ভুবনেশ্বর, কোনার্ক, পূরী
(২৩)
পরের দিন সকালে কল্যাণদা অভিকে প্লেনে উঠিয়ে দিয়ে এল। ভুবনেশ্বর এয়ারপোর্টে নেমে একজনকে দেখল উড়িষ্যার ট্র্যাডিশনাল পোষাকে লাগেজ খুঁজছেন। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তাঁর একটা ছবি নেওয়ার, কিন্তু সাহসে কুলাল না। ভাবল শহরে এমন লোক অনেক, তাই পরে চুপি চুপি তুলে নেবে। কিন্তু সাতদিনের ট্রিপে এমন কারও দেখা ও আর পেল না। ইনস্টিটিউট থেকে গাড়ি এসেছিল, কোন ঝামেলা ছাড়াই ও পৌঁছে গেল গেস্ট হাউজে। মনে পড়ল ১৯৯৭ সালের ভিজিটের কথা। সেবার কোলকাতা থেকে ট্রেনে এসেছিল। প্রফেসর অবিনাশ খারে ওকে বলেছিলেন রেল স্টেশন থেকে ইনস্টিটিউট খুব একটা দূরে নয়, রিক্সা বা অটোরিক্সায় চলে আসতে পারবে। স্টেশন থেকে বেরুনোর সাথে সাথেই একগাদি রিক্সা এগিয়ে এলো। আমাদের একটা ভুল ধারণা আছে যে ইংরেজি জানলে ইন্ডিয়ায় ঘোরাফেরা সহজ। সেটা হয়তো ঠিক, তবে প্রথম যাদের সাথে দেখা হয় এরা রিক্সাওয়ালা, অটোওয়ালা বা ট্যাক্সি ড্রাইভার। এরা ইংরেজি জানে না। তাই সমস্যায় পড়তেই হয়। অভি ভেবেছিল ইনস্টিটিউট অফ ফিজিক্স বললে সবাই চিনবে। দেখা গেল, কেউ চেনে না। ঠিকানা জানতে চাইল। ওর মনে ছিল মার্গ। বলল আনন্দ মার্গ। কেন বলল সেটা বলতে পারবে না। পরে মনে হল, আনন্দ মার্গ যেহেতু নয়, নিশ্চয়ই আনন্দ মঠ। এটা বঙ্কিম চন্দ্রের কৃপায়। আবার মিস ফায়ার। রিক্সাওয়ালা নাছোড়বান্দা। বলল, «বাংলা জানেন?» ব্যাস। ওকে কোথায়, কি জন্য যাচ্ছে বলায় বুঝল গন্তব্য। রিক্সায় যাওয়ার কারণ এই বিকেলে শহরটা একটু দেখা। শেষ পর্যন্ত ও এসে হাজির হল সচিবালয় মার্গে। সে গেল ১৯৯৭ এর কথা। এবার জায়গাটা কমবেশি জানা, তাছাড়া ওদের গাড়ি, তাই ভাবনা ছিল না। গেস্ট হাউসে এসেই খোঁজ করল এক লোকের। গতবার যিনি ওর দেখাশোনা করতেন। নাম মনে ছিল না, তাই পাওয়া গেল না। তার দেখা পেয়েছিল শেষ দিন, চেন্নাইয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে। একটু ফ্রেশ হয়ে অভি ফোন করল প্রতীককে। প্রতীক এই ক্যাম্পাসেই থাকে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর সাইন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ –এ পিএইচডি করছে। এটা আগে ছিল না, ইদানীং হয়েছে। প্রতীক দুবনা এসেছিল একটা কনফারেন্সে। ইন্ডিয়া থেকে কেউ গেলে অভির সাথে সাধারণত যোগাযোগ দেখা করে। বাইরে আমরা আর বাংলাদেশী, ভারতীয় বা পাকিস্তানি থাকি না, সবাই ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের হয়ে যাই। আবার এমনও হয়, ভাষাগত সমস্যা হলে হোটেল বা অফিস (অফিসে সবাই কমবেশি ইংরেজি বলে তাই সমস্যা হয় না) অভিকে ডাকে। প্রতীকের সাথে ওভাবেই আলাপ। সেটা ছিল শনিবার। অভি থাকবে শুক্রবার পর্যন্ত। তাই প্ল্যান ছিল যা দেখার শনি আর রবিবারই দেখে নেবে।
কথা মত প্রতীক চলে এলো। একটা অটো ডেকে ওরা রওনা হল শহর দর্শনে। যাচ্ছে ১৯৯৭ সালে যেসব জায়গায় গেছিল, নতুন করে সেসব দেখতে। প্রথমেই গেল লিঙ্গরাজ মন্দিরে। এটা ভুবনেশ্বরের সবচেয়ে পুরনো শিব মন্দির। একাদশ শতকের শেষ দশকে তৈরি এ মন্দির কলিঙ্গ স্থাপত্যের নিদর্শন। বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বসে অপেক্ষা করছে ভিখিরি আর পুণ্যার্থীর দল। দেখে মনে হয় সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত অংশের প্রতিনিধি। তবে সঠিক বলতে পারব না। ছোটবেলায় মায়ের সাথে যখন এসেছে তাঁকেও দেখেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মন্দিরের দ্বারে বসে থাকতে। সে যাই হোক, এদের বেশভূষা, শারীরিক অবস্থা মনে আশা জাগায় না। অভির এমনিতেই ঠাকুর দেবতার প্রতি ভক্তি নেই, যাওয়া মূলত প্রাচীন স্থাপত্য দেখতে আর ছবি তুলতে, কিন্তু যখন দেখল খালি পায়ে ঢুকতে হবে মন্দিরে, ওর সমস্ত ইচ্ছে কর্পূরের মত উবে গেল। ও ঘুরে ঘুরে একটা জায়গা খুঁজে বের করল যেখানে দাঁড়িয়ে প্রাচীরের ছিদ্র দিয়ে ভেতরের ছবি তোলা যায়। ও সেটাই করল। মানুষের পাশেই বিশাল এক ষাঁড় ঘোরাফেরা করছিল। দেখতে বদমেজাজী মনে হলেও ছিল শান্ত। শিবের মতই আপনভোলা। ওখান