সুযোগ সম্ভাবনা
(১২)
একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
কর!
আপনিও তো অনেকের মতই বাইরে কোথাও যেতে পারতেন। ইচ্ছে হয়নি অন্য কোথাও গিয়ে কাজ করার?
হয়েছে আবার হয়নি। আসলে জান, অনেক ছোট বেলায়, যখন রাজনীতি বা ভালমন্দ বোঝার মত বুদ্ধি তেমন হয়নি ঠিক তখনই রুশ দেশটিকে আমি ভালবেসে ফেলেছি। ঠিক মনে নেই, খুব সম্ভব যুদ্ধের আগে, বাবা আমাদের একটা গ্লোব কিনে দেন। ওখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের ম্যাপ দেখেই ওর প্রেমে পড়ে যাই। এখনো মনে আছে ম্যাজেন্টা রঙের সেই দেশটা। নিচে হলুদ চীন আর ডান দিকে সবুজ অ্যামেরিকা। যুদ্ধের সময় এ তিন দেশের ভূমিকায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি শ্রদ্ধা আরও বাড়লো। ১৯৭২ সালে ইন্ডিয়া গেলাম, সেখানে কিনলাম এক মানচিত্র। এখানে অ্যামেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়নের রঙ গেছে বদলে। সবুজ রঙে সোভিয়েত দেশকে আরও সুন্দর লাগছিল। এরপর ধীরে ধীরে পরিচিত হলাম রুশদেশের উপকথা, ম্যালাকাইটের ঝাপি, ইস্পাত, আমার ছেলেবেলা, পৃথিবীর পথে ইত্যাদির সাথে। এরপর চেখভ, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়ের হাত ধরে কখন যে মনের ভেতর রুশ দেশের জন্য একটা সফট কর্নার গড়ে উঠলো নিজেই জানিনা। এরপর এলো রাজনীতি। সমাজতন্ত্রের প্রতি আস্থা। এভাবেই চলে এলাম মস্কো। একসময় অবশ্য সোভিয়েত ব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠি, বিশেষ করে এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিস্বাধীনতার অভাব দেখে। বিভিন্ন সময় নিজে এর সাক্ষী ছিলাম, বিশেষ করে রাতের মস্কোয় যখন আরবাত স্ট্রিট থেকে বিটলস বা রকপ্রেমী যুবকদের ধরে নিয়ে যেত পুলিশ। তখন ধীরে ধীরে অ্যামেরিকান ডেমোক্র্যাসির দিকে ঝুকে পড়ি। ছোটবেলায় রাজনীতির প্রতি তেমন আকর্ষণ ছিল না। পড়াশুনাই ছিল একমাত্র ভালো লাগার, ভালবাসার বিষয়। সে সময় ঢাকা আরিচা রোড বাংলাদেশের প্রাণ। ১৯৭৪ এর আগে কালীগঙ্গা সড়ক সেতু হওয়ার আগে পর্যন্ত সবাইকে তরা ঘাটে যাত্রা বিরতি করতে হত। বঙ্গবন্ধু একাধিক বার এখানে অপেক্ষা করেছেন। কত সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে। জিয়াউর রহমান এসেছেন। কখনোই মনে হয়নি তাদের দেখতে যাওয়ার কথা। কিন্তু সোভিয়েত জীবনের এক পর্যায়ে গণতন্ত্রের প্রতি এতটাই আকৃষ্ট হই যে ১৯৮৮ সালে রিগ্যান যখন মস্কো আসেন, লেনিনস্কি প্রস্পেক্টের ধারে দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়েছিলাম। ১৯৯২ সালে তো বিভিন্ন জায়গার দরখাস্ত পর্যন্ত পাঠাই পোস্ট ডকের জন্য। কয়েক জায়গা থেকে পি এইচ ডি’র অফার পাই।
গেলেন না কেন?
