শৈশবের খোঁজে
(৮)
ডিএসসি ডিফেণ্ড করার পর অভির জীবনের অনেক কিছুই বদলে যায়। আগে সব কাজ ছিল রেজাল্ট
ওরিয়েন্টেড, মানে চেষ্টা করত যত দ্রুত সম্ভব রেজাল্ট পাবলিশ করার। এখন সেই তাড়া ছিল
না, এমন কি কোন কাজ করে কয়েক মাস অপেক্ষা করত সেটা সাবমিট করার আগে। আবার নতুন করে
সবকিছু দেখে তার সত্যটা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হলে তবেই কাজটা কোথাও সাবমিট করত। এ সময়
ও খেয়াল করল এর আগে কিছু কাজে ভুল ছিল। সেটা গাণিতিক ভুল নয়, ইন্টারপ্রিটেশনের ভুল।
অনেক আগেই অবশ্য সন্দেহ করেছিল, ওর শিক্ষক প্রোফেসর শিকিনকে বলেছিলও। তবে শিকিন গুরুত্ব
দেননি। এখন আর সেই বাধা ছিল না। সেই সব ইস্যুর উপর কয়েকটা পেপার পাবলিশ করল। শিকিন
দেখে বললেন
তার মানে, আমি সারা জীবন যা করলাম সব ভুল?
না গিওরগি নিকলায়েভিচ, সেটা ভুল নয়। আমরা ভেবেছিলাম রেজাল্টগুলো জেনারেল, কিন্তু আমি
দেখিয়েছি সেটা পারশিয়াল। সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
কিন্তু।
কোন কিন্তু নয়। ভালো যে আমি বা আমরা নিজেরা নিজেদের ভুলটা বুঝতে পেরেছি।
অভির মনে হয়নি শিকিন কনভিনসড। না, অভির কাল্কুলেশনে উনি ভুল পাননি। তবে যত বড় বিজ্ঞানীই
হোক না কেন, নিজের ভুলটা কেউ চোখে আঙ্গুল দিয়ে ধরিয়ে দিলে সহজে সেটা মেনে নিতে পারেন
না। আইনস্টাইন নিজেও পারেননি যখন ফ্রিদম্যান আইনস্টাইনের সমীকরণ সমাধান করে দেখান মহাবিশ্ব
পরিবর্তনশীল। উনি সেখানে কসমোলজিক্যল টার্ম যোগ করেছেন যুগযুগ ধরে বিদ্যমান অপরিবর্তনশীল
বিশ্বের ধারণাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে। এই সেই আইনস্টাইন যিনি স্পেস-টাইমের ধারণা বদলে দেন,
তিনিও কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি।
এভাবেই অভির সময় কাটছিল রিসার্চের কাজে, ছবি তুলে, মাঝেমধ্যে লেখালেখি করে। অভি আগেও
লিখত, তবে এতদিন সংসারের আর কাজের চাপে সেটা হয়ে ওঠেনি। চাপ ঠিক না, তবে লেখালেখি করার
প্রয়োজন বোধ করেনি। নতুন করে বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ হওয়ায় দেশের খবর জানতে শুরু করল,
লেখার প্রচুর ম্যাটেরিয়াল হাতে এলো। সেই সাথে বাড়ির সাথে যোগাযোগও নতুন মাত্রা পেল।
সোভিয়েত আমলে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। বাড়িতে ফোন ছিল না। এখন গ্রামীন ফোনের
কল্যাণে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ এলো। তবে তখনও ফোন করা ছিল বেশ ব্যয়সাপেক্ষ, তাই ফোন
করা হত দু চার মিনিটের জন্য। সব সময়ই দেশে ফেরার ডাক পেত ওদিক থেকে। অভির যে দেশে ফিরতে
ইচ্ছে করত না তা নয়, তবে সেটা বেড়াতে, একেবারে চলে যাওয়ার জন্য নয়, অন্তত ২০২০ সালের
আগে পর্যন্ত যতদিন না ছোট ছেলের বয়েস ১৮ পূর্ণ হয়। তাছাড়া চাইলেই তো আর যাওয়া যায় না।
এজন্য পয়সা দরকার।
১৯৮৩ সালে মস্কো আসার পর থেকে অভি কয়েকবার দেশে গেছে। প্রথম বার ১৯৮৭ সালে। তখন অভিদের,
যারা ব্যবসা করত না বা লন্ডন যেত না কাজ করতে, দেশের যাওয়ার পয়সা যোগাড়ের একমাত্র উপায়
ছিল স্ত্রই আত্রিয়াদে মানে ছাত্র নির্মাণ দলে কাজ করা। অভি কাজাখস্তান ও সাইবেরিয়ায়
দুবার কাজ করে টাকা যোগাড় করে দেশে যাওয়ার। এরপর যায় ১৯৮৯ সালে মাস্টার্স শেষ করে সাড়ে
তিন মাসের জন্য। এরপর ১৯৯১ ও ১৯৯৭ সালে। ১৯৯৭ সালে যায় মূলত পুনা একটা কনফারেন্সে অংশ
নিতে। তারপর আর যাওয়া হয়নি। সময়, সুযোগ, অর্থ – সব কিছুরই বাড়ন্ত ছিল। তবে বর্তমানে
এই একাকীত্ব থেকে পালানোর দরকার ছিল। কিছুদিনের জন্য হলেও। ঠিক সেই সময় অভিকে ফোন করল
ওর দোস্ত। হয়তো সেটাই প্রথম। এর আগে ফেসবুকে যোগাযোগ হয়, মাঝে মধ্যে ছবিতে কমেন্ট,
কখনও বা ওখানেই দু চারটে কথা বিনিময়।
- তুই দেশে আসিস না কেন?