থেকে ওরা গেল ধবলগিরি মন্দিরে। এই সেই বিখ্যাত কলিঙ্গ যুদ্ধক্ষেত্র। কথিত আছে এখানে মহাপ্রতাপশালী সম্রাট অশোক তাঁর শেষ যুদ্ধ করেন। কলিঙ্গ বিজয় সম্পন্ন করতে তিনি রাস্তা তৈরি করেন যাতে হস্তী বাহিনী অনায়াসে এখানে আসতে পারে। এ যেন ধ্বংসের আগে সৃষ্টি। পাশ নিয়ে বহমান দয়া নদী নাকি রক্তের বন্যায় ভেসে যায়। এত রক্ত যে সম্রাট অশোকের হৃদয় পর্যন্ত কেঁদে ওঠে। তিনি হিন্দু ধর্ম পরিত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। ভারতবর্ষে শুরু হয় বৌদ্ধ ধর্মের জয়যাত্রা। একসময় বৈদিক ধর্মের বিভিন্ন রীতিনীতির প্রতিবাদে গৌতম বুদ্ধ নতুন শিক্ষা প্রচার শুরু করেন বর্ণাশ্রম থেকে মানুষকে মুক্ত করতে। এখানে যে মোক্ষের কথা বলা হয় সেটা স্বর্গ লাভ নয়, পরম জ্ঞান লাভ। বুদ্ধ নিজে চিরায়ত ভগবানকে অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে তাঁর ভক্তরা তাঁকে ভগবান বুদ্ধে পরিণত করে। আর বৌদ্ধ ধর্মকে গ্রাস করার জন্য বৈদিক ধর্ম মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম ও কৃষ্ণের পাশাপাশি বুদ্ধকেও অবতারের মর্যাদা দেয়। সিমেটিক ধর্মের পয়গম্বর বা নবীর সাথে অবতারের পার্থক্য এই যে পয়গম্বর প্রেরিত পুরুষ, খৃস্টান ধর্মে ঈশ্বর পুত্র, কিন্তু হিন্দু ধর্মের অবতার ভগবান বিষ্ণুর জাগতিক রূপ। গীতার ভাষ্য অনুযায়ী “যখন পৃথিবীতে ধর্ম রসাতলে যায়, তখন দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন আর ধর্ম রক্ষার্থে ভগবান যুগে যুগে জন্মগ্রহন করেন।” প্রচলিত বিশ্বাস মতে কলিকালের শেষ কল্কি অবতারের আবির্ভাব ঘটবে। ধার্মিকের হাতে ধর্মের সে দশা হয়েছে অভির বিশ্বাস কল্কি অবতারের আগমন হওয়া দরকার ধার্মিকদের হাত থেকে ধর্মকে উদ্ধার করার জন্য। এই ধবলগিরি শীর্ষে সাদা পাথরের বৌদ্ধ মন্দির সম্রাট অশোকের সেই শান্তির প্রতি আনুগত্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মন্দির নাকি জাপানের সহায়তায় তৈরি। জন্মভূমি থেকে বিদায় নিলেও বৌদ্ধ ধর্ম চীন, জাপান, মঙ্গোলিয়া, কোরিয়া, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কাম্পুচিয়া, বার্মা, এমন কি রাশিয়ার কিছু কিছু রাজ্যে ব্যাপক ভাবে প্রচলিত। ধবলগিরির চূড়া থেকে দয়া নদীকে মনে হয় একটা রজ্জু বা সাপের মত, যা সবুজ জমির বুক বেয়ে চলে গেছে বহুদূরে। গতবার যখন এসেছিল, অভি দয়া নদীর একটা ছবি তুলেছিল। এবার আসার সময় এর আরও কিছু ছবি নেবে বলে মনে মনে ঠিক করেছিল। ধবলগিরির পাশেই উদয়গিরি। এই পাহাড়ের মূল আকর্ষণ পাদুকা আশ্রম। ধারণা করা হয় এখানেই ভরত রামের পাদুকা সিংহাসনে রেখে চৌদ্দ বছর রাজ্য শাসন করে। এ ছাড়াও সেখানে রয়েছে দুর্গের মত সব দালানকোঠা আর অসংখ্য বানর। বানর পরিবারের কিছু ছবি তুলে ওরা গেল পাশের খণ্ডগিরিতে। সেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে জৈন মন্দির। এসবই ভুবনেশ্বর থেকে একটু দূরে অবস্থিত। সুন্দর শান্ত পরিবেশ। লোকজন আছে, তবে ভিড় নেই। কাজু বাদামের গাছ সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে। খণ্ডগিরির উপরেই নেমে আসে সন্ধ্যার কালো যবনিকা। ওরা রওনা হয় শহরের উদ্দেশ্যে। ইচ্ছে পথে ইস্কনের মন্দির দর্শনে যাবে। গেল বটে তবে মন্দির অনেক আগেই রাতের আঁধারে হারিয়ে গেছে। অতঃপর গেস্ট হাউজে ফেরা। কাল দুলাল যোগ দেবে ওদের সাথে। গন্তব্য কোনার্কের সূর্য মন্দির দেখে চন্দ্রভাগা হয়ে পূরী যাওয়া আর ফেরার পথে পিপলি হয়ে আসা কিছু ব্যাগ আর স্যুভেনির কেনার জন্য।
পর দিন সকালে ওরা রওনা হল পুরীর পথে। দুলালের ইচ্ছে ছিল ট্যাক্সি ভাড়া করা, প্রতীক বলল অটোতে যেতে। যে রাস্তা তাতে সেটাই বেটার অপশন, বিশেষ করে যেখানে সেখানে নেমে ছবি তোলা যাবে। বাংলাদেশে পথের ধারে অনেক গ্রাম, এখানে তেমনটি নয়, যদিও রাশিয়ার মত জনশূন্যও নয়। রাস্তায় মাঝে মধ্যে নেমে ছবি তুলল অভি। গল্পে গল্পে কেটে গেল সময়। কথা হচ্ছিল রাশিয়া নিয়ে, দুবনা নিয়ে। প্রতীক বিভিন্ন কথা জানতে চাইছিল।
স্যার, লেনিনের সেই স্ট্যাচুটা এখনও আছে মস্কো ক্যানেলের শুরুতে?
