই উত্তর কী আমরা চাই? অংকে একটা কথা আছে, কোন সমস্যার সঠিক সমাধান পাওয়ার অন্যতম
শর্ত হল সঠিক ভাবে প্রশ্নটা উপস্থাপন করা।
তার মানে কী বুঝতে হবে পশ্চিমা শিক্ষা অনেক উন্নত?
দেখ, এভাবে ভাবে রাজনীতিবিদরা, বিজ্ঞানীরা সেভাবে ভাবে না। তাই তো সোভিয়েত বা রুশ বিজ্ঞানীরা পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের সাথে হাতে হাত রেখে কাজ করতে পারে, করে। রুশ জার্নালগুলো, বিশেষ করে ফিজিক্স, মাথেম্যাটিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি – এসব জার্নালগুলো ইংরেজিতে অনূদিত হয় ওদের উদ্যোগেই, রুশ লাইব্রেরিগুলো পশ্চিমা জার্নাল রাখে। বিজ্ঞানীরা বোঝে এই আদান প্রদান না থাকলে মানবজাতি, বিজ্ঞান দুটোই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এরা একে অন্যের পরিপূরক। আমার নিজের দুটো কথা বলি। জানই তো আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে ফিজিক্সে চলে যাই। তখন ছিল ভালবাসা। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন বিশ্বটা রাজনৈতিক লেন্সের বাইরে দেখতে শুরু করলাম, তখন একটা কথা মাথায় এল। একজন বিজ্ঞানী হিসেবে আমি যাই করিনা কেন, সেটা কোন বিশেষ জাতির হবে না, হবে সমস্ত মানব জাতির জন্য। পদার্থবিদ্যার সূত্র ব্ল্যাকহোল বাদে মহাবিশ্বের সব জায়গায়ই কাজ করে। একজন বিজ্ঞানী যখন কাজ করেন তিনি কোন দেশ বা জাতির কথা ভাবেন না, কাজের আনন্দে কাজ করেন। পরে রাজনীতিবিদরা তার ফলাফল নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। এজন্যে বিজ্ঞানী দায়ী নয়। তার মানে এই নয় বিজ্ঞানী সমাজের ঊর্ধ্বে, রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তাহলে হিটলার অনেক আগেই হয়তো আনবিক বোমার অধিকারী হত। আসলে এ ধরণের প্রশ্নই সমস্ত সমস্যার জন্ম দেয়। ফলে আমরা কী পাই? খালেদা, হাসিনা, মোদী, ট্রাম্প, এরদোগান, পুতিন, ওবামা, বুশ এরা তো এভাবেই জন্মায় – যখন আমরা অন্ধভাবে ভালো বা মন্দ বলি। কিন্তু সব কিছুরই ভালো আর মন্দ দুটো দিকই থাকে। ভালো কাজের যেমন প্রশংসা করতে হয়, খারাপ কাজের সমালোচনাও করতে হয়। সেটা না করলে ভালো মানুষও একদিন দৈত্যে পরিণত হয়। বলতো আমরা কজন বিদেশি সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়েছি? এই সিস্টেম স্বদেশী বিদেশী মিলিয়ে যত মানুষকে শিক্ষা দিয়েছে তার ১%, ২%, ৫%, ১০% - এর বেশি কী? এই শিক্ষা যদি পরিপূর্ণ মানুষই গড়ত তাহলে এই দেশ কেন মানচিত্র থেকে নাই হয়ে গেল। এমন তো নয়, যে তারা আমাদের এক শিক্ষা দিয়েছে, আর সোভিয়েতদের অন্য শিক্ষা। এ দেশে যে দুর্নীতি ছিল, সেটা তো এই শিক্ষার ফাঁকফোঁকর দিয়েই ঢুকেছে। ধর তোমাকে প্রশ্ন করা হল – পুতিনের রাশিয়া, হাসিনার বাংলাদেশ, মোদীর ভারত বা ট্রাম্পের