প্রবাসী পরিষদ
(৭)
২০০৮ সালে অভিদের শান্ত সংসারে কালবোশেখির ঝড় বয়ে গেল। এরপর একটা বছর কাটল হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার তত্ত্ব অনুযায়ী। আলাদা থাকাটা একান্ত জরুরী হয়ে পড়ল। ছেলেমেয়েদের নিয়ে ওর বৌ চলে গেল মস্কোয় নিজের বাসায়। ১৯৯৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত অভির মস্কো যাত্রা ছিল কালেভদ্রে, তাই কারও সাথে যোগাযোগ হত না বললেই চলে। মাঝে অবশ্য গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়িয়েছে, কিন্তু কারও সাথে দেখা সাক্ষাৎ করার সময় তখন হয়নি। তাছাড়া মস্কোয় তখন স্কীনহেডদের যথেষ্ট দাপট। তাই জরুরি কাজ না থাকলে কোথাও যাওয়াও হত না। মাঝে মধ্যে কেউ ফোন করলে কথা হত। ২০০৯ সালে সবাই মস্কো চলে গেলে হঠাৎ এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেল অভির সামনে। এতদিন পর্যন্ত অভির কাজ ছিল সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত সাইকেলের পেছনে বসে একের পর এক বাচ্চাদের কিণ্ডার গারটেন, স্কুল, নাচ, গান, ছবি আঁকার স্কুল, সুইমিং পুল - এসব জায়গায় দিয়ে আসা আর ওখান থেকে বাসায় নিয়ে আসা। এর মাঝে অফিস করা। এরমধ্যেও বছর শেষে যখন বেশ কিছু পাবলিকেশন হত, ছবির প্রদর্শনী হত, কলিগরা জিজ্ঞেস করত অভি এত সব করার সময় কোথায় পায়। অভি জনক রাজা আর শুকদেবের গল্প শোনাত ওদের। একদিন শুকদেব জনক রাজার প্রাসাদে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মাহারাজ, আপনার রাজ্যের সর্বত্র উন্নতির বহিঃপ্রকাশ, প্রজারা সুখী। আপনি কীভাবে এসব করেন?” রাজা কিছু বললেন না, শুধু কানায় কানায় পূর্ণ এক পেয়ালা তেল দিয়ে মুনিকে বললেন, “মুনিবর, এই পেয়ালা হাতে আমার রাজধানীর পরিসীমা ঘুরে আসবেন। আমি গোধুলি লগ্নে এখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করব। যদি এক ফোঁটা তেলও মাটিতে পড়ে আমি আপনার শিরচ্ছেদ করব।“ সময় মত শুকদেব ফিরে এলেন পরিপূর্ণ পেয়ালা হাতে। “কীভাবে আপনি এই অসাধ্য সাধন করলেন?” “প্রাণের ভয় ছিল মাহারাজ। জানতাম একটু বিচ্যুতি ঘটলেই প্রাণনাশ হবে।“ “মুনিবর, আমারও সেই অবস্থা। কাজের চাপ আমাকে অন্যমনস্ক হতে দেয়না। কেন না একবার কোথাও ছন্দপতন ঘটলে সেটা চক্রাকারে চলতেই থাকবে, ওখান থেকে আর ফেরা সম্ভব হবে না।“ অভিও ছিল এরকম এক চক্রে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। এখন হঠাৎ পাওয়া সেই সময়টা কাজে লাগানোর দরকার ছিল। সেই সুযোগটা এলো অনেকটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই।
২০০৯ সালের অক্টোবরে অভি ডিএসসি থেসিস ডিফেন্ড করে। দেশে শুনেছে
এক একটা ডিগ্রী বা চাকরিতে পদোন্নতির পর পাত্রের বাজারে ছেলেদের দাম বেড়ে যায়। অভির
ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই হল। যদিও ডিফেন্ড করার পর অভি নিজে টের পায়নি ওর ঘটে বুদ্ধি কমল
না বাড়ল, তবে বন্ধু মহলে ওর কদর বেড়ে গেল। অনেক দিন পরে দুতাবাসের এক অনুষ্ঠানে গিয়ে
অনেক পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হল, টেলিফোন বিনিময় হল। সাধারণত সব আড্ডায় এক কোণে বসে থাকা অভি প্রদীপের
