পুনা

 (২৫

চেন্নাই থেকে অভি গেল পুনায়। এটা পুনায় ওর দ্বিতীয় সফর। এর আগে এসেছিল ১৯৯৭ সালে জিআর ১৪ যোগ দিতে। সেবার এসেছিল ভুবনেশ্বর থেকে ট্রেনে। সেটাই ছিল কোন বড় কনফারেন্সে যোগ দেওয়া। অনেকের সাথে আগে পরিচয় ছিল তাদের পেপারের মাধ্যমে, সেবার পরিচয় হল মুখোমুখি। মনে পড়ে ট্রেন এসেছিল  বিশখাপত্তম হয়ে। নামটা পরিচিত। ওর বড়দা ওখানে ছিলেন অনেকদিন চাকরি সুত্রে। খুব ভোরে ট্রেন এসে পৌছুলো বিশখাপত্তমে আর বেশ কিছুক্ষণ থাকার পর যখন চলতে শুরু করল, ঝাকুনি খেয়ে অভি টের পেল ওরা উল্টো দিকে যাচ্ছে। এক ধরণের আশংকা মনে জাগলেও উপায় ছিল না। চুপচাপ বসে রইলো। পথে পড়ল বিজয়নগর, হায়দরবাদ, সিকান্দ্রাবাদসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক শহর। ইতিহাস অভির প্রিয় বিষয়। সময় পেলেই ইতিহাসের উপর বিভিন্ন বই পড়ে। ভারতের শহরগুলো তো প্রায় সবই বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। তাই যখন কোন বড় শহর পার হয়ে যায়, অভি যেন হারানো দিনের ইতিহাস ছুঁয়ে ভবিষ্যতের পথে পা বাড়ায়। রাশিয়ায় ট্রেন জার্নি মানের অনেক ঘণ্টা বা অনেক দিনের ব্যাপার। ভারতে ট্রেন জার্নি করলে দেশটির ব্যাপকতা বোঝা যায়। উপমহাদেশ তো এমনি এমনি ছিল না, আয়তনে প্রায় ইউরোপের সমান (সোভিয়েত ইউনিয়ন বাদে) ওই ট্রেনেই অন্য এক কম্পার্টমেন্টে যাচ্ছিল আইওপির এক ছেলে। ট্রেন এসে পুনা পৌঁছুলে এসে রেলওয়ে স্টেশন থেকে অভিকে নিয়ে গেল ইন্টার ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স বা আইউকায়। সেখানেই হবে কনফারেন্স। দুবনা থেকে আরও কয়েকজন অংশ গ্রহণ করেছিলো সেই কনফারেন্সে। পরিচয় হল ভারতের অনেক সিনিয়র ও জুনিয়র কলিগদের সাথে। সেবার মহাত্মা গান্ধীর বাসভবন সহ আরও কিছু কিছু এলাকা ওর দেখা হয়েছিল। একদিন গিয়েছিল সেখানকার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভাইপোর সাথে দেখা করতে। ও দুদিন আগে কোলকাতায় চলে গেছে। তাই আর দেখা হয়নি। তবে অনেক বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের সাথে দেখা হয়েছিল। ওর থাকার ব্যবস্থা ছিল পুনা ইউনিভার্সিটি আর আইউকা যে বিশাল চত্বরে অবস্থিত তার বাইরে, ঠিক গেটের সাথে লাগানো কোন এক ইনস্টিটিউটের গেস্ট হাউজে। ও প্রতিদিন হেঁটে হেঁটে যেত কনফারেন্স হলে। পার্কের ভেতর দিয়ে যেতে মন্দ লাগত না। এবার অবশ্য ওর থাকার ব্যবস্থা আইউকার গেস্ট হাউজে যার নাম আকাশগঙ্গা। আইউকার সব কিছুর নামই অবশ্য হয় আকাশের বাসিন্দাদের নামে, নয়তো পৃথিবীর যে সব বাসিন্দারা আকাশের বাসিন্দাদের নিয়ে গবেষণা করেছেন তাদের নামে। ১৯৯৭ সালে যখন এসেছিল, ওর বন্ধু অঞ্জন বলছিল, গেস্ট হাউজের যে রুমে ও থাকে সেখানে নাকি সাপ ঢুকেছিল। অভি তাই একটু টেনশনে ছিল, তবে সব দেখে বুঝল, এত ঘাবড়ানোর কিছু নেই। গত ১৭ বছরে সাপের সাথে একটা অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে নিশ্চয়ই। একটু ফ্রেশ হয়েই চলে গেল আইউকা চত্বরে যেখানে ছোট্ট এক মাঠে আর্যভট্ট, গ্যালিলিও, নিউটন আর আইনস্টাইন গভীর আলচনায় মগ্ন। পাশেই ক্যান্টিন। সেখানে বেশ কিছু ছেলেমেয়ের সাথে আলাপ হল, ওরা পশ্চিমবঙ্গের, যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে এসেছে থিসিসের কাজ করতে। ওদের গুরু সুবিনয়দা অভির পূর্ব পরিচিত। ফলে ক্যাম্পাসে সময় ভালই কাটবে বলে অভি অনুমান করল। ভারতে প্রতিটি বিজ্ঞান কেন্দ্রেই প্রচুর বাঙ্গালী। একটা জিনিস অভি খেয়াল করল, বাঙ্গালীরা মূলত ফিজিক্স পড়ে আর তামিলরা গণিত। কে জানে