আমেরিকা ভালো না খারাপ? তুমি এক কথায় যে উত্তরই দাও, সেটা ভুল হবে। কোথাও ভালোর পরিমাণ বেশি, কোথাও খারাপের। এক কথায় তুমি সেটা বলতে পারবে না। সঠিক উত্তর দিতে হলে তোমাকে অনেক কথা বলতে হবে, যুক্তি দিয়ে বুঝতে বলতে হবে। অনেক দেশের অনেক কিছু ভালোর পরেও কিছু না কিছু খারাপ থাকবে। তুমি ভালো বললে বলবে চাটুকার বা তল্পিবাহক, খারাপ বললে দেশদ্রোহী। অথচ তুমি চাইছিলে সত্য কথাটা বলতে। আর সেজন্যে দরকার ছিল তোমার মতের পেছনে বিস্তারিত যুক্তি।
আপনি রেগে যাচ্ছেন।
এটা তোমার মনে হয়। তবে এটা ঠিক কোন প্রশ্ন যদি ভুল উত্তর দেওয়ার জন্য প্রভোকেট করে সেটা আমি পছন্দ করি না। তাছাড়া তোমার দুর্ভাগ্য আমাকে একা ডাকার জন্য। তোমার উচিৎ ছিল আরও কয়েকজন বন্ধুকে ডেকে আনা, জম্পেশ আড্ডার ব্যবস্থা করা। জানই তো আমি খুব একটা আড্ডাবাজ নই, মানে অনেকের সামনে তেমন কথা বলতে পারি না। কয়েক জনকে একসাথে ডাকলেই দেখতে আমি চুপচাপ বসে থাকতাম।
সেটা জানি। কিন্তু বলবেন কী আপনি প্রায় সব আড্ডায় যোগ
দিয়েও কথা বলেন না কেন? প্রায়ই দেখতাম, আপনি এক কোনায় বসে শুনছেন বা কিছু পড়ছেন।
দেখ, আমরা কথা বলি মত বিনিময়ের জন্য, একে অন্যের কথা শোনার জন্য। অনেকে থাকলে যেটা
প্রায়ই হয়, তাহল চারিদিক থেকে সবাই কথা বলতে চায়। তাছাড়া একজন তোমার কথা পছন্দ
করে, আরেকজন আমার। তাই প্রায়ই সেটা হয় বাজার। কথা বলার চেয়ে শোনাটাই বুদ্ধিমানের।
তোমাদের ব্যবসায়ীদের ভাষায় তাতে ইনকাম বাড়ে।
মানে?
স্কুলে চৌবাচ্চার অংক মনে আছে? মানুষ হল চৌবাচ্চা। নল দিয়ে জল আসার মত চোখ আর কান দিয়ে তার কাছে তথ্য বা জ্ঞান আসে আর মুখ দিয়ে তা বেরিয়ে যায়। সে যখন কথা বলে তখন চোখ কান প্রায়ই বন্ধ থাকে। যদি ইনপুট না থাকে তাহলে চৌবাচ্চা একসময় শুকিয়ে যায়। একই রকম মানুষ যদি চোখকান খোলা না রাখে, অন্যের কথা না শোনে, বাইরের কিছু না দেখে একসময় সেও চৌবাচ্চার মত শুকিয়ে যায়। তুমি যখন বল, সেটা শুধু তুমি যেটা জান সেটাই বল। কিন্তু তুমি যখন শোন বা দেখ – তোমার মধ্যে অনেক ইনফরমেশন আসে, যা নিয়ে তুমি ভাব। এই যে ভাবনা সেটাই তো ডেটা এনালাইসিস। হ্যাঁ না উত্তরে ডেটা এনালাইসিস ততটা হয় না, যতটা হয় বিস্তারিত উত্তরে, আলোচনায়। যদিও ভাবতেই পার আমরা যখন প্রোগ্রামিং করি সেখানেও তো হ্যাঁ না এর মাধ্যমেই করি। আলগারিদম ওভাবে কাজ করে। তুমি তথ্য বা খাদ্য ইনপুট করলে, যদি না হয়, সরাসরি বমি করে ফেললে, হ্যাঁ হলে পেটের ভেতর চালান করে দিলে পরবর্তী হ্যাঁ না এর উত্তর দেওয়ার জন্য। এভাবে একের পর এক চক্রের মধ্য দিয়ে গিয়ে তুমি সঠিক উত্তর পাও। তাই আলগারিদমের হ্যাঁ না বা “১”, “০” আর সাইকোলজিক্যাল প্রশ্নোত্তরের হ্যাঁ না এক ব্যাপার নয়।
সোভিয়েত শিক্ষা কী তাহলেই এতটাই খারাপ ছিল?
