উলিৎসা মিকলুখো মাকলায়া
(২০)
কি দোস্ত এত দেরি করলি যে?
আর বলিস না, গল্পে গল্পে দেরি হয়ে গেল। অনেক দিন পরে দেখা, কত প্রশ্ন, কত স্মৃতি রোমন্থন।
খাবি? আমি কিন্তু এখনও খাইনি। তোর জন্য অপেক্ষা করে বসে আছি।
খাব। রাঁধবি না?
বোন রান্না করে রেখে গেছে। চল নিজেরাও কিছু করি।
চল।
মস্কোর গল্প বলবি না?
কি গল্প বলব বল?
মিকলুখো মাকলায়ার কথা বল। ওর জন্যেই সবচেয়ে বেশি মন পু রে।
মিকলুখো মাকলায়া আমরা তো সাধারণত বোঝাই দম তুরিস্তা থেকে দশ নম্বর ব্লক পর্যন্ত, বড়জোর ভল্গিনা। কিন্তু জানতে চাইবি তো সেই ইউগো-জাপাদনায়া মেট্রো থেকে বিলায়েভা পর্যন্ত সব খবরাখবর। যদিও মিকলুখো মাকলায়া বিলায়েভার পরেও অনেক দূর পর্যন্ত গিয়ে সেভাস্তপলস্কি প্রস্পেক্তে মিশেছে। একদিকে লেনিনস্কি প্রস্পেক্ত, অন্য দিকে সেভাস্তপলস্কি প্রস্পেক্ত। মাঝে প্রফসায়ুজনায়া উলিতসা। মস্কোর তিন তিনটে মহাসড়ক। তোর তো মনে হয় বিলায়েভার পরে অদিকে যাওয়া হয়নি। আমি গেছি সেই ছাত্রা জীবনেই। নাজিমকে মনে আছে? আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির ছাত্র হিসেবে প্রস্তুতি পড়বে এক সেমিস্টার ক্লাস করি তখন ও ছিল আমাদের কুরাটর। কাজাখ। বাবা মনে হয় ডিপ্লম্যাট। ও আমাকে প্রায়ই ওদের ওখানে নিয়ে যেত, অনেক ভাল গানের কালেকশন ছিল আর জাপানী দামী সেট। তখন তো এসব পাওয়া যেত না। ওর নানী প্রায়ই ঘোড়ার কালবাসা পাঠাতো। আমি খুব পছন্দ করতাম। ও ছিল ফিললজির ছাত্র। ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজের। মনে হয় আমেরিকা চলে গেছে। এখন আর খোঁজ জানি না। ফিলিপকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বলতে পারেনি। ফিলিপ আমাদের পরের কুরাটর। রুশ, ইংলিশ দুটো ভাষায়ই পারদর্শী। কবিতা লেখে। হিন্দিও জানে ভালো। আমেরিকায় স্থায়ী ভাবে থাকে। যাকগে বলছিলাম মিকলুখো মাকলায়ার কথা। আমার মাঝে মধ্যে প্রশ্ন জাগে এই রাস্তার নাম এমনটা হল কেন? এই এলাকাগুলো তো নতুন। মনে হয় গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই এখানে নতুন এলাকা গড়ে ওঠে। আমাদের পশ্চিম দিকে যে হাসপাতাল, সেখানে তো আমরাও সুব্বোৎনিক করেছিলাম ১৯৮৮ সালে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য টাকা সংগ্রহে। মনে আছে?
