পেরেস্ত্রইকার দমকা হাওয়া

(৫)

ফিরে আসা যাক দুলালের কথায়
। পড়াশুনার চাপ থাকলেও ওর বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ ছিল। তাই ও প্রায়ই অভির সঙ্গী হত। অভির ছিল ছবি তোলার শখ। অভি ওকে নিয়ে যেত মস্কোর বিভিন্ন প্রান্তে; ঘুরত, ছবি তুলত। কখনও যেত মিউজিয়ামে বিভিন্ন শিল্পীদের পেইন্টিং দেখতে, কখনও থিয়েটারে। যাকে বলে জীবনকে যতটুকু উপভোগ করা যায়, ক্লাসের বাইরে জীবন থেকে যতটুকু শেখা যায় সেটা করার চেষ্টা করত। এই ঘোরাফেরার ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের স্বপ্নের কথা বলত, বলত দেশে গিয়ে কে কি করবে, কীভাবে সমাজতন্ত্রের দেশে পাওয়া শিক্ষাকে দেশের কাজে লাগাবে, কীভাবে নিজেরাও হবে সমাজতন্ত্রের সৈনিক। ওদের সে স্বপ্নে নিজেদের ভবিষ্যতের চেয়ে দেশের ভবিষ্যতের কথাই বেশি উঠে আসত। দেশ থেকে সিপিবির কেউ আসলে ওরা দেখা করত তাঁদের সাথে, মন দিয়ে শুনত তাঁদের কথা। দেশে তখন সিপিবির স্বর্ণ যুগ। কৃষক সমিতি, ক্ষেত মজুর সমিতি থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি গণসংগঠন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। মনে হত মস্কোয় বসেই ওরা দেশে বিপ্লবের গন্ধ পেত। তারপর এল পেরস্ত্রোইকা আর গ্লাসনস্তের দমকা হাওয়া। ফরহাদ ভাই মারা গেলেন। দেশের বিপ্লবী হাওয়া স্তিমিত হল। মস্কোয় ওদের মধ্যেও দেখা দিলো বিভিন্ন প্রবনতা। কাঁচা টাকার প্রবল আকর্ষণে সাম্যবাদের আদর্শের পথ থেকে ছিটকে পড়ল অনেকেই। ক্লাসের পড়ার থেকে ডলারের কোর্স, সিঙ্গাপুর থেকে আনা কম্পিউটারের দামের হিসেব নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ল অনেকে। তখন অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীদের মনে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার চেয়ে দু’হাতে মস্কোর বাতাসে উড়ে বেড়ানো পয়সা ধরাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হল। এটা যে শুধু ওদের মধ্যে ঘটেছে তা নয়। সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে সবাই কমবেশি চেষ্টা করেছে এই স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে। সরকারী স্টাইপেন্ডে আর দিন চলছিল না। এমন কি শুধু খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার জন্য হলেও প্রায় সবাইকে কিছু না কিছু অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজতে হয়েছে অথবা দেশে টাকার জন্য লিখতে হয়েছে। তবে ঐ সময় কেউ কেউ শুধু টিকে থাকার জন্য টুকটাক ব্যবসা করলেও অনেকেই ব্যবসাকেই তাদের পেশা হিসেবে বেছে নেয়। এই অনেকের মধ্যে দুলালও ছিল একজন।  