কে বলল খারাপ ছিল? এই যে তুমি, আমি – আমরাও কী সোভিয়েত শিক্ষার ফসল নই? বিষয়টা খারাপ
ভালোর নয়, বিষয়টা ক্রিটিক্যালি দেখার। দেখ আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে স্বপ্ন
দেখি সেটা কিছু পড়ে, কাউকে দেখে বা কারও
কথা শুনে অনুপ্রেরিত হয়ে। রাজনীতির ব্যাপারে আমার অনুপ্রেরণা ছিলেন সুভাষ বোস। পরে
দেখেছি মনি দা, ফরহাদ ভাই, এলাকার অনেককে। তাঁদের ত্যাগের কথা শুধু শুনিইনি, নিজের
চোখে দেখেছি। আজ রাজনীতির এ অবস্থা কেন? ত্যাগী মানুষ নেই। এখন রাজনীতি এক ধরণের
ব্যবসা, জীবিকা অর্জনের উপায়। আমি ছোট বেলা থেকেই ফিজক্সে পড়তে চেয়েছি।
সত্যেন্দ্রনাথ বসুর গল্প পড়েছি, পড়েছি আইনস্টাইনের গল্প। সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে
গিয়ে দেখেছি আমাদের শিক্ষকগণ কেমন ডেডিকেটেড আর সিম্পল। দুবনায় তাই দেখেছি। ১৯৯৬
সালে প্রথম যখন ইটালি যাই প্রফেসর সালামের আন্তর্জাতিক তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যা কেন্দ্রে
– সেখানেও খুব একটা এদিক সেদিক দেখিনি। ওই সময় স্ট্রিং থিয়োরির উপর এক স্কুল হয়।
আমেরিকা থেকে কয়েক জন বিখ্যাত পদার্থবিদ এসেছিলেন। সেই প্রথম দেখলাম, বিজ্ঞানীরা
পোশাক পরিচ্ছদের প্রতি উদাসীন নন। তারপর তো ভোগবাদী আদর্শ ধীরে ধীরে সবাইকে গ্রাস
করল। আর ভোগের সাথে এলো ঈর্ষা। আমরা তো শুধু নিজে ভালো থেকে খুশি নই, এ জন্যে
আমাদের অন্যের চেয়ে বেশি ভালো থাকতে হবে। এই যে পাল্লা দিয়ে চলা, অন্যের চেয়ে ভালো
থাকার, বেশি জানি বা বুদ্ধিমান মনে করার প্রবনতা সেটা তো জন্ম নেয় যখন আমরা কোন
দেশকে, কোন সমাজকে, কোন ব্যবস্থাকে অন্ধভাবে উৎকর্ষ বলতে চাই। অনেক দিন আগে, সেভা
তখন বেশ ছোট। ছয় বছর বয়স। ভাইওলিন শিখত। একদিন মিউজিকের স্কুল থেকে বাসায় ফিরছি,
হঠাৎ প্রশ্ন করল “পাপা, আমাদের মধ্যে কে বেশি বুদ্ধিমান?” কী বলব। বললাম, “দ্যাখ,
তুই ভাইওলিন বাজাতে পারিস, আমি পারি না। এক্ষেত্রে তুই বুদ্ধিমান। আবার আমি কিছু
কাজ করতে পারি, তুই যেটা পারিস না। সেক্ষেত্রে আমি বুদ্ধিমান।” মনে পড়ে স্কুলে অংক
কষতাম? সেখানে গরুর সাথে গাধা যোগ করা যায় না। জীবন বহুমুখী, শিক্ষাও বহুমুখী। তাই
তুলনা করা কঠিন। আরও একটা কথা বলি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ক্ষণিকের জন্যও হলেও পরাজিত হয়েছে।
অদৃশ্য হয়েছে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে। এমন ঘটনা শুধু একটা মাত্র ভুলে হয়না, একটা
মাত্র অর্গান ফেল করলে হয় না। এই যে তুমি আমাকে এসব প্রশ্ন করছ, সেটা তো সেই দেশকে