কেন, থাকবে না কেন?
না, সোভিয়েত আমলে তো ওঁর বিপরীতে দাঁড়ানো স্ট্যালিনের স্ট্যাচুটা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল, তাই মনে হল।
দেখ, লেনিন সম্পর্কে রাশিয়ার মানুষের ধারণা আজ বদলে গেছে, তবুও সেটা এ পর্যায়ে নয় যে স্ট্যাচু ভাংতে হবে। আশির দশকে লেনিন ছিলেন সব সমালোচনার ঊর্ধ্বে। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নে তাঁর সমালোচনা করলে প্রায় যেকোনো লোকের মধ্যেই বর্তমানের তালিবান বা ইসলামিক স্টেটের চেহেরা দেখতে পেতে। আজকাল এ নিয়ে প্রচুর খোলামেলা কথা হয়, টক শো হয়। সোভিয়েত আমলে যেদিকেই তাকাও শুধু লেনিন আর লেনিন। প্রতিটি গ্রামে-গঞ্জে, প্রতিটি রাস্তার মোড়ে। জানি না সোভিয়েত ইউনিয়নে যত লেনিনের স্ট্যাচু ছিল ভারতে তত শিবলিঙ্গ ছিল কি না। আমার রুমমেট ইয়েভগেনি একদিন তো বললই, “যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতাম, লেনিনই হতেন আমার ঈশ্বর।” সেই বুদ্ধ দেবের মত যে লেনিন সারা জীবন ঈশ্বরের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন, অনুসারীরা তাঁকেই ভগবানের আসনে বসিয়েছে। বর্তমানে অনেক গোপন ঐতিহাসিক দলিলপত্র ওপেন করা হয়েছে। সেসব দেখিয়ে মানুষ পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক কথাই বলে। এমনকি যারা লেনিনের বা সমাজতন্ত্রের সমর্থক তাদের অনেকেই লেনিনের ভুলগুলো স্বীকার করে। সেটা তাঁর কিছু জাতীয় পলিসিই হোক আর সবংশে জারকে নিধন করাই হোক। ইংল্যান্ডে রুশ চার্চের ফাদার জন বলেছিলেন “১৯১৭ সালের বিপ্লবে ঈশ্বর গৃহহারা হয়েছিলেন।” সেই সূত্র ধরে বলা যায় ১৯৯১ সালের পরিবর্তনে লেনিন দেবালয় থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। কিন্তু এদেশের মানুষ বেশির ভাগই তাঁকে নিজেদের ঘরে স্থান দেয়নি। কেন? সে অনেক প্রশ্ন। যদিও বিপ্লব পূর্ব রাশিয়ার ইতিহাস অজানা ছিল না, তবে সেটা সোভিয়েত পরিবেশনায় মূলত ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। অনেকটা দেশে যেমন বলা হয় “অনেক দিন আগের কথা। আরবের লোকেরা তখন বর্বর ছিল।” কিন্তু যদি একটু ভাবি দেখব এই সভ্যতা মিশরীয়, ব্যবিলনীয়, সিরিয় সভ্যতার উত্তরাধিকারী। আর জানোই তো এসব এলাকায় সভ্যতার ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। এমন কি যদি অন্যভাবেও দেখ, ইসলাম সেই যুগে যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী নিয়ে আসে সেটা সম্ভব কেবল উন্নত ও সভ্য সমাজে। বর্বর, অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে সেটা সম্ভব নয়। হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম, রুশ আমলে শিক্ষিতের হার খুব কমছিল। সোভিয়েত আমলে শিক্ষার হার বাড়ে আর ইতিহাস তারা শেখে সোভিয়েত প্রোপ্যাগান্ডা থেকে। নতুন রাশিয়ায় মানুষ জানল স্তালিপিনের কথা। জানল সেই সময় রুশ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগলো দেশের অগ্রগতির জন্য বিপ্লব কী অবশ্যম্ভাবী ছিল?
আপনি জাতীয় পলিসি বলে একটা কথা বলেছেন। এর মানে মানে?