হ্যাঁ। খুব মনে আছে। সেবার যে জিনিসগুলো আমরা অন্য বিল্ডিঙে নয়ে গেছিলাম, পরের বছর সুব্বোৎনিকে সেগুলো আগের জায়গায় নিয়ে এসেছিলাম।
আমার মনে পড়ে ফার্স্ট মেডিক্যাল, মেই বা মামির ওরা আমাদের ঠাট্টা করত গেঁয়ো বলে। ফার্স্ট মেডিক্যালের হোস্টেল তো স্পরতিভনায়ায়, একেবারে সেন্টারে। মেই এর পাশে লেফরতভা কারাগার সেই যার আমলের সাক্ষী। আমি একসময় মনে করতাম মামি শহরতলীতে। কিন্তু ১৯৯১ - ৯২ যখন জেরক্সের জন্য ওদিকে যেতাম সে ভুল ভাঙ্গে। আমি নিজেও কিছু লেখালেখি করতাম। আর কাকু তো ছিলই। তখন তো জেরক্স পথেঘাটে করা যেত না, দামের একটা ব্যাপার ছিল। অনেক খুঁজে ইজমাইলভস্কায়ায় একটা জায়গা বের করি। ওখান থেকে ট্রামে না হেঁটে যেতে হত। দু স্টপেজ মত। একটা ভাঙ্গা বিল্ডিঙে, খালের পারে। হঠাৎ দেখি পোড়ো বাড়ি। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি পিটার দ্য গ্রেটের ছেলেবেলা সেখানে কাটে। সে অর্থে মামি মানে শিওলকভস্কায়া বেশ পুরনো। যেহেতু এই রাস্তার সাথে আমাদের অনেক স্মৃতি বিজড়িত তাই উইকিপেডিয়া ঘেঁটে এর সম্পর্কে একটু জানার চেষ্টা করেছি। এই রাস্তার নাম কিন্তু আগে মিক্লুখো মাকলায়া ছিল না। রাস্তার প্রথম অংশ তৈরি হয় ১৯৬৩ সালে গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস তৈরির সাথে সাথে। তবে প্রথম দিকে এর একটা সাময়িক নাম ছিল “প্রয়েক্তিরুয়েমি প্রয়েজদ ৪৮৬৫”। সোভিয়েত আমলে রাস্তাঘাট, শহর ইত্যাদির নাম অনেক সময়ই সংখ্যা দিয়ে রাখা হত। দুবনায় যেখানে বিমানবাহী জাহাজ ধ্বংসকারী মিসাইল তৈরি হত তার নাম ছিল ত্রিসাদকা বা ৩০ নম্বর। এখনও লোক মুখে এ নাম রয়ে গেছে। এভাবেই সারভের নাম ছিল বেস ১১২, গোর্কি ১৩০, আরজামাস ৭৫ ও আরজামাস ১৬। আসলে সোভিয়েত আমলে বিভিন্ন গোপন শহর বা এলাকার নাম এভাবে রাখা হত। গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের প্রথম দিকের নাম হতেই মনে হয় গুজব ছড়িয়েছিল যে এখানে পড়াশুনার পাশাপাশি সশস্ত্র বিপ্লবের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।যেহেতু নিকলাই নিকলায়েভিচ মিকলুখো-মাকলাই ছিলেন পরিব্রাজক, দক্ষিণ এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, পপুয়া নিউগিনি এসব এলাকার আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করেছেন, এসব জায়গায় গেছেন, মনে হয় এজন্যে যখন মূলত তৃতীয় বিশ্বের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়, রাস্তার নাম দেওয়া হয় তাঁর নামে। নাও হতে পারে, তবে ভাবতে আপত্তি কী?
দোস্ত তুই কী ভবনা ছাড়া আর কিছু করতে পারিস না?অনেক দূরে চলে যাচ্ছিস। এভাবে চললে আজ আর ঘুমুতে হবে না।
দাঁড়া বলছি। তুই কি ইউগো-জাপাদনায়ায় চুবাইসের মানে রাও ইএএস-এর অফিস দেখে এসেছিলি?
মনে নেই।
যাক ওটা রাস্তার ওদিকটায়। ইউগো-জাপাদনায়ায় যে উনিভারমাগ ছিল, সেটা এখনও আছে, তবে কি বিক্রি হয় জানি না। আমাদের প্রথম হাঁড়িপাতিল তো ওখানেই কেনা। নীচ তলায় ছিল এসবের দোকান। হাঁড়িপাতিল, প্লেট, গ্লাস, রান্নার বিভিন্ন জিনিসপত্র, এক তলায় খাবারের দোকান আর ক্যাফে, দোতলায় জামাকাপড়, সাবান শ্যাম্পু এসব। ওখানে যাওয়া হত মাঝে মধ্যে। এখন ওর পেছনে বিশাল রেসিডেনশিয়াল বিল্ডিং। এজন্যে উনিভারমাগ হারিয়ে গেছে। এরপর আর তেমন পরিবর্তন হয়নি। আমি তো ১৯৯১ -৯২ সালেও অনেক রাতে কাকুর বাসা থেকে ফেরার সময় এ রাস্তায় হেঁটে যেতাম। এখনও হাতে সময় থাকলে এই রাস্তাটুকু হেঁটেই যাই। ঠিক সে রকমই আছে, তবে নতুন লাইট পোস্ট বসিয়েছে আতেএস বাস স্টপেজের ওখানে। সায়ুজ-পেচাত, গ্রামোফোন রেকর্ডের দোকান মেলোদিয়া এসব আগের মতই আছে। তবে মনে হয় অন্য দোকান। আসলে এই এলাকা ছিল নতুন। বলতে গেলে হোটেল সাল্যুত পর্যন্ত কোনই চেঞ্জ হয়নি, তবে রাস্তাঘাট বদলে গেছে। দম তুরিস্তা আগের মতই, শুধু আমাদের সেই প্রিয় ক্যাফের জায়গায় অনেক ছোটোখাটো খাবার দোকান।
দম তুরিস্তা থেকে ভেতর দিয়ে ইউগো-জাপাদনায়ার দিকে গেলে যে দোকানগুলো ছিল সেসব আছে?