ভালবেসেই করছ। তোমার মত আমিও চাই এরকম একটা দেশ পৃথিবীতে আসুক। আর তাই যদি চাই,
সেই ব্যবস্থার সমস্ত খুঁটিনাটি আরও বেশি ক্রিটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে হবে,
খুঁজতে হবে সেসব ডিজ্যাডভান্টেজগুলো যে কারণে
একটা দেশ এভাবে নাই হয়ে গেল। এর উত্তর সোজা পথে পাওয়া যাবে না, হ্যাঁ না বলে পাওয়া
যাবে না। এ জন্যে দরকার বিস্তারিত আলোচনা, তর্ক বিতর্ক। রুশরা যেমন বলে “বিতর্কের মধ্যেই জন্ম নেয়
সত্য।” কিছু মনে কর না, তবে দুটো কথা না বলে পারছি না। তুমিই তো কিছুক্ষণ আগে বললে
তোমার সন্তানেরা আমেরিকা আর ক্যানাডায় পড়াশুনা করবে। আমাদের ছাত্র জীবনে আমি ছাত্রদের
বাইরে কারও সাথে খুব একটা মিশতাম না। পরে যখন দুতাবাস স্কুলে কাজ করি, সেখানে অনেকের
সাথে পরিচিত হই। তাদের অনেককেই দেখেছি কী গর্বের সাথে বলতেন যদি ছেলে বা মেয়ে স্থানীয়
আমেরিকান স্কুলে ভর্তি হত বা ব্রিটিশ বা আমেরিকান নাগরিকত্ব পেত। আমরা অনেকেই এটার
সমালোচনা করতাম। সরকারি চাকরি করে অথচ ছেলেমেয়েরা ইউরোপ আমেরিকায় পড়ছে। না, সেটা টাকাপয়সার
প্রশ্নে নয়, দেশপ্রেমের ব্যাপারে। এই যে আমরা যারা বলি সোভিয়েত শিক্ষা আমাদের পরিপূর্ণ
মানুষ হতে সাহায্য করেছে তাদের ক' জন নিজেদের সন্তানদের এদেশে পড়াতে আগ্রহী? বলবে
সে দেশ নেই। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা আগের মতই। আমি নিজে পড়াই, জানি। স্কুলে
বেশ পরিবর্তন, ইউনিভার্সিটিতেও পশ্চিমের মত ব্যাচেলর আর মাস্টার্স, এমন কি
সেমিস্টারের বদলে কোয়ার্টারলি পরীক্ষার ব্যবস্থা। আমলাতান্ত্রিক ব্যাপার স্যাপার অনেক,
মানে শিক্ষকদের অনেক বেশি কাগজ পত্র লিখতে হয়, যেমন আগে থেকে প্রশ্ন, লেকচার নোট
এসব অন লাইনে দিয়ে দেওয়া, ডাক্তাররা যত সময় না রোগী দেখে তার চেয়ে বেশি ইস্তরিয়া
বালেজনি মানে রোগের ইতিহাস লেখে, কিন্তু অন্তত যতদিন সেই আমলের শিক্ষকেরা আছেন পড়াশুনা
প্রায় সেভাবেই হবে। পরিবর্তনটা ইভালুয়েশনে যাতে পশ্চিমে এসব ডিপ্লোমা সহজে গ্রহণ
করে। এই যে তুমি এতক্ষণ ধরে আমার মুখ দিয়ে সোভিয়েত সিস্টেম বেটার এ কথা শোনার চেষ্টা
করলে, নিজেই কিন্তু সেটা বিশ্বাস কর না, করলে সন্তানদের ওদিকে পাঠাতে না। বা বিশ্বাস
করলেও ধরেই নাও প্র্যাক্টিক্যাল লাইফে, চাকরি বাকরির ক্ষেত্রে পশ্চিমী শিক্ষা বেশি
কাজে লাগবে। শত হলেও ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ বলে কথা। জনগনে মধ্যে একটা ধারণা বদ্ধমুল যে
আমলারা যেহেতু সরকারি চাকুরে শুধু তারাই দেশপ্রেমী হতে বাধ্য, শুধু তারাই নিজেদের ছেলেমেয়েদের