সোভিয়েত ইউনিয়নের সংবিধানের মধ্যেই যেকোনো অঙ্গ রাজ্যের বের হওয়ার অধিকার ছিল। অনেকেই মনে করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গনের টাইম বোমা সেখানেই ছিল। যখন ইউক্রাইন রাজ্য গঠন করা হয়, তখন খারকভ, ওদেসাসহ পুরো পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রাইন যা ছিল রাশিয়ায় অংশ, রাশিয়ার তৈরি – সেটা ইউক্রাইনের সাথে যুক্ত করা হয় সেই প্রজাতন্ত্রের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য। একই ঘটনা ঘটে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের ক্ষেত্রে। এসব পরবর্তী কালে অনেক অমীমাংসিত সমস্যার জন্ম দিয়েছে। আজও মানুষ সেই পলিসির নেগেটিভ ফল ভোগ করছে।
নাগরনি কারাবাখ, দনবাস এসব সমস্যার মূল কিন্তু বলতে গেলে লেনিনের হাতেই রোপিত। সব মিলিয়ে বলতে পার লেনিন দেবালয় থেকে মানুষের ঘরে ফিরে এসেছেন, দোষগুন সব নিয়েই। আসলে এখন আর সাধারণ মানুষ তাঁকে নিয়ে কিছুই ভাবে না। দেখ, তুমি তো পদার্থবিদ্যার ছাত্র। যদি কোন এক্সপেরিমেন্ট কর, সেটা যতক্ষণ না ফেল করে ততক্ষণই ভালো, কিন্তু একবার ফেল করলে সেটাকে তো ভালো বলবে না। তুমি কী করবে, ওখানে কী কী ভুল ছিল সেটা বের করার চেষ্টা করবে আর সেই সব ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে এক্সপেরিমেন্ট শুরু করবে। আমাদের সমস্যা আমরা অনেকেই সমাজতন্ত্রের প্রায়োগিক ভুলটা স্বীকার করলেও এর যে তত্ত্বগত ভুল থাকতে পারে সেটা মানতে রাজী নই। এমনকি যখন প্রায়োগিক ভুল স্বীকার করি তার দোষও কিছু মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে পুরনো পথেই চলার চেষ্টা করি। কেউই স্বীকার করতে চাই না যে তাত্ত্বিক ভুলের কারণেই বা বলতে পার ফ্লেক্সিবিলিটির অভাবেই প্রায়োগিক ভুল হয়েছে। আমরা সমাজতন্ত্রকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে বিশ্বাস করি কিন্তু বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মূলনীতি প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা সেটা করি না, কোন রকম সমালোচনা গ্রহণ করি না। এ কারণেই পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে আমরা সামনে চলতে পারছি না। সোভিয়েত ইউনিয়নের মধুর স্মৃতির মধ্যে আটকে আছি ঠিক মাছি যেমন গুড়ের বয়মে আটকে মরে। আচ্ছা ঐ যে ছোট্ট একটা মন্দির মত দেখা যাচ্ছে ওখানে একটু থামতে বল।
ওখানে তো কিছুই নেই। ছোট্ট কোন এক দেবতা!
দেখ, সারা জীবন গরীবদের কথা বললাম, গরীবদের রাজনীতি করলাম। এখন যদি এই অবহেলিত, গরীবের দেবতার কথা না ভাবি, দেখা না করি স্বর্গে বিপ্লবের সাথী পাব কোথায়?
সেটাও তো ভাবার বিষয়। চলুন।
ছোট্ট শিব মন্দির। সামনে শিব-দুর্গার ছবি। পাশে ডোবা। তাতে ফুটে আছে বেগুনি রঙের শাপলা। কয়েকটা ছবি তুলে আবার রওনা হল কোনার্কের পথে।
কথা শেষ হতে না হতেই ওরা চলে এল কোনার্ক। প্রাচীন শহর, বিখ্যাত তার সূর্য মন্দিরের জন্য। কোনার্ক শব্দটাই কোনা মানে কর্নার আর অর্ক মানে সূর্য – দুটো শব্দ থেকে এসেছে। এই মন্দিরটি ১২৫০ সালে পূর্ব গঙ্গা বংশের রাজা নরসিংহের আমলে তৈরি। বৈদিক ধর্ম বিশ্বাসে সূর্যদেব প্রতিদিন সাতটি ঘোড়ায় টানা রথে করে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত ভ্রমণ করে। এই সূর্য মন্দির আসলে সেই রথের আদলে তৈরি। এটা এখানে ওর দ্বিতীয় ভ্রমণ। লোকের ভিড় থাকলেও যাকে বলে মেলার মত ধাক্কাধাক্কি নেই। খোলা মেলা। সবাই ঘুরে ঘুরে দেখছে স্থাপত্য শিল্পের অপূর্ব নিদর্শন। বিশেষ করে দেওয়াল চিত্র। যদিও সময়ের বা বলা ভালো বয়সের চাপে প্রায় নুয়ে পড়ার অবস্থা, দেওয়াল চিত্রগুলো এখনও বিস্ময় জাগায়। চারিদিকে বিশাল বিশাল বট গাছ। কেউ কেউ তাদের ছায়ায় দিব্যি ঘুমুচ্ছে। ১৯৯৭ সালে লোকজন আসত ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলতে, এখন অবশ্য সেসব নেই, সবাই সেলফি তুলতে ব্যস্ত। সেখানেই দুপুরের খাওয়া সেরে ওরা রওনা হল চন্দ্রভাগার পথে।
১৯৯৭ সালের থেকে তেমন কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন?
না, কী তখন, কী এখন – স্থাপত্য শিল্পের এই অপূর্ব নিদর্শন সংরক্ষণে সরকার খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হয় না। যদি সময় মত রিকনস্ট্রাকশন করা না হয়, এসব আর দু এক দশকের মধ্যেই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে। এটা তো এখন আর মন্দির নেই, পূজা অর্চনা হয় না, নামে সূর্য মন্দির হলেও এটা এখন স্রেফ পর্যটক কেন্দ্র। তাই সে দিকে দৃষ্টি রেখেই এটার শুধু রক্ষণাবেক্ষণ নয়, পুনর্নির্মাণের কথা ভাবা দরকার। একটা জাতির সভ্যতার ইতিহাসের জন্যেও এটা দরকার।
কিন্তু দেশের এত সমস্যা, সেখানে এটা কী এমনই জরুরি?