আলোয় এলো। ওর যে এটা খুব ভালো লাগত সেটা বলতে পারবে না, তবে আবার বন্ধু হয়ে এগিয়ে এলো
ক্যামেরা। মানুষের অতিরিক্ত মনোযোগে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে ক্যামেরার পেছনে লুকিয়ে থাকত।
এর মধ্যেই অনেকেই প্রস্তাব দিল মস্কোয় বসবাসকারী ছাত্র ইউনিয়নের প্রাক্তন সদস্যদের
একত্রিত করার। বিএসইউ এর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত হল। তারপর সমমনা বন্ধুদের নিয়ে গড়ে
উঠল “বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ রাশিয়া”। নতুন করে
অভি পরিচিত হয় মস্কোর বাঙ্গালী সমাজের সাথে। ওদের ছাত্রজীবনে
শুধু ছাত্ররাই আসত এ দেশে, এখন ব্যবসা বা অন্যান্য কাজকর্মে জড়িত মানুষের সংখ্যাই বেশি। কেউ কেউ এখানে ছোটোখাটো কোর্স শেষ করলেও অধিকাংশই সে সবের ধার
ধারেনি। প্রথম থেকেই জড়িত হয়েছে ব্যবসা বা চাকরির
সাথে। অনেকে আবার এখান থেকে ইউরোপে পাড়ি জমানোর
ইচ্ছে নিয়ে আসে। কেউ কেউ এতে সফল হলেও অনেকেই আটকে
গেছে রাশিয়ার সীমাহীন প্রান্তরে। তবে এটাও
ঠিক এখন ব্যবসা আগের মত নেই, অন্যান্য দেশের মতই এখানেও ব্যবসা কঠিন হয়ে গেছে। পুরনো বন্ধুদের তেমন কেউ আর নেই। অধিকাংশই
ফিরে গেছে দেশে, একটা বিরাট অংশ ইংল্যান্ড, ক্যানাডা, অ্যামেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে
বসবাস করছে। কেউ কাজ করছে নিজেদের পেশায়, কেউবা
অন্য কোন পেশায় চলে গেছে। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের বদৌলতে অনেকের
সাথে নতুন করে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। এক কথায়
ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও, ছাত্রজীবনে সম্পর্কের টানাপোড়ন থাকলেও আজ অভিরা সবাই সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রোডাক্ট। সেই স্মৃতিকে আগলে রেখে সবাই চেষ্টা করে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে,
একে অন্যের খোঁজ খবর রাখতে।
বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ রাশিয়ায় কাজ করতে গিয়ে অভি এক নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হল।
অভিকে যখন বলা হল সংগঠনের কথা, যদিও ও থাকত মস্কো থেকে দূরে, মস্কো আসত কালেভদ্রে, তবুও রাজী হল এতে অংশ নিতে। ও ভেবে
দেখল ওর একার পক্ষে দেশের জন্য কিছুই করা সম্ভব নয়। যদি সবার উদ্যোগে একটু সাহায্য
করতে পারে, সেটাই হবে দেশের, দেশের মানুষের প্রতি ওর সামান্য অবদান। উদ্যোগটা শুরু
হয়েছিল বেশ জোরেশোরেই। তখন মস্কোয় বসবাসরত বাংলাদেশীদের বেশ কিছু সংগঠন ছিল, তবে সেসব
হয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে অথবা রাজনৈতিক। পিকনিক হত। সাধারণ মানুষ সেখানে যেত
আমন্ত্রিত হয়ে, কিন্তু সেটাকে তারা নিজেদের বলে ঠিক মনে করতে পারত না। তাই অভিদের কয়েক
জন ঠিক করল মস্কোর এই প্রান্তিক বাংলাদেশীদের একটা সংগঠন করতে। অনেক বাধাবিপত্তির মধ্যেও
সেটা কাজ শুরু করল। অনেকের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হল একে রাজনৈতিক রং দেওয়ার। তবে বাংলাদেশ
প্রবাসী পরিষদ কাজেকর্মে বুঝিয়ে দিল তারা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সার্বভৌমত্বে