দ্বিতীয় মাগাজিনে তো আমাদের সময়ই কোরিয়ান (নাকি ভিয়েতনামি) রেস্টুরেন্ট হয়েছিল। তবে প্রথম আর তৃতীয় মাগাজিন আগের মতই ছিল। ওদিকটা তেমন বদলায়নি। অন্তত নতুন ঘরবাড়ি এদিকটায় তেমন ওঠেনি। দোকান আছে কিনা জানি না। এখন তো সুপার মার্কেটগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে ছোট দোকানগুলো অহরহ পটল তুলছে। তবে মিকলুখো মাকলায়া অনেক বদলে গেছে। পার্ক প্যালেস তো দেখেই এসেছিস। মনে আছে, ঐ হোটেলের জায়গাটা আমাদের ভার্সিটির ছিল। আমরা ওখানে সামারে ফুটবল খেলতাম। দুই নম্বর প্রায় সব সময়ই চ্যাম্পিয়ন হত নতুন আসা ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে। আমি ছিলাম দুই নম্বরের টীমের অধিনায়ক, খেলি বা না খেলি। কী একটা সময় ছিল তখন! আগে তো আমাদের স্পোর্টস কমপ্লেক্স ছিল প্রথম বিল্ডিং, এখন তার আগে নতুন বাড়ি। লেনিনস্কি প্রস্পেক্তের গা ঘেঁষে। জানিস কী? চার্চ। মনে হয় ঈশ্বর যাতে দেশ বিদেশের মানুষের সংস্পর্শে এসে আরও সহনশীল, আরও আন্তর্জাতিক হন – সেই লক্ষ্যে ওখানে ঈশ্বরের জন্য একটা ছোট হোস্টেলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্পোর্টস কমপ্লেক্সে অনেকদিন যাওয়া হয়নি, আর এখন এদিক থেকে ওটা দেখাও যায় না। তবে ক্রেস্তে বিশাল পরিবর্তন। ও হ্যাঁ, সেই হাসপাতাল এখন কাজ করছে, বাচ্চাদের হাসপাতাল। বেশ নাম করেছে। ক্রেস্তের সামনের দিকটা অনেক বদলে গেছে, ভেতরটাও। লাইব্রেরি আধুনিক। অনেক ফুড কর্নার। ঢুকলে প্রথমে মনে হয় সুপার মার্কেট। এখন অবশ্য আগের মত চাইলেই ঢোকা যায় না, শুধু আইডি কার্ড পাঞ্চ করে। পুরোপুরি অটোম্যাটিক। ক্রেস্তের সামনে খুব সুন্দর ফোয়ারা – বলতে পারিস লেক। সামারে প্রচণ্ড সুন্দর। ওখান থেকে মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি পর্যন্ত যে ভূতুড়ে জায়গা ছিল সেটা সুন্দর করে গাছে গাছে সাজানো। সুন্দর প্ল্যান করে করা। মেডিসিন ফ্যাকাল্টির সামনে ২৫ নম্বর পলিক্লিনিক আমাদের ছাত্রজীবনেই তৈরি, সেটা আগে দনস্কায়া ছিল। এখন সেই ক্লিনিকটা অনেক বড়, অনেক উন্নত। তবে পলিক্লিনিকের পেছনের জায়গাটা আর ফাঁকা নেই, ওখানে কয়েকটি নতুন বিল্ডিং। রুশ ভাষা আর ফিলোলজি ফ্যাকাল্টি এখানে চলে এসেছে। এর সামনে প্যাট্রিস লুমুম্বার সুন্দর এক স্ট্যাচু। ওর ডাইনে, মানে ক্রেস্তের দিকে আগ্রনমি ফ্যাকাল্টি। পাভ্লভস্কায়া থেকে ওরা পুরোপুরি এখানেই চলে এসেছে। ফিলোলজি ফ্যাকাল্টির বাঁয়ে সোশিয়লজি ফ্যাকাল্টি, আস্পিরান্তুরা বিষয়ক অফিস। এসব বিল্ডিঙ্গে নিজ নিজ বড় অডটরিয়াম, ফলে ছাত্র সংগঠনের অনুষ্ঠানগুলো এখন এই এলাকায় হয়। আমাদের সময় ক্রেস্তে