দেখ ছোট বা বড় সমস্যা বলে কিছু নেই। কিছু সমস্যার জরুরি সমাধান দরকার, কিছু সমস্যার সমাধান ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া যায়। আমাদের যখন শরীর খারাপ করে আমরা তো কোন অসুখ তেমন ক্ষতিকর নয় বলে অবজ্ঞা করতে পারি না। কেননা ছোট ছোট সমস্যাই একসময় বড় হয়ে দেখা দেয়। আমরা দেখি কোনটার জরুরি চিকিৎসা দরকার, কোনটার চিকিৎসা দুদিন পরে করলেও হবে। কিন্তু চিকিৎসাটা করতে হবে। এখানেও তাই। দেশও একটা বিরাট শরীর, বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। আগে হোক বা পরে হোক – সব সমস্যারই সামাধান দরকার। সেটা না হলে একদিন দেশটাই থাকবে না।
দেখতে দেখতে আমরা চলে এলাম চন্দ্রভাগায়। এটা সমুদ্র সৈকত। বালু আর বালু। আর সেই বালুতে ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে বঙ্গোপসাগরের যত ক্রোধ। প্রতীক সমুদ্রস্নান করল। দুলাল আর অভি উপরে ঘোরাফেরা করল এদিক সেদিক। রাশিয়ায় এই আবহাওয়ায় এ ধরণের জায়গায় তিল ধারণের জায়গা থাকত না। এখানে কেউ রোদ পোহায় না, সাঁতার কাটে না। বাচ্চাদের কোলাহল নেই। নেই বিভিন্ন খেলাধুলার ব্যবস্থা। লোকজন আসছে মূলত ছবি তুলতে। দিগন্ত বিসৃত সমুদ্র আকুল হয়ে ডাকছে মানুষকে তার বুকে। এখানে অল্প সময় কাটিয়ে আবার পথে নামল ওরা। এবার গন্তব্য পুরী। প্রতীক আগের কথা ধরে প্রশ্ন করল
আপনি কিন্তু বললেন না লেনিনের প্রতি বা মার্ক্সবাদের প্রতি আপনার মনোভাবের কথা।
দেখো সেটা এক কথায় বলা সম্ভব নয়। ভালমন্দ দুটো মিলেই সেই অনুভূতি। মৌলানা আবুল কালাম আজাদের “ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিইডম” বইয়ে একটা ঘটনার উল্লেখ আছে। দেশ বিভাগের আগে কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের এক যৌথ মন্ত্রী সভা গঠন করা হয় কেন্দ্রে মানে দিল্লীতে। নেহরু হন প্রধানমন্ত্রী। মুসলিম লীগ দাবী করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বেঁকে বসেন সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল। তিনি হবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। মৌলানা তাঁকে কনভিন্স করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে লিয়াকত আলী খানকে অর্থ মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দিয়ে সমঝোতায় আসা হয়। তবে আসল ঘটনা এখানে নয়। মৌলানার কথায় “খান সাহেবের অনুমোদন ছাড়া সর্দারজী এমন কি নিজের মন্ত্রনালয়ে এক জন চাপরাশি নিয়োগ করতে পারতেন না।” বুঝতেই পারছ দিনের শেষ সব কিছু নির্ভর করে অর্থনীতির উপরে। আমরা আজও কৌটিল্যের অর্থনীতির কথা বলি। মানুষের সামাজিক ইতিহাস যদি লক্ষ্য কর, দেখবে তার শ্রেনী বিন্যাস অস্ত্রশস্ত্রের ভিত্তিতে হয়নি, হয়েছে উৎপাদন ব্যবস্থা ও সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে তার বন্টনের ভিত্তিতে। মার্ক্স তাঁর তত্ত্ব দিয়েছেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অর্থনীতির ভিত্তিতে। তিনি সেখানে মূলত বন্টনের নতুন তত্ত্ব দিয়েছেন, কিন্তু উৎপাদনের কথা বলেছেন বলে জানা নেই আমার। তবে বাস্তবতা বলে এখনও পর্যন্ত পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা সবচেয়ে এফেক্টিভ আর সমাজতান্ত্রিক বণ্টন ব্যবস্থা মানবিক। বর্তমান রাশিয়ায় যারা সোভিয়েত ইউনিয়ন নিয়ে নস্টালজিয়ায় ভুগেন তাদের একটা বিরাট অংশ যাকে বলে অল্পে সন্তুষ্ট টাইপের মানুষ। এরা উদ্যোগী নয়, অন্তত নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে। আরও একদল আছেন যারা সেই সময়ের নিরাপত্তার কথা মনে করে নস্টালজিয়ায় ভুগেন। কিন্তু বর্তমানে যারা উদ্যোগী, যারা সমস্ত বাধা বিপত্তিকে অতিক্রম করে নতুন জীবনে, নতুন বাস্তবতায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন তারা সেই নস্টালজিয়ায় ভুগেন না। বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে মনে হয় দরকার একটা মাঝামাঝি পথ, মানে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক বণ্টন ব্যবস্থা। ওয়েলফেয়ার স্টেটগুলো সে পথেই যাচ্ছে বলে মনে হয়। অনেকেই বলতে পারেন লেনিন তো নিউ ইকনমিক পলিটিক্স বা নেপ প্রবর্তন করেছিলেন। কিন্তু সমস্যা হল সমাজ একদিনে গড়ে ওঠে না। হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্ক একদিনে ভেঙ্গে ফেলা যায় না। আমার বিশ্বাস আমরা যারা বাইরে থাকি, এমন কি সেই থাকাটা যদি জীবনের সিংহ ভাগ সময়ও হয়, জন্ম সূত্রে পাওয়া কিছু অভ্যেস আমাদের থেকেই যায়। অর্থনীতি এর বাইরে নয়। ডিক্রি জারি করে বাহ্যিক দিকটা ভাঙ্গা যায়, কিন্তু যেটা মানুষের অন্তরে যুগ যুগ ধরে একটু একটু করে বড় হয়েছে সেটা ভাঙ্গা কি এতই সহজ? আরও কঠিন নতুন কিছু প্রতিষ্ঠা করা। স্যোশাল সাইকোলজি সহজে বিলুপ্ত হয় না। এই দেখ, ভারত বা বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করে, দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করে। দেশ, দেশের