- সময়, সুযোগ হয়ে ওঠে না।
ও আমাকে ভালোভাবেই জানত। জানত আমার চালচুলোহীন জীবনের কথা।
- টিকেটের টাকা আছে?
- না।
- তুই সময় বের কর। আমি টিকেট পাঠাব।
- শোন, আপাতত দরকার নেই। আমি দেখি এদিকে ম্যানেজ করতে পারি কি না।
- ঠিক আছে। তুই তাড়াতাড়ি কর। এবার ডিসেম্বরে কিন্তু অবশ্যই আসবি।
এই প্রথম অভির দেওয়ালে পিঠ থেকে গেল। কোন দিন ভাবেনি যে বাড়ি যাওয়ার জন্য ইনস্টিটিউটের
শরণাপন্ন হতে হবে। তবে ডাইরেক্টরকে বলায় বললেন, আমরা তো কাউকে শুধু শুধু কোথাও পাঠাতে
পারি না। কোন একটা ফর্মাল কারণ লাগবে। তুমি ওখানকার কোন ইউনিভার্সিটি বা ইনস্টিটিউটে
যেতে পার নিজের কাজের উপর লেকচার দিতে বা আমাদের ইনস্টিটিউট সম্পর্কে ওদের বলতে। এ
জন্যে দরকার সেখান থেকে কোন ফর্মাল ইনভাইটেশন। ওটা আন, বাকিটা ম্যানেজ করছি।
দীর্ঘ ১৪ বছর পরে অভি দেশে যায় ২০১১ সালের পয়লা ডিসেম্বর। এ যেন চৌদ্দ বছর বনবাসে থাকার পর ঘরে ফেরা। সাথে কিছু
কাজ নিয়ে গিয়েছিল, যেমন দেশের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি বা ইনস্টিটিউটে লেকচার দেওয়া, ওদের
ইনস্টিটিউট সম্পর্কে বলা। তবে সে সবই ছিল ফর্মাল। তবে সেসব করার দরকার ছিল। সেদিক থেকে
সোভিয়েত ফেরত বন্ধুদের অনেকেই সাহায্য করেন নিজেদের প্রতিষ্ঠানে লেকচারের আয়োজন করে।
এভাবেই পরিচয় হয় অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল সহ অনেকের
সাথে। দেখতে দেখতে তিন মাস কেটে যায় বাড়িতে। সময়টা মূলত কাটে গ্রামের বাড়িতে শৈশব অন্বেষণে। বিগত পঁচিশ বছর ও শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিবর্তনই দেখেছে,
দেখেছে মহাপরাক্রমশালী একটা বিশাল দেশের ভাঙ্গন। একই সময়ে
পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যে গড়ার কাজ চলছে, ওর
দেশ, ওর গ্রামও যে আমূল বদলে গেছে সেটা মনে হয়নি। ওর ফেলে
যাওয়া তরা এখন আর গ্রাম নয়, কলকারখানা, নতুন রাস্তাঘাট এর জীবনে এনেছে শহরের আমেজ। এরই মাঝে ও খুঁজে বেড়াচ্ছে ক্রমাগত হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্মৃতি। কখনও কালীগঙ্গা নদীর তীরে, কখনও বা দক্ষিণের হলুদ বরণ সর্ষে
ক্ষেতে। এরই মধ্যে ছুটে যাচ্ছে সোভিয়েত ফেরত বন্ধুদের
আড্ডায়। গল্পে গল্পে
ফিরে যাচ্ছে আশির দশকের মস্কোর রাস্তায়, সেই মিখলুখো মাকলায়া স্ট্রিট, লেনিনস্কি প্রস্পেক্ট,
জুবভস্কি বুলভারের প্রগতি প্রকাশনে। সেসব আড্ডায়,
সোভিয়েত ফেরত বিশেষজ্ঞদের সংগঠন সাব-এর বাৎসরিক বনভোজনে দেশ বিদেশ থেকে আসা পুরনো বন্ধুদের
সাথে দেখা হয়, দেখা হয় ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতির
সাথে। কিন্তু দুলালের দেখা মেলে না কোথাও। কেউ কোন খবরই দিতে পারে না ওর ব্যাপারে। দুলালের দেখা বা খবর না পেলেও অভি অনেকের সাথে নতুন করে পরিচিত