বাংলার আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা আর তামিলনাড়ুর শ্রীনিবাস রামানুজন এর নেপথ্যে কলকাঠি ঘুরাচ্ছেন কি না? আগে বিভিন্ন জায়গায় গেলে ও প্রথমেই যে কাজটা করত, সেটা হল স্থনীয় লাইব্রেরিতে গিয়ে কি কি সুযোগ সুবিধা আছে তার খোঁজ নেওয়া। এখন প্রয়োজনীয় প্রায় সবই অনলাইনে পাওয়া যায়, ফলে লাইব্রেরি ওয়ার্কের সেই তাগিদটা নেই, বিশেষ করে অভি যখন সবই ঘরে শুয়ে বসে করতেই ভালবাসে। বাসায় একা থাকার ফলে কোন সমস্যা হয় না। দুবনায় ও অফিসে যায় মূলত কলিগদের সাথে কোন ব্যাপারে আলোচনা করতে আর যেসব জার্নাল বাসা থেকে ফ্রি পাওয়া যায় না সেগুলো ডাউনলোড করতে। তারপর গেল ক্যান্টিনের ব্যবস্থা দেখতে। ইন্ডিয়ার প্রায় সব জায়গায়ই ভেজ আর নন-ভেজের ব্যবস্থা আছে। অভির বাবা আর জ্যাঠাও ছিলেন নিরামিষাশী মানে ভেজ। আলাদা আলাদা পাত্রে সেসব রান্না হত আর আলাদা আলাদা আলমারিতে সেসব থাকত। সে সময় বাড়িতে ফ্রিজ ছিল না, তাহলে হয়তো দুটো আলাদা ফ্রিজ রাখতে হত। রান্না ঘরে মাংসের প্রবেশের অনুমতি ছিল না। সেটা হল বাইরে, সাধারণত কাছারি ঘরে। তাই ভেজ নন-ভেজের কনসেপ্ট অভির অপরিচিত ছিল না। ভুবনেশ্বরে আইওপিতে আগে থেকে বলে রাখলেই হয়। চেন্নাইয়ে আইএমএসে সে ঝামেলা ছিল না, ইউরোপের মত সবই ছিল, যার যেটা দরকার নিয়ে নিত।  উত্তর ভারতে ভেজ যেমন পপুলার, দক্ষিণ ভারতে তেমনি নন-ভেজ। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। কিন্তু আইউকায় ব্যবস্থা একেবারেই ভিন্ন রকম। সপ্তাহে দুদিন নন-ভেজ আইটেম থাকে আর পাঁচ দিন শুধুই ভেজ। তাও আবার আগে থেকে অর্ডার দিতে হয় মাংসের জন্য। অভির ধারণা ছিল এতে ওর অসুবিধা হবে না। মাত্র তো দশ দিনের মামলা। তাছাড়া ও নিজে রেগুলার সব্জি খায়, পছন্দ করে। কিন্তু প্রথম দিনেই বুঝল খাবার ঠিক তেমন নয় যা খেয়ে ও অভ্যস্ত। মাংস না হলে বিপত্তি। তবে সমস্যা মনে হয় মাংসে নয়, চাইলেই পাবে না সেই অপশনের অভাবই ছিল স্নায়বিক চাপের জন্য যথেষ্ট। চাইলেই অবশ্য ক্যাম্পাসের বাইরে গিয়ে খেয়ে আসতে পারত, তবে সে এক বিরাট হ্যাঙ্গামা। তবে একদিন আগে থেকে মাংস অর্ডার দিয়েও পাওয়া গেল না। বলল অভি একা মাংস বুকিং দিয়েছে, তাই ওরা একজনের জন্য রান্না করেনি। এই প্রথম অভি বুঝল ও মাংসের উপর কতটা নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে এই ঝামেলা এড়াতে ও নতুন পরিচিত যাদবপুরের ছাত্রদের বলল মাংস বুকিং করতে। সেসব ও নিজেই নেবে, একাই খাবে। ক্যান্টিনে খোঁজ খবর নিয়ে হাঁটতে গেল সামনের রাস্তা দিয়ে। এখানে মোটর বাইক দুবনায় সাইকেলের মত, মানে প্রচুর লোকজন মোটর বাইকে যাতায়াত করছে, বিশেষ করে ক্যাম্পাস এলাকায়। ছেলেমেয়ে সবাই, তবে রাশিয়ায় বাইকাররা যেমন সু-৫৭ ফাইটারের মত গর্জন করে চারিদিকের মানুষজনকে জানান দিয়ে হারলি-ডেভিডসন নিয়ে সাঁ সাঁ করে চলে যায়, এখানে তেমন নয়, সবাই চলে ভদ্রভাবে। তবে একটা জিনিস অভিকে প্রচণ্ড অবাক করল। ছেলেরা হেলমেট পড়ে বাইক চালালালেও, মেয়েরা সাধারণত সেটা করছে না, তাদের মাথা, মুখ সব ঢাকা শুধু চোখ ছাড়া। দেখতে অনেকটা হিজাবের মত। ব্যাপারটা এমন দাঁড়ালো যে ও প্রোফেসর সাহনীকে জিজ্ঞেসই করে বসল। বরুণ সাহনী মস্কোয় পড়াশুনা করেছেন, উনিও কসমোলজির উপরে কাজ করেন, অভিকে তিনিই আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আইউকায়। উনি ব্যাপারটা খোলসা করে বললেন। পুনায় আসলে প্রচুর ধুলাবালি। তার হাত থেকে চুল আর মুখ রক্ষা করার জন্যই হিজাবরূপী এই আবরণ কাম আভরণ।          