বিভিন্ন দেশের বিপ্লবী নেতাদের ছবি ছিল, সালভাদর আলিয়েন্দে, জামাল আব্দুল নাসের…। এখন এসব নতুন বিল্ডিঙের সামনে কারও কারও স্ট্যাচু করার পরিকল্পনার কথা শুনছি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইউনিভার্সিটি প্যাট্রিস লুমুম্বা নাম ত্যাগ করলেও বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণের মানুষের প্রতি তার অঙ্গীকার থেকে সরে আসেনি। আজ তার নতুন স্লোগান “জ্ঞানের মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে আমরা নেতৃত্ব তৈরি করি, যারা পৃথিবীকে আরও সুন্দর করে তোলে”। আমাদের ইউনিভার্সিটি আর বায়োকেমিস্ট্রি ইনস্টিটিউটের মাঝে দিয়ে ভল্গিনার প্যারালাল একটা নতুন রাস্তা হয়েছে আর হয়েছ অনেক বসত বাড়ি। তবে যে রাস্তা দিয়ে আমরা সেকেণ্ড মেডিক্যাল যেতাম তার তেমন কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।
হোস্টেলগুলো কি আগের মতই আছে? সেই পাঁচতলা ব্লক গুলো নিশ্চয়ই আর নেই। আছে, সবই আছে। তবে বাইরে থেকে বদলে গেছে। আমাদের সময় ১ নম্বর ব্লকে থাকত ফ্যামিলি, এখন মেয়েরা। তবে এখন ছেলেমেয়েরা মূলত একই সাথে থাকে অন্যান্য ইনস্টিটিউটের মত। ২ আর ৩ নম্বর ব্লক এখন হোস্টেল। আমি নিজেই তো দুই নম্বরে ছিলাম। এটা ফিজ-ম্যাথের হোস্টেল ছিল। ৩ নম্বরে প্রস্তুতি পর্বের ক্লাস হত, এখন হোস্টেল। ওদের ক্লাস হয় ফিলোলজি ফ্যাকাল্টিতে। ৪ নম্বর ব্লকে ইংলিশ, স্প্যানিস, ফ্রেঞ্চ ইত্যাদি বিদেশী ভাষার ক্লাস হয়। হিসাবরক্ষণ বিভাগ মানে ইউনিভার্সিটির বুখগালতেরিয়া ৪ নম্বরেই।
সেই দোকানটা আছে যেখানে আমরা ক্লাস থেকে ফেরার পথে রুটি মাখন কিনতাম? ওখানেই তো ব্যাংক ছিল আর টেলিফোন টেলিগ্রাফ অফিস।
বিশাল পরিবর্তন হয়েছে এই কমপ্লেক্সে। মূলত বিভিন্ন ক্যাফে। সবচেয়ে হাসির ক্যাফে "মামা ইয়া না পারে" মানে "মা আমি ক্লাসে"। ওটা বলা চলে আরব্য খাবারের কেন্দ্র। ১ নম্বর ব্লকে বুফে আর নেই, সেখানেও আরব্য বা আফগান কাফে। দুই নম্বরের নীচের ইন্ডিয়ান দোকান এখনও আছে। ওদিকে মূলত যাই মশলা আর সনপাপড়ি কিনতে। বাচ্চারা খুব পছন্দ করে। নীচ থেকে দেখি নিজের সেই ৫১০ নম্বর ঘর যেখানে কেটেছে প্রায় ৯ বছর। ৫, ৬, ৭, ৮ এগুলোও হোস্টেল। তবে প্রস্তুতি পর্ব আগের মত নেই, ওদের আলাদা হোস্টেল নেই, থাকে যে যে সাবজেক্টে পড়বে সেই হোস্টেলে। ৮ নম্বরে মূলত ফিজ-ম্যাথ আর ইঞ্জিনিয়ার। তোদের ৭ নম্বরেও মূলত ভবিষ্যতের ডাক্তাররা। ৯, ১০, ১১ – এখানেও ছাত্ররাই থাকে। তবে স্কলারশীপ নিয়ে যারা আসে, তারা থাকে পুরনো ৫ তলা হোস্টেলে।
আমাদের চোখের সামনেই তো ১০ আর ১১ নম্বর হোস্টেল হল। এখন নতুন কোন হোস্টেল তৈরি করেনি?