হয়। ওর বন্ধুদের প্রায় সবাই সোভিয়েত ফেরত। ওদের সাথে পরিচয় যৌবনের উত্তাল সময়ে, যখন
সবাই উন্নত (সমাজতান্ত্রিক) বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর। তারপর আসে পেরেস্ত্রইকার
দমকা হাওয়া কাচা টাকার সুরেলা সঙ্গীত নিয়ে। ভঙ্গ হয় স্বপ্ন, ভেঙ্গে যায় দেশ। ছিঁড়ে
যায় বন্ধুত্বের তার। অস্থিতিশীল সেসব দিনে সবাই ব্যস্ত বাতাসে উড়ে বেড়ানো টাকা ধরতে।
এখন ২০১১ সালে অনেকেই যখন ঘর বেঁধেছে, ব্যবসা বা চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে – আগের সেই
অস্থির ভাব আর নেই। আবার সময় এসেছে বসে গল্প করার, ফেলে আসা দিনগুলো নিয়ে কথা বলার।
আড্ডা জমছে, আগের মত দেশ গড়ার স্বপ্ন আর চোখে নেই, আছে দেশ নিয়ে অস্থিরতা, নিজেদের,
বিশেষ করে ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা। এখন আমরা কেউই আর সর্বহারা নই, সবারই
শেকল ছাড়াও হারানোর মত ঘর, বাড়ি, গাড়ি – এসব আছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠার সাথে
আছে এসব হারানো ভয়। আর আছে এই ভয় থেকে মুক্তির জন্য একজন ঈশ্বরের প্রয়োজন। নিজেদের
অক্লান্ত চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত মানুষেরা অনায়াসে তাদের সাফল্য ভাগ করে নিচ্ছে ঈশ্বরের
সাথে, ধন্যবাদ জানাচ্ছে তাঁকে। অভি ভাবে এরা যদি তাদের সাফল্যের ছিটেফোঁটাও যেসব প্রান্তিক
মানুষের প্রচেষ্টায় আজকে তাদের এই উন্নতি, সেই সব মানুষের সাথে ভাগ করে নিত, সেইসব
প্রান্তিক মানুষের প্রতি সহমর্মিতা অনুভব করত, পরলোকে নয়, এখানেই তারা স্বর্গ গড়তে
পারত, নিজেদের যৌবনের স্বপ্নটাকে কিছুতে হলেও বাস্তব করতে পারত।
পয়লা ডিসেম্বর ২০১১, মানে শীতের প্রথম দিনে অভির দেশের উদ্দেশ্যে মস্কো ছেড়েছিল, ঠিক
তিন মাস দেশে কাটিয়ে ২০১২ সালের পয়লা মার্চ, মানে বসন্তের প্রথম দিন অভি মস্কো ফিরে
আসে। ফিরে নতুন করে চেষ্টা করে দুলালের খবর জানতে। এর মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে মস্কোয় বসবাসকারী পুরনো
বন্ধুদের অনেকের সাথেই দেখা হয়, যোগাযোগ গড়ে ওঠে নতুন করে। ওদের কাছে
জানতে চায় দুলালের কথা। কিন্তু সেই একই কথা – কেউ বলছে ও রাশিয়ায়
আছে, কেউ বলছে অন্য দেশে। কেউ নিজে দেখেনি, সবই শোনা কথা। যত না খবর, তার চেয়ে বেশি গুজব। যেন ছেলেটা সবার জীবন থেকে হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে। এক সময় খোঁজ নেওয়া
বন্ধ হল। এভাবেই একদিন দুলাল অভির ভাবনা থেকে
উধাও হয়ে গেল।
দুলাল উধাও হলেও দেশ উধাও হয় না। দেশকে নতুন করে পাওয়ার আনন্দে বছর শেষে অভি দুবনায়
এক ছবি প্রদর্শনীর আয়োজন করে “শৈশবে ফেরা” নাম দিয়ে। (http://bijansaha.ru/albshow.html?tag=79)

Comments
Post a Comment