দেশে পড়াতে বাধ্য ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমরা সবাই, যে যেখানে থাকি, সেখানকার
নুন খাই, সেই দেশের দেওয়া সুযোগ সুবিধা ভোগ করি। জীবনে আমি অনেকের উপদেশ মেনে চলি,
গোর্কির কথা আগেই বলেছি। তলস্তয় আরেকজন। মনে আছে তিন প্রশ্ন গল্পটি? তুমি তো ডাক্তার,
বালুকা ঘড়ি তোমার অজানা নয়। ওখানে কোনাস আকারের পাত্রের উপর থেকে সরু ছিদ্রের ভেতর
দিয়ে বালু নীচে পড়ে। আমরা আপেক্ষিক তত্ত্ব পড়াতে গিয়ে সাধারণত নীচের অংশকে বলি অতীত,
ছিদ্র বর্তমান আর উপরের অংশ ভবিষ্যৎ কেননা সময়ের দিক উপর দিকে। বালুকা ঘড়িতে উল্টো,।
কিন্তু আসল ব্যাপার হল বর্তমান, যেটা সরু একটা ছিদ্র মাত্র, ক্ষণস্থায়ী। এই বর্তমানেই
আমাদের ভবিষ্যতের ভাগ্য নিহিত। তাই বর্তমানটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লোক সে, যে আমার সাথে আছে। কেননা একমাত্র সেই আমার বর্তমানকে
প্রভাবিত করতে পারে, সেই আমার বর্তমানকে আনন্দময় বা দুঃখময় করতে পারে, যার উপর নির্ভর
করছে আমার ভবিষ্যৎ। একই ভাবে তার ভবিষ্যতের ভালমন্দও নির্ভর করছে আমার উপর, তাই
গুরুত্বপূর্ণ কাজ তার ভালো করা। অতীত থেকে আমরা শিক্ষা নেব ঠিকই, কিন্তু সেটা নিতে
হবে বর্তমানকে মাথায় রেখে, বর্তমানের ভালমন্দ বিচার করে। আর সেটা করি বলেই সোভিয়েত
ইউনিয়ন নিয়ে আমাদের সব কথাবার্তা চিন্তাভাবনা আবেগেই শেষ হয়ে যায়, কোন বাস্তব পদক্ষেপে
পর্যবসিত হয় না। তবে ঐ যে বললাম না, এ
নিয়ে কুইজ নয়, বিস্তারিত আলোচনা হওয়া দরকার, এর ভালমন্দ দুটো দিকেরই চুলচেরা বিশ্লেষণ
হওয়া দরকার। একমাত্র তখনই সত্যটা বেড়িয়ে আসবে, ভবিষ্যতে কোন কার্যকরী তত্ত্ব জন্ম
নেবে।
আচ্ছা এই যে এত কথা বলছেন, সেগুলো লেখেন না কেন?
লিখে কী হবে? কেউ পড়বে? তুমি পড়বে? মানুষ পড়তে চায় পরনিন্দা, পরচর্চা। মেলোড্রামা এত জনপ্রিয় কেন? কারণ তাতে এসব আছে। ভাবতে হয় না। শুধু পক্ষ নিলেই হল। মানুষের ভাবার সময় নেই, ভাবার ইচ্ছে নেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন চেয়েছিল মানুষগুলো ভাবতে শিখুক, সবাইকে তাই শিক্ষাও দিয়েছিল। কিন্তু এক সময় মানুষ দেখল, পার্টিই তো ভাবছে, তাদের ভেবে কী লাভ? পার্টিও দেখল, ওরা ভবলেই প্রশ্ন করবে। এমন কী ঈশ্বরও চাননি জ্ঞান বৃক্ষের ফল খেয়ে মানুষ জানতে শিখুক, প্রশ্ন করতে শিখুক। প্রজারা যত কম জানতে চায় স্বর্গ রাজ্যে ততো বেশি শান্তি। প্রাশ্ন করা মানে তো শান্তি নষ্ট করা, অশান্তি সৃষ্টি করা। কে দেবে তোমাকে স্বর্গকে নরকে পরিণত করতে?
Comments
Post a Comment