৬ আর ৭ এর মাঝে দুটো নতুন বহুতল হোস্টেল, ১২ আর ১৩ নম্বর ব্লক। একই রকন দুটো বহুতল নতুন হোস্টেল ২ আর ৩ নম্বরের মধ্যে – ১৪ আর ১৫ নম্বর ব্লক। এসব হোস্টেলে থাকে যাদের পয়সা আছে, মানে এসব অনেকটা হোটেল টাইপ। এখন তো ছাত্রও প্রচুর। অফিসিয়াল সাইটে গেলে জানা যায় সেখানে এখন ৩৩ হাজার শিক্ষার্থী, এর ৯ হাজার বিদেশী, হোস্টেলে সীট সংখ্যা ৮ হাজার। আমাদের সময়ে প্রতি তিন জন বিদেশীর বিপরীতে একজন সোভিয়েত শিক্ষার্থী থাকত। এখন রেশিও উল্টে গেছে। এই মুহূর্তে ১৫৮ দেশের ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করছে। এক কথায় ইউনিভার্সিটি বড় হচ্ছে। বলতে ভুলে গেছি, পুরনো ইন্টারক্লাব এখন ক্যাডার ডিপার্টমেন্ট। নতুন ইন্টারক্লাব আগের মতই আছে, ১০ নম্বরের পেছনে। ওকে ঘিরে বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট – ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টও আছে। পুরো ক্যাম্পাসটাই দেয়াল ঘেরা। আগের মত চাইলেই ঢোকা যায় না। আগে তো চাইলেই হোস্টেলে যাওয়া যেত, এখন মনে হয় সেই সুযোগ কম। আমি ২০১০ থেকে রেগুলার ওই এলাকায় যাই, কিন্তু কখনই ঢোকা হয়নি।
বনটা কি আগের মতই আছে? তোর মনে আছে, প্রস্তুতি পর্বে পড়ার সময় আমরা প্রায়ই ওখানে হাঁটতে যেতাম, দেশের গল্প করতাম?
হ্যাঁ। তুই তোর স্কুলের বান্ধবীর গল্প এখানেই শুনিয়েছিলি আর তো ছোট ভাইয়ের। আমরা দুজনেই তো লেনিন ভাইয়ের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন গিয়েছিলাম। সে কথাও হত। আচ্ছা লেনিন ভাই কেমন আছেন? যোগাযোগ হয়?
আছেন ভালই। তোকে নিয়ে একদিন যাব ওনার অফিসে। তুই বরং বনের গল্প বল।
বনের ওদিকটায় অনেক দিন যাইনি। শেষ যাই ২০১৫ সালে মনে হয়। অনেক বদলে গেছে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। প্রস্তুতি পর্বে পড়ার সময় আমারা যেখানে হাঁটতাম সেটা আগের মতই আছে, তবে রাস্তাটা ভালো করেছে, মাঝে মাঝে বেঞ্চি আর ল্যাম্প পোস্ট। ওখানে মেট্রো হবে, মনে হয় লেকের আশেপাশে কোথাও। এটা হবে নতুন সার্কেল লাইন। প্রস্পেক্ট ভেরনাদস্কগা আর কালুঝস্কায়ার মাঝে, নাম হবে উনিভারসিতেত দ্রুঝবি নারদভ। হোস্টেল থেকে ৫০০ মিটার দূরে। মনে হয় সিকিউরিটির কথা মাথায় রেখে এখানে নতুন রাস্তাঘাটও হবে মেট্রো পর্যন্ত। আমি তো পরেও বনে প্রায়ই যেতাম। গনেশ দা মস্কো থাকতে শ্রীকুমার, গনেশ দা আর আমি সকালে দৌড়ুতে যেতাম লেকের ধারে, এরপর গনেশ দার ঘরে রুটি আর চা। ওনার বন্ধু আস্ত্রাখান থেকে এলে ক্যাভিয়ার থাকত। এছাড়া যেতাম ছবি তুলতে। বন, পাখি, বসন্তের শুরুতে বনের ভেতর যে নালাটা ছিল সেখান দিয়ে বরফগলা জল তরুণীর মত দৌড়ুত – তার ছবি