বিশ্বাসী বাংলাদেশীদের এক দল নিরপেক্ষ গণ সংগঠন। এই নিরপেক্ষতা রাখতে গিয়ে অনেকের বিরাগ
ভাজন হতে হল, তারপরেও সংগঠন এগিয়ে চলল একটু একটু করে। যদিও ঘোষিত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক
কেন্দ্র বা অন্য কোন বড় প্রোজেক্টে তারা সফল হয়নি, তবুও মস্কোর বিভিন্ন সংগঠন যেসব
দোষে দোষী তা থেকে তারা নিজেদের দূরে রাখতে পারল। আর সবচেয়ে বড় কথা তারা মস্কোর বাংলাদেশীদের
বুঝিয়ে দিল, চাইলে চালচুলোহীন মানুষেরাও নিজেদের দাবী দাওয়ার জন্য এক হতে পারে, স্বল্প
সামর্থ্যের মধ্যেও নিজেরাই নিজেদের জন্য এরকম সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তবে সব যে
মসৃণ ছিল তা নয়। এর আগে অভি যেসব সংগঠন করেছে যেমন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর,
উদীচী, বাংলাদেশ ছাত্র সংগঠন ইত্যাদি সবই ছিল প্রতিষ্ঠিত। সব জায়গায় মাথার উপর ছাতা হিসেবে বড়রা ছিল। এই প্রথম ওরা নিজেরা
একেবারে শূন্য থেকে একটা সংগঠন তৈরি করল। এই প্রথম ওরা নেওয়ার জন্য নয়, দেওয়ার জন্য
এক হল। কিন্তু অচিরেই দেখা গেল এখানেও অনেকেই পাওয়ার জন্য পাগল। কী সেই পাওয়া? বিভিন্ন পোস্ট – সভাপতি, সেক্রেটারি
– ইত্যাদি পোস্ট। মস্কোয় অনেকেই প্রতিষ্ঠিত, অনেক টাকা-পয়াসার মালিক, তবে খুব কম লোকই
সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাই যে কোন সংগঠনে যেকোনো পোস্টই অনেকের জন্য লোভনীয়। অভি
থাকত বাংলাদেশী সমাজ থেকে অনেক দূরে, এই সমাজের দৈনন্দিন সম্পর্কের বাইরে। অনেক বন্ধুদের
আচরণে ও ক্ষুব্ধ হল। কিন্তু অচিরেই বুঝল এটাই মানব চরিত্র। একজন ছাত্র “জীবনের লক্ষ্য”
রচনায় লেখে সে ডাক্তার হবে। সেটা সে লেখে মূলত নোট বই পড়ে। সেখানে অনেক ভালো ভালো কথা
থাকে। হয়তো সেই বয়সে সেসব সে বিশ্বাসও করে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছুনর প্রাথমিক শর্ত হিসেবে
সে প্রতিদিন একটু একটু করে নতুন কিছু শেখে, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে। কিন্তু ডাক্তার
হওয়ার পর সমাজ সেবার সাথে সাথে আসে স্বচ্ছল জীবনের হাতছানি, গাড়ি বাড়ি অনেক কিছু। একই
ঘটনা ঘটে প্রায় সব ক্ষেত্রেই। দিনের শেষে সবাই নিজে ভালো থাকতে চায়, নিজেকে প্রতিষ্ঠা
করতে চায়। তাই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সংগঠন শুরু করলেও যখন কেউ দেখে এমন কি নতুন
একটা সংগঠনের সভাপতি বা সেক্রেটারিকে সবাই সম্মান করছে, সমীহ করছে – তখন অনেকের মনে
সেই পদের লোভ জাগতেই পারে। কোন সংগঠনের দায়িত্বপূর্ণ পদ মানে অনেকে এই লোককে বিশ্বাস
করে, সম্মান করে। এই সম্মান, এই বিশ্বাস কে না পেতে চায়? সংগঠনের শুরুতে অভি ভেবেছিল
এখানে থাকবে কালেক্টিভ নেতৃত্ব, সবাই মিলে সব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে আর একজনকে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সবার পক্ষে থেকে
কাজটি করার দায়িত্ব দেবে। এখানে কেউ এক নম্বর, কেউ দুই নম্বর এমন হবে না। তবে বাস্তব
ক্যাসিকাল। সবার নির্দিষ্ট পজিশন থাকে। কোয়ান্টাম তত্ত্বের অনিশ্চয়তা এখানে নিষ্ক্রিয়।

Comments
Post a Comment