জানই তো, আমাদের ফ্যাকাল্টিতে এক সময় বাংলাদেশের অনেক ভালো ভালো ছাত্ররা পড়াশুনা করতেন। সাজু ভাই, মুফিজ ভাই, অমলদা, গনেশদা, জয়নুল ভাই, নজরুল ভাই, শিবুদি। এরা সবাই এসেছিলেন পঁচাত্তরের আগে। এরপর বিশাল গ্যাপ ছিল। যখনকার কথা বলছি, তখন আমাদের ফ্যাকাল্টিতে আমিই ছিলাম সিনিয়র মোস্ট। কাউকে জিজ্ঞেস করার উপায় ছিল না। ভাবলাম, কয়েক মাস পরে থিসিস ডিফেন্ড, সেটা না করে আবার পি এইচ ডি করতে যাওয়ার কোন মানে হয়?
তারপর?
তারপর আর কি? ১৯৯৩ সালে থিসিস শেষ করে ১৯৯৪ সালে দুবনায় চলে গেলাম। মনিকার জন্ম হল। কাজ, সংসার এসবের মধ্যেই ডুবে গেলাম।
ওই সময় না যাওয়ার জন্য আফসোস হয় না?
না। গোর্কির একটা কথা আছে। উনি যখন মস্কোর উদ্দেশ্যে নিজের শহর ত্যাগ করেন, ওনার দাদু বলেন, “সবার কথা শুনবি, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিবি নিজে। যাতে পরে কাউকে দোষ দিতে না হয়।“ আমার জীবনের সব সিদ্ধান্ত ছিল নিজের নেওয়া। তাই আফসোস করার সুযোগ নেই। কাজ করছি। কাজটাকে উপভোগ করছি। এখানে আমার এক কলিগের কথা বলতে পারি। এক জার্মান ভদ্রলোক (আমাদের ওখানে প্রচুর জার্মান কাজ করে) একদিন তাঁকে বলছিলেন “জার্মানিতে কোন সময়ই পাই না। সাত সকালে ট্র্যাফিক ঠেলে কোন মতে ইন্সটিটিউটে পৌঁছুই। সারাদিনের কাজ শেষ যখন বাসায় ফিরি সূর্য অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। খেয়েদেয়ে বেডে যেতে যেতে রাত দুপুর। ব্যক্তিগত জীবন বলতে আর কিছু নেই।“ উত্তরে আমার কলিগ বলেছিলেন, “ আমাদের বেতন তোমাদের দশভাগের একভাগ। কিন্তু সময়ের অভাব নেই। ইচ্ছে হলেই বন থেকে ঘুরে আসতে পারি বা ভল্গার তীরে বেড়াতে যেতে পারি। কাজের এমন স্বাধীনতা চাইলে কিছু তো ত্যাগ করতেই হবে!” আমি ওঁর সাথে একমত। তাছাড়া বিগত এক দশকের বেশি সময়ে অ্যামেরিকা যেভাবে মিসাইল ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে গণতন্ত্রের চাষ করছে দেশে দেশে তাতে আমি গণতন্ত্রের প্রতিও শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছি। এখনো অনেক বন্ধুরা, যারা ওদিকে থাকে, বলে “চলে আয়। আমরা আছি। প্রথম দিকে আমরা যে ধাক্কা খেয়েছি সেটা তোকে পহাতে হবে না। আমরা সেটার সামাল দেব। তাছাড়া তুমিও দ্রুত কিছু একটা পেয়ে যাবে এবং দুবনার চেয়ে অনেক ভালো করবে।“
তাহলে?