তুলতাম। একবার সন্ধ্যায় লেকের ধারে ছবি তুলে ফিরছি, কোত্থেকে একদল কাক সে কী তাড়াই যে করল, আমি তো ভাবলাম হিচককের "পাখির" নায়কের মত অবস্থা না হয় আমার। আর ভার্সিটির শেষ দিনগুলোয় ওখানে ব্যাডমিন্টন খেলতে যেতাম সবাই মিলে। আমি অবশ্য খুব একটা খেলতাম না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বই পড়তাম। একদিন তো হাঁটতে গিয়ে কুকুরের পাল্লায় পড়লাম। যতটা না কামড়, তার চেয়ে বেশি ব্যথা পেয়েছিলাম ওর থাবার ধাক্কায়। মিনিমাম ১০০ কেজি ওজন ছিল ওই আভচারকার। খুব ভয় পেয়েছিলাম। কুকুরের মালিক বলল ভয়ের কিছু নেই, ইঞ্জেকশন দেওয়া আছে। পরে কাকু সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, এসব বড় কুকুর কামড়ালে ভয় পেতে নেই। এক কথায় আমাদের ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস আগের চেয়ে অনেক বেশি সাজান গছানো, অনেক বেশি পরিপাটি।
১০ নম্বরের ওদিকের এলাকাগুলো আগের মত আছে? নাকি সেখানেও নতুন দালানকোঠা গজিয়েছে?
১০ নম্বর আর জিওলজি ইনস্টিটিউটের মাঝে কী একটা হয়েছে, তবে আহামরি কিছু না। রাস্তার ডানদিকে বিলায়েভা পর্যন্ত বলতে গেলে আগের মতই আছে। এদিকে ভিতিয়াজ সিনেমা হলে রিকন্সট্রাকশন শুরু হয়েছে। জানিস ভিতিয়াজ নাম কোত্থেকে? মিকলুখো মাকলাই যে জাহাজে করে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন, তাঁর নাম ছিল ভিতিয়াজ। আমি সিওর মিকলুখো মাকলাই এর নামে উৎসর্গকৃত এই রাস্তায় সিনেমা হলের নাম এ কারণেই ভিতিয়াজ রাখা হয়। দিয়েতা দোকানটা বদলে গেছে, বড় হয়েছে। সময়ের সাথে সব কিছুই বড় হয়। আমরা নিজেরাই কত বড় হয়ে গেছি। বিলায়েভার ওদিকে অনেক নতুন দোকানপাট, অনেক নতুন নতুন বহুতল বাড়ি। আশান নামে বিশাল এক সুপার মার্কেট হয়েছে প্রফসায়ুজনায়া উলিৎসার ওপারে। এখনও আগের মতই বাস স্ট্যাণ্ডে বিদেশি ছাত্ররা দাঁড়িয়ে থাকে, হেঁটেও যায় অনেকেই। নিজেও মাঝে মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে আর পুরনো দিনের কথা মনে করতে করতে চলে যাই ইউনিভার্সিটির দিকে, বিশেষ করে হেমন্তে যখন সোনার গয়নার প্রকৃতি সেজে ওঠে। মস্কোয় আমার চলার এই এক অসুবিধা, বিশেষ করে একা কোথাও গেলেই তোরা ভীর করে আমার পিছু নিস, আমি বর্তমান আর অতীতের সমন্বয়ে গড়া এক অপার্থিব মস্কোর বুকে হেঁটে বেড়াই।
আসলে উলিৎসা মিকলুখো মাকলায়া শুধু কংক্রিটের রাস্তা নয়। এক বন্ধু যেমন বলল, "অনেক অনেক জীবনের পথচলার প্রারম্ভিক চারণ ভূমি।" তাই মানুষকে বাদ দিয়ে তো মিকলুখো মাকলায়ার কথা বলা যায় না। তবে বিনে পয়সায় সেটা হবে না। আগে ভাত দে, তারপর মানুষের কথা বলব।

Comments
Post a Comment