মানুষ আজও কি সাম্প্রদায়িকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে? আবার একই ভাবে দেখলে, এরা কী দ্বিজাতি তত্ত্ব গিলে খেয়েছে? কোনটাই নয়। এরা স্বাভাবিক সময়ে মিলেমিশে থাকে, একে অন্যের ডাকে এগিয়ে যায় আবার পরিস্থিতির শিকার হয়ে কখনও সাম্প্রদায়িক হয়, কখনও ধর্মনিরপেক্ষ। না না, এটা ভারত বিভাগের জটিলতার সময় এনকোডেড কোন চিপ নয়, এটা তাদের হাজার বছরে পাশাপাশি বাস করে লব্ধ জেনেটিক্যাল কোড। আর যারা অতিমাত্রায় ধর্মান্ধ, মৌলবাদী – সেটা তাদের মধ্যে ঢুকানো হয়েছিল, ঢুকানো হচ্ছে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভ্যাকসিনের মাধ্যমে। যাকগে ফিরে আসি তোমার প্রশ্নে। লেনিন বলেছিলেন জমি হবে কৃষকদের, কলকারখানা শ্রমিকদের। সেটা কী হয়েছিল? জাতীয়করণ করার ফলে মালিকানার পরিবর্তন হয়, কিন্তু কৃষক বা শ্রমিক মালিক হয়নি, মালিক হয়েছে ডি জুর্যো রাষ্ট্র আর ডি ফাক্টো পার্টি। বুঝলে হে, ক্ষমতা ব্যাপারটা বড়ই গোলমেলে, সেটা দেবতাকে পর্যন্ত দানবে পরিণত করতে পারে। হয়তো সে কারণেই এক সময় দেশের সম্পদ ছিল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের, সেটাকে পার্টি করতে চেয়েছিল সবার, আর পরিনামে সেটা হয়েছিল বেওয়ারিশ। মানুষ ছিল অনেকটা মেকানিক্যাল। তখনকার একটা আনেকদোত ছিল এ রকম
এক লোক গর্ত খুঁড়ে জল ঢালছে, কিছুক্ষণ পরে আরেকজন এসে সেটা মাটি দিয়ে ভরে দিচ্ছে। কেন এটা করছে জিজ্ঞেস করলে উত্তর ছিল, «যার গাছ লাগানোর কথা সে অসুস্থ, তাই বলে আমরা তো বসে থাকতে পারি না।» এমন ঘটনা আমার মস্কো জীবনে অনেক দেখেছি। তাই শুধু লেনিন নয় আমরা যখন কোন মানুষের সম্পর্কে কথা বলি, বিশেষ করে তিনি যদি রাজনীতিবিদ হন, তখন আমাদের শুধু তাঁরা কী চেয়েছিলেন সেটা দেখলেই চলবে না, সেই চাওয়া দেশকে, দেশের মানুষকে কী দিল সেটাও দেখতে হবে। আমি বা আমরা, যারা সে দেশে পড়াশুনা করেছি তারা প্রচুর পেয়েছি সে দেশ থেকে। এমন কি তুমি নিজেও পেয়েছ। কীভাবে? লেনিন না জন্মালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন না হলে আমাদের দেশগুলো স্বাধীন হত কি না, সেটা বিরাট প্রশ্ন। শুধু তাই নয়। পুঁজিবাদী বিশ্বে শ্রমিকেরা আজকের মত থাকত কিনা সেটাও প্রশ্ন সাপেক্ষ। আসলে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক দুটো ব্যবস্থার মধ্যে যে প্রতিযোগিতা ছিল সেটা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক এমন কি মানসিক ক্ষেত্রেও বিরাট পরিবর্তন এনেছে। আজ আমরা যে টেকনোলজিক্যাল জগতে বাস করছি সেটাও দু ব্যবস্থার অস্ত্র প্রতিযোগিতার, প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমান করার অদম্য ইচ্ছার ফল। তাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে রাশিয়ার সমাজে লেনিনের প্রভাব নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকলেও মানব জাতির সার্বিক উন্নয়নে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তবে লেনিনকে নিয়ে রুশ সমাজে যে নেগেটিভ মনোভাব আছে সেটা মূলত অর্থনৈতিক ও টেকনোলজির ক্ষেত্রে এ দেশ পশ্চিমা বিশ্বের থেকে পিছিয়ে থাকার কারণে। সাথে সাথে মুক্ত চিন্তা, বাক স্বাধীনতা – এসব ভুললেও চলবে না। সোভিয়েত সমাজ হয়তো গড়পড়তা মানুষের জন্য ভালো ছিল, কিন্তু উদ্যোগী মানুষের জন্য, যারা নিজেদের কর্মক্ষমতা দ্বারা, উদ্যোগ দ্বারা অন্যদের ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছিল আর বার বার তাদের টেনে নামানো হয়েছিল, সে ব্যবস্থা ছিল দুঃস্বপ্নের মত। উদ্যোগী মানুষের দরকার চিন্তার স্বাধীনতা, চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার স্বাধীনতা, চিন্তা প্রকাশের স্বাধীনতা। এসবের খুবই অভাব ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে। এর ফলে শুধু যে এসব মানুষই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তাই নয়, অর্থনৈতিক ভাবে তো বটেই বিভিন্ন ভাবে দেশ আর সমাজও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাই আমার মনে হয় অনেক পজিটিভ থাকার পরেও অক্টোবর বিপ্লব সঠিক পথ নয়, সেই পথকে বা তার ফলে যে সমাজ ব্যবস্থা আমরা পেয়েছিলাম সেটাকে মডেল হিসেবে নেওয়া ঠিক নয়, সেই সমাজের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আর পজিটিভ দিকগুলো পুঁজি করে আমাদের নতুন কোন মডেল খুঁজতে হবে।