এরপর থেকেই দুলালের সাথে অভির সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু হয়। না, ওরা এ নিয়ে কোন তর্ক-বিতর্ক করেনি, কেউ কাউকে এর ভালমন্দ দিক নিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেনি। নিজেদের অজান্তেই ওদের পথ দু’ দিকে বেঁকে গেছে। আগে ওরা একসাথে অনেক সময় কাটাত, অনেক কিছু করত। এখন সেসবের প্রতি দুলালের আর আগ্রহ ছিলনা। মিউজিয়াম আর থিয়েটারের পরিবর্তে ওর পছন্দ এখন হোটেল আর রেস্টুরেন্ট, কোন বই বা দেশের অবস্থা নিয়ে কথা না বলে ও এখন ব্যবসার কথা বলতে, ডলারের রেট, কম্পিউটারের দাম এসব নিয়ে কথা বলতে ভালবাসে। এক সময় পরস্পরের সংগ ওদের জন্য যত না আনন্দের তার চেয়ে বেশি বেদনাদায়ক বলে মনে হতে শুরু করল। না, দোষটা ওর নয়, অভিরই। অভিই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি, যখন সবাই দু’ হাতে পয়সা লুফে নিতে ব্যস্ত, অভি ওদের সঙ্গ দিতে পারেনি। অন্যদের প্রতি অভির অবশ্য কোন ক্ষোভ ছিল না, যতটা ছিল দুলালের প্রতি। অভির কেন যেন মনে হয়েছে ও কাজটা ঠিক করছে না। ও নিজের স্বপ্নটাকে পালিয়ে যেতে দিচ্ছে। কে জানে? হয়ত খুব সাদাসিধে ছিল অভি। ওর কেন যেন মনে হত যে ডাক্তার হতে চায়, সে ডাক্তার হতে চায় ডাক্তার হওয়ার জন্যই, চিকিৎসা করার তাগিদ থেকে, মানুষের সেবা করার আনন্দ থেকে। পরে অবশ্য বুঝেছে চিকিৎসা, মানব সেবা এসব থাকলেও ডাক্তারের সামাজিক মর্যাদা, টাকাপয়সা, গাড়ি-বাড়ি এসবও ডাক্তারিকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে কম ভূমিকা পালন করে না। আর কারো স্বপ্ন যদি টাকাপয়সা, গাড়ি-বাড়ি এসবই হয় তাহলে সেটা যে শুধু ডাক্তারির মাধ্যমেই হতে হবে তেমন তো কোন কথা নেই। তবে যেহেতু অভির মনে হয়ছিল দুলাল ডাক্তার হতে চেয়েছিল প্যাশন থেকে, যেমনটা কিনা অভি পদার্থবিদ হতে চেয়েছে, তাই ওর এই পেশা থেকে চলে যাওয়াটা ঠিক মেনে নিতে পারেনি। না, ব্যাপারটা এ নয় যে ও পড়াশুনা বাদ দিয়েছে, তবে ইদানীং কালে ও পড়াশুনাটা করছে অনেকটা দায়সারা গোছের, ঠিক যেটুকু না করলে নয়। যেন কোন মতে সার্টিফিকেট হাতে পেলেই হয়ে যায়। এভাবেই অভি ওর মধ্যে দেখতে পেয়েছে ভবিষ্যতের একজন সত্যিকারের ডাক্তারের মৃত্যু। এটাই অভিকে ব্যথিত করেছে। আসলে শুধু দুলালের একার ঘটনাই নয়, এ সময়ে অভিদের  অনেকেই, যারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করত, একই সাথে চলাফেরা করত, স্বপ্ন দেখত দেশে ফিরে দেশের ও দশের জন্য কাজ করার, ধীরে ধীরে নতুন স্রোতে ভেসে যেতে শুরু করে। অভি নিজেকে কেমন যেন সমাজচ্যুত মনে করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ও নিজেই নিজেকে গুটিয়ে নেয় বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্ম থেকে। সময় কাটত নিজের থিসিসের কাজ করে, গল্পের বই পড়ে। পুরনো বন্ধু ও সহপাঠীদের অনেকেই এর মধ্যে মস্কো ছেড়ে চলে যেতে শুরু করল। ফলে সব মিলিয়ে জীবন হয়ে উঠল বেশ দুর্বিষহ। এর মধ্যে ধার দেনাও কম হয়নি। আসলে সময়টাই ছিল অন্য রকম। কথায় বলে বড়লোকের প্রতিবেশী হলে ইচ্ছা অনিচ্ছায় বড়লোকি চাল দেখাতে হয়। ওদেরও হয়েছিল সেই অবস্থা। অনেক সময় এরকম হত কোন বন্ধুর সাথে বেড়াতে গেল কোন হোস্টেলে। খাওয়া দাওয়া, গল্পগুজব হল। তখন ওরা পাব্লিক ট্র্যান্সপোর্টে যাতায়াত করত না। অনেক সময় ভদ্রতার খাতিরে নিজেই ভাড়াটা দিত। আবার এমনও হত, হয়ত এই আসছি বলে বন্ধুরা কোথায় যেন বেরিয়ে গেল ব্যবসার কাজে। বসে থাকতে থাকতে রাত দুপুর। তখন আবার বাধ্য হয়ে ট্যাক্সিতে ঘরে ফেরা। এভাবেই কিছু ধার হল। বন্ধুদের কথায় গেল সিঙ্গাপুর। কাজ ছিল যাওয়া আসা আর ফেরার পথে ওদের কেনা কোন জিনিসপত্র নিয়ে আসা। বিনে পয়সায় দেশটা ঘোরা হত, সাথে কিছু টাকাও দিত। কিছু দিন এ টাকায় চলল। এর পর বন্ধুদের কথায় গেল ইস্তাম্বুল। সারাদিন ছবি তুলে সন্ধ্যায় কিছু কেনাকাটি করে মস্কো ফিরলে বন্ধুদের মাথায় হাত। ঐ সময় একটা কথা চালু ছিল – লাভে ক্ষতি, মানে খুব খারাপ কিছু হলে লাভটা কম হতে পারে। অভিই মনে হয় হাতেগোনা দু’চার জনের একজন যার নাকি সত্যি সত্যি ক্ষতি হয়েছিল। পরে অনেক চিন্তা ভাবনা করে আরও একবার সিঙ্গাপুর যায়। এবং বন্ধুদের সহায়তায় ধার দেনা শোধ করতে পারে। সেই সাথে আরও একটা শিক্ষা পায়। সেটা হল আর যাই হোক এসব ব্যবসা আমার জন্য নয়। এখানে দুটো কথা বলে নেওয়া যাক। আসলে মানুষ যখন তার অভিজ্ঞতার কথা বলে সে সাধারণত দু ভাবে সেটা বলে। আপনাকে কোন কাজে অনুপ্রেরনা দিতে চাইলে সে সাধারণত শুধু ভালো দিকটা বলে, আর অনুৎসাহিত করতে চাইলে বলে এ কাজে কষ্টের কথা। পরে অনেকের সাথে দেখা হয়েছে যারা মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করেছে। যারা ভালো করেছে তারা সবাই সে দেশের সুনাম করে, আইনের কথা বলে, বলে কিছু খারাপ লোক থাকলেও তাকে সবাই ভালবাসত ইত্যাদি। যারা ওখানে গিয়ে সব হারিয়েছে তারা সমস্ত দোষ চাপায় সে দেশের মানুষ, আইন আর পরিস্থিতির উপর। ঐ সময়ে মস্কোয় টাকা পয়সা ইনকাম করা গেলেও সেটা সবার জন্য ছিল না। তার জন্য দরকার ছিল অনেক পরিশ্রম ও রিস্ক নেওয়ার সাহস।     



Comments

Popular posts from this blog

সোভিয়েত থেকে রাশিয়া

কাজান

আগ্রা মথুরা বৃন্দাবন