ভার্সিটির দিনগুলো

(৪)

সোভিয়েত ইউনিয়নে লেখাপড়া করার কারণে ছোট বড় অনেকের সাথেই ওদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হত, যেটা দেশে হয়ত সব সময় সম্ভব ছিল না
দুলালের সাথেও অভির ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে অভি এক সহপাঠী বন্ধুর সাথে মেস করে খেত ও আসার পরে অভিদের মেসে যোগ দেয় ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ওর দেশে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা অভি জানতে পারে জানতে পারে ওর স্বপ্নের কথা যেহেতু দেশে অধিকাংশ মানুষের ধারণা বিদেশে থাকা মানেই অনেক টাকা পয়সা উপার্জন করা, তাই ওর মধ্যবিত্ত পরিবারও আশা করত দুলালের সাহায্যের সেই স্বল্প স্টাইপেন্ড থেকে কিছু কিছু টাকা বাঁচিয়ে ও চেষ্টা করত বাড়িতে পাঠাতে পড়াশুনাও করত মনোযোগ দিয়ে এখানে বলে রাখা ভালো যে দুলাল যখন মস্কো আসে ওর সাবজেক্ট ছিল এগ্রিকালচার তাই আসার পর থেকেই ওর একান্ত চেষ্টা ছিল বিষয় পরিবর্তন করে মেডিসিনে চলে যাওয়া এটা করার জন্যে দরকার ছিল ভালো পড়াশুনা, ভালো রেজাল্ট ওর নিজের আর ছাত্র সংগঠনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত দুলাল মেডিসিনে ভর্তি হয় নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আরও একটু এগিয়ে যায় 

বাংলাদেশ থেকে আসা প্রায় সবার মতই দুলালও অবাক হয়ছিল মস্কোর রাস্তাঘাট, লোকজন দেখে
এই উঁচু উঁচু বসত বাড়ি, এই প্রশস্ত আর ঝকঝকে রাস্তাঘাট, মেট্রো, ট্রামে-বাসে-ট্রেনে বই বা খবরের কাগজে মুখ গুঁজে থাকা মানুষজন সবই ছিল অবাক করার মত কারো কোন তাড়া নেই কী এক প্রশান্তির ভাব সবার চোখে মুখে এ যেন এক অন্য বিশ্ব খারাপ কিছু যে ছিল না তা নয় তবে সে বুঝেছিল মানুষ লোভ লালসার ঊর্ধ্বে নয় ভাল মন্দ সব মিলিয়েই সমাজ তাই যেকোনো সমাজে ভালর পাশাপাশি মন্দও থাকবে সেটাই স্বাভাবিক আসল কথা এই ভাল মন্দের অনুপাত তখনও পেরেস্ত্রোইকা আর গ্লাসনস্তের উত্তাল হাওয়া সোভিয়েত ব্যবস্থাকে দোলা দিতে পারেনি তবে পরিবর্তনের হাওয়া এরই মধ্যে বইতে শুরু করেছে

দুলাল অন্য দশটা মেডিক্যালের ছাত্রছাত্রীর মতই ব্যস্ত জীবন কাটাচ্ছিল
অভি নিজে পড়ত ফিজিক্সে ক্লাসের পরে লাইব্রেরীতে বসে হোম টাস্ক করে যেত বন্ধুদের বিরক্ত করতে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির ছাত্রছাত্রীরা প্রায়ই ড্রয়িং নিয়ে ব্যস্ত থাকত নিজেদের রুমে তবুও ওদের সাথে ভালই আড্ডা হত কিন্তু ডাক্তারদের কথা ভিন্ন ওরা সব সময় মুখ গুঁজে বসে থাকত বইয়ের পাতায় আড্ডায় বসলেও যদি দুই মেডিক্যালের ছাত্র একসাথে হত তাহলেই হল ক্লাসের বাইরে আর কোনই কথা নেই ওদের তবে এটাও ঠিক, যদি অন্যদের মাঝে মধ্যে ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ ছিল সেটা ওদের ছিল না মোটেই ফলে ওদের গ্রুপগুলোর পরিবেশ ছিল বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ওরা গ্রুপে জন্মদিন বা অন্যান্য উৎসব পালন করত, কখনও গ্রুপের সবাই মিলে বেড়াতে যেত অভিদের গ্রুপ ছিল শুধুই নামে সবাই ছিলাম ইন্ডিভিজুয়ালিস্ট, মানে যার যার তার তার তার মানে এই নয় যে অভিদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল না, তবে সেটা একেবারেই ভিন্ন ধরণের যারা একসাথে কোন এক্সপেরিমেন্টে জড়িত তাদের কথা ভিন্ন, কিন্তু থিওরিতে যারা পড়ে তাদের মধ্যে কালেক্টিভ কাজকর্মের টেন্ডেন্সি কম হতে পারে কোন ক্লাস বা গ্রুপ কতগুলো ইন্ডিভিজুয়ালের সমষ্টি হবে নাকি সত্যিকারের কালেক্টিভ হবে সেটা নির্ভর করে কাজের ধরণ বা সাব্জেক্টের উপর   ঐ সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে ভালো চায়ের অভাব ছিল দেশ থেকে আর কলকাতা থেকে অভি প্রায়ই চা আর কফি পেত তাই গ্রুপমেটরা অভির রুমে আসত সন্ধ্যায় চায়ের আড্ডায় তবে ওদের আড্ডার গল্প ছিল ক্লাসের বাইরের কখনও ফটোগ্রাফি, কখনও সিনেমা, কখনও বই, কখনও মিউজিক আবার কখনও ফুটবল বা আইস হকি নিয়ে কথা হত অভি আর ওর রুমমেট দু’জনেই এসব পছন্দ করত, যদিও ওদের প্রিয় গ্রুপ বা টিম ছিল ভিন্ন ভিন্ন যেমন ও বিটলসের ভক্ত ছিল আর অভি পিঙ্ক ফ্লয়েডের ও ৎসেএসকেআ-এর সাপোর্টার আর অভি স্পার্তাকের



Comments

Popular posts from this blog

সোভিয়েত থেকে রাশিয়া

কাজান

আগ্রা মথুরা বৃন্দাবন