তাহলে আর কি? কাজ তো শুধু বেতন, ভালো
অফিস, কম্পিউটার এসব নয়, কাজের, বিশেষ করে সৃজনশীল কাজের জন্য সবার আগে দরকার মেন্টাল
কমফোর্ট, মানসিক স্থিতি। এদিক সেদিক বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দেখেছি, কিন্তু এখানে আমি যতটা কমফোর্ট
ফিল করি, অন্য কোথাও ততটা নয়। মানে দুবনা বা মস্কোয় আমি যতটা অ্যাট হোম ফিল করি অন্য
কোথাও সেটা করি না। হতে পারে অ্যাডাল্ট লাইফ পুরোটাই এখানে কাটল বলে। ২০০০ সালে জার্মানি একটা ভালো সুযোগ এসেছিল, আলসেমি করে আর যাওয়া হয়নি। আসলে কারণ যতটা না আলসেমিতে আর চেয়ে বেশি ওদের কঠিন শৃঙ্খলায়। যখন শুনলাম কখন কে কাজে এল না এল তার উপর গোপনে নজরদারি রাখা হয়,
বুঝলাম এটা আমার নয়। দুবনায় স্বাধীন ভাবে কাজ করতে করতে এমন একটা অভ্যেস দাঁড়িয়ে গেছে যে যেকোনো রুটিন অত্যাচার বলে মনে হয়। গবেষণার জন্য নিয়মানুবর্তিতা যেমন দরকার, তেমনি দরকার স্বাধীনতা, মানে স্বাধীন ভাবে কাজ করার পরিবেশ। আসলে যেকোনো সৃজনশীল কাজের জন্যই এটা প্রয়োজন। রুটিন মাফিক কাজ, যেমন শিক্ষকতায় নিয়মানুবর্তিতা অপরিহার্য, কিন্তু সৃজনশীল কাজে আসল কথা হল অনুপ্রেরণা যেটা ট্রেনের মত ঘড়ির কাঁটা ধরে আসে না। আসলে যারা সৃজনশীল কাজের সাথে জড়িত তাদের কোন টাইম টেবিল নেই, কাজের শুরু বা শেষ নেই। ভাবনাটা সব সময়ই মাথার মধ্যে থাকে আর যেকোনো সময়েই আকস্মিক উপলব্ধি আসতে পারে। তাইতো আমরা দেখি আর্কিমিডিসকে চৌবাচ্চা থেকে ইউরেকা ইউরেকা বলে রাস্তায় দৌড়ুতে আর নিউটনকে আপেল পড়তে দেখে মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব আবিষ্কার করতে। এজন্যেই ভালো, দক্ষ বিশেষজ্ঞ অনেকেই হন, কিন্তু তাদের খুব অল্পই বিজ্ঞানী হন। বিজ্ঞানী এটা পেশা হয়, এটা মিশন বা প্রিজভানিয়ে। তবে আমেরিকান ওয়ে অব থিঙ্কিং সেই স্বাধীনতাটুকু ধীরে ধীরে কেড়ে নিচ্ছে। এখন শুধু রিসার্চ ইনস্টিটিউটেই নয়, ভার্সিটিগুলোতেও পব্লিকেশনের কোয়ালিটির থেকে কোয়ান্টিটির উপর বেশি জোর দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে খুব সম্ভব হিগস বলেছিলেন, অনেক আগে একবার তাঁর নাম নোবেল কমিটিতে আলোচনা হয়েছিল বলে গুজব না উঠলে বর্তমান ওয়ার্ক ফিলসফিতে তাঁর অনেক আগেই চাকরি থেকে বিদায় নিতে হত। শুনেছি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে এমন কি ফলের নির্দিষ্ট আকার ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। যেমন একটা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের শসা সার্টিফিকেট পায়, বাকিগুলো বাতিল ঘোষণা করা হয়। আগে বিভিন্ন জায়গায় প্রোপ্যাগান্ডা ছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়নে সবাইকে যান্ত্রিকভাবে সমান করা হয়। সেটা যে ঠিক ছিল না তা আমরা নিজেরাই দেখেছি। শসার ঘটনা ঠিক হলে বুঝতে হবে একসময়ের বিতর্কিত ও পরিত্যাক্ত পথে বিশ্ব চলছে।

Comments
Post a Comment