পুরীতে আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে গেছে। মন্দিরে যাবে না ওরা, সেটা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে। ঘুরবে বাইরে, ছবি তুলবে। তবে জগন্নাথ দেবের মন্দিরের সামনে সব সময়ই মেলা। বলা হয়ে থাকে যে প্রথম জগন্নাথ মন্দির মহাভারত ও পুরাণে বর্ণিত মালব রাজ ইন্দ্রদ্যুম্নের তৈরি। তিনি ছিলেন ভারত ও সুনন্দার সন্তান। মন্দিরের সামনে যে রাস্তা সেখানেই হয় রথযাত্রা। তিন ভাই বোন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে রথে বসিয়ে এ রাস্তায়ই ঘুরানো হয়। বর্তমানের মন্দির পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয় দশম শতাব্দীতে। গঙ্গা বংশের রাজা অনন্তবর্মণ ছোটগঙ্গা দ্বাদশ শতাব্দীতে এই কাজ সম্পন্ন করেন। যদিও এই মন্দির বিখ্যাত রথযাত্রার জন্য, সারা বছরই এখানে ভক্তদের ভিড় দেখা যায়। আর মন্দিরের সামনের বিশাল রাস্তা সব সময়ই লোকে লোকারণ্য। মানুষ, গরু, গাড়ি, ঘোড়া সবাই আনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে এক এলাহি কাণ্ড। এর মধ্যেই বিভিন্ন দোকান বসেছে। স্যুভেনিরের পাশেই খাবার। তার পরেই ভিখিরি বসে আছে। গরীবের সাম্যবাদ আর কি! এখানে অনেকটা পথ খালি পায়ে যেতে হয়। সেটা এক বিরক্তিকর ব্যাপার। স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর বলেই মনে হয়। তবুও ভিড়ের অন্য একটা শক্তি থাকে, সে মানুষকে টানে, অনেক অপ্রিয় কাজও সে অন্যের দেখাদেখি করে ফেলে। অভিও ব্যতিক্রম নয়। এদিক সেদিক ঘুরে বেশ কিছু ছবি তুলে ওরা গেল সমুদ্র ধারে।
পুরীর সমুদ্র। অভির মনে পড়ে প্রথম সমুদ্র স্নানের কথা। ১৯৬৯ সালে এখানেই প্রথম সমুদ্র স্নান। পান্ডার হাত ধরে। তখনই শুনেছিল, পুরীর সমুদ্রে কোন কিছু ছুঁড়লে সে তা দুইবার ফিরিয়ে দেয় আর তৃতীয় বার চিরকালের মত নিয়ে যায়। এবার আর সমুদ্র স্নানের ব্যাপার ছিল না। ওরা ওখানে আসতে আসতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সূর্যের শেষ রশ্মিগুলো সমুদ্রের বুকে আটকে আছে। আর একটু। তারপরেই সারাদিন রোদে পুড়ে উত্তপ্ত সূর্য সমুদ্রের শীতল জলে ডুব দেবে। স্নান শেষ করে ঘুমিয়ে পড়বে। সামনে নতুন দিন, নতুন কাজ। সূর্য তো আর আলসেমি করে একটু বেশি সময় লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে পারবে না! এবার ঘরে ফেরার পালা!
সারাদিনের ঘোরাফেরায় প্রতীক মনে হয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে শুরু হল দুলালের জেরা।
আমরা না হয় সোভিয়েত ফেরত, কিন্তু প্রতীক তো তা নয়। ওর সাথেও আবার ওদেশ নিয়েই গল্প করছেন। এটা দেখছি আপনার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে।
কে জানে? আসলে আমাদের পরিচয় ওখানেই। তাছাড়া প্রতীক নিজেই এ প্রশ্ন করল। আর অভ্যাসের কথা বলছ? তাই হয়তো। দেখ, যাদের সাথে আমার প্রথম আলাপ ইতালীর ট্রিয়েস্টে ওদের সাথে কিন্তু সেখানকার গল্পই করি। দেশের পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হলে গ্রামের বা মানিকগঞ্জের গল্প করি। যাক, ট্রিয়েস্টের কথা যখন উঠল, একটা গল্প করি। ১৯৯৬ সালে প্রথম সেখানে যাই। পৌঁছলাম গিয়ে শনিবার ভোরে। কিছুই জানি না, টাকাপয়াসা তেমন নেই। ইনস্টিটিউট থেকে সব ব্যয়ভার বহন করবে, তাই টাকা আনার দরকার হয়নি, তাছাড়া তখন টাকাপয়সাও তেমন ছিল না। এখনও যে আছে সেটাও বলা ঠিক হবে না। জানই তো সেসব দিনের কথা। অবশ্য তোমাদের কথা অন্য রকম। গেস্ট হাউজে থাকতে দিয়েছে আর দিয়েছে খাবার কুপন, সোমবার অফিস খুললে টাকাপয়সা দেবে। সাথে কিছু রুটি কালবাসা ছিল মস্কো থেকে আনা। সেটাই খেলাম দুপুরে। মাঝে
এক আধটু বাংলা শব্দ কানে এলো, কিন্তু ঠিক সাহস বা ইচ্ছে হল না তাদের সাথে গিয়ে আলাপ
করতে। সন্ধ্যায় টিভি দেখছি, দেখি দুজনে গল্প
করছে। যেহেতু দেখতে রাশানদের মত নয়, তাই প্রথমে বুঝতে পারিনি। একটু খেয়াল করে বুঝলাম
রুশ ভাষায় কথা বলছে। এগিয়ে গিয়ে আলাপ করলাম। জানলাম ওরা আর্মেনিয়া থেকে। একজন আমি যে
ল্যাবরেটরীতে কাজ করি সেখানেই আছে। গত দুই বছরে কখনও দেখা হয়েছে বলে মনে করতে পারছিলাম না। যাই হোক, আমরা সবাই যেন হাতে চাঁদ পেলাম, বন্ধুত্ব হয়ে গেল। এরপরে ওখানে অনেক বাঙ্গালীদের সাথে দেখা হলেও সেরগেই আর ডেভিড ছিল নিত্য দিনের সঙ্গী। ওখানেই আলাপ হয় শৌর্য আর কৌশিকের সাথে। সে সময় কৌশিক ভুবনেশ্বরেই পিএইচডি করছিল। সে বন্ধুত্ব এখনও অটুট। কে জানে, হয়তো মানুষ হিসেবে আমাদের ফরমেশন হয় ইউনিভার্সিটি লাইফে। তাই ওই সময়টা যে দেশে কাটে, সেই দেশের প্রতি একটা বিশেষ টান থাকে। আবার দেখ, দুবনায় আমাদের মত কাউকে দেখলে আমি এগিয়ে গিয়ে কথা বলি। আসলে মানুষ নিজের মত, মানে যারা দেখতে তোমার মত, তোমার ভাষায় কথা বলে, অথবা একই জায়গার মানে যাদের সাথে কমন স্মৃতি আছে তাদের বিশ্বাস করে। ওই ট্রেস্টেই নাইজেরিয়ার এক ভদ্রলকের সাথে দেখা। কথায় কথায় জানলাম তিনিও মস্কোয় পড়াশুনা করেছেন। কত গল্প আমাদের! আবার দেখ দেশের বাইরে যখন যাও, প্রথমে খোঁজ দেশের মানুষ, এরপর আসে আঞ্চলিকতা। তাই আমি যারা কখনও না কখনও রাশিয়া ছিল, তাদের প্রতি এক ধরণের দুর্বলতা অনুভব করি। এতে ভালো বা মন্দের কিছু নেই যদি না সেটা অন্ধ বিশ্বাসে পরিণত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই বলে হয়তো তার প্রতি আমাদের আবেগটা একটু বেশি। অবশ্য দ্ব্যর্থহীনভাবে
সেটা বলতে পারব না।
কেন?
দেখ আমি যতবারই কোলকাতায় এসেছি আর রাস্তাঘাটে বা কোন দোকানে যখন কেউ জেনেছে আমি বাংলাদেশ থেকে তারা আমাকে আত্মীয়ের মত জড়িয়ে ধরেছে। এরা সবাই পূর্ব বাংলার লোক। এদের অনেকেই ১৯৪৭ এ দেশ ভাগের সময় দেশছাড়া হয়েছে, অনেকে একাত্তরে, অনেকে আবার বর্তমান বাংলাদেশে। নিউ জেনারেশনের মধ্যে আবেগ নেই, বরং আক্রোশ আছে, যেহেতু এত ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে সেই দেশের বিভিন্ন সরকারের উপেক্ষা আর মৌন সম্মতির মধ্য দিয়েই চলছে আজকের ইমিগ্রেশন। কিন্তু সাতচল্লিশ বা একাত্তরে মানুষ এর চেয়ে ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে দেশত্যাগ করলেও মাতৃভূমির প্রতি ভালবাসার প্রদীপ তাদের হৃদয়ে এখনও জ্বলছে। তাই তারা যখন শুনে আমি বাংলাদেশ থেকে তারা জানতে চায় তাদের হারানো দেশের কথা। শুধু তাই কেন, আমার দাদারা, যারা আমার জন্মের আগে বা ঐ সময়ে দেশ ছেড়ে চলে এসেছে, দেখা হলে ওরাও ওদের বন্ধুদের কথা জানতে চায়, জানতে চায় সেই সময়ের রাস্তাঘাট বাড়ি ঘরের কথা। একই ভাবে মস্কোর বন্ধুদের সাথে দেখা হলে তারা জানতে চায় মস্কোর রাস্তাঘাটের কথা। তাই এই আবেগ যে একান্তই আমাদের সেটা বলা ঠিক হবে না। আমরা অন্যদের আবেগের কথা জানি না। আমার বিশ্বাস অন্যান্য দেশে পড়াশুনা করেছে এমন লোকজন যখন একে অন্যের দেখা পায়, তাদের মনও এভাবেই আবেগে ভরে ওঠে। এইতো আমরা পিপলি চলে এসেছি। চল নামা যাক।
পিপলি ছোট্ট এক শহর, শহর কী, গ্রামই বলা চলে। হস্ত শিল্পের জন্য বিখ্যাত, বিশেষ করে আপ্লিক আর্টের জন্য। ১৯৯৭ সালেও এসেছিলাম। এখানে খুব সুন্দর সুন্দর ব্যাগ ও অন্যান্য স্যুভেনীর পাওয়া যায়। বাড়ির জন্য আর কোলকাতায় আত্মীয় স্বজনদের জন্য দরকার ছিল, তাই রাত হওয়ার পরেও এ পথে আসা। তাড়াতাড়ি কেনাকাটা সেরে রওনা হলাম ভুবনেশ্বরের পথে।
দুলাল প্রশ্ন করল
লেনিন সম্পর্কে আপনি আগে এরকম ক্রিটিক্যাল ছিলেন না। মনে আছে, আশির দশকে আপনি তাঁকে
প্রায় দেবতার মত ভাবতেন। অনেক বার দেশ থেকে আসা ডেলিগেটদের নিয়ে লেনিনের দরগায়
মানে মুসলিয়ামে গেছেন। গোর্কি লেনিনস্কি গেছেন। কিন্তু আজকে আপনার কথা শুনে মনে হল
সেসব দিন আর নেই।
তা ঠিক। তার পেছনে অনেক কারণ
আছে। তবে তুমি যেমনটা ভাবছ, তা নয়। অনেক কথা আছে এর ভেতরে। রুশে একটা কথা আছে “বোকার
শত্রু নেই।” যতদিন লেনিন সম্পর্কে জানতাম শুধু সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশিত
বই পত্রে থেকে, সে জানা ছিল এক রকম। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অন্য অনেক সোর্চ থেকে জানার
সুযোগ হয়েছে। জানার সাথে সাথে প্রশ্ন এসেছে। আসলে বলব, ঠিক ক্রিটিক্যাল নয়, এটা অন্ধবিশ্বাস
মুক্ত দৃষ্টি। শোন রাত অনেক, অনেকটা রাস্তা যেতে হবে। চেন্নাইতে অনেক সময় পাব ঘুরে
বেড়ানোর। যদি ওখানে আস এ নিয়ে কথা বলব। এখন রাতের উড়িষ্যা দেখতে দেখতে যাই। এমন তারাভরা
রাত তো খুব একটা দেখি না।
http://bijansaha.ru/album.php?tag=143
http://bijansaha.ru/album.php?tag=137
http://bijansaha.ru/album.php?tag=104

Comments
Post a Comment