পরের দিন দুলাল যোগাযোগ করল। সেদিন ছিল রবিবার। তাই দেরী না করে দুজন বেরিয়ে পড়ল ঘুরতে। ঘুরল মূলত পাশের পার্কে, ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে। দুলালই চাইছিল, কেননা কোন ঐতিহাসিক স্থানে ঘুরতে গেলে গল্প আর করা হয় না।

সেদিন আপনার কথা শুনে ঠিক বুঝলাম না আপনি লেনিনের পক্ষে না বিপক্ষে। মানে সোভিয়েত আমলে আপনি প্রায় অন্ধভাবে তাঁকে বিশ্বাস করতেন, এখন মাঝেমধ্যে সমালোচনা করলেও তার কাজের পক্ষেও যুক্তি খোঁজেন। একটু খলসা করে বলবেন?

তোমার অবজারভেশন ঠিক তবে সেটা লেনিনকে নিয়ে নয়। আমি সব কিছুর মধ্যে পজিটিভ ও নেগেটিভ দুটোই খুঁজি। আমার বিশ্বাস কেউ না কেউ প্রায় নিখুঁত কাজেও খুঁত খুঁজে পাবে আবার খারাপের মধ্যেও কিছু ভালো পাবে।  এটা নির্ভর করে মানুষের মাইন্ড সেটের উপর। তাই নিরপেক্ষ ভাবে কোন কিছু বিশ্লেষণ করতে হলে  নিজেকেই সেটা করতে হবে। যেহেতু লেনিন সোভিয়েত ব্যবস্থার জন্মদাতা আমরা ধরে নেব পরবর্তীতে যা কিছু হয়েছে সেখানে লেনিনের কিছু দায় দায়িত্ব আছে। না ধরলেও চলে। এটা করা যাতে উদাহরণ দিতে সুবিধা হয়। অন্তত এতে আমরা যেসব উপসংহার টানব, তার খুব একটা হেরফের হবে না। জানই তো আমি দুবনায় থাকি। ধরা হয় এর জন্ম ১৯৫৬ সালে। আসলে এটাও কণ্ডিশনাল। এখানে আগে গ্রাম ছিল। ভল্গা আর দুবনা নদীর সঙ্গম স্থলে অনেক পুরান একটা চার্চ এখনও বিদ্যমান। তার অর্থ এখানে লোকবসতি অনেক আগে থেকেই ছিল। এমন কি দুবনা শহর তৈরির আগে তিরিশের দশকেই এখানে শুরু হয় বিরাট নির্মাণ কাজ। আগে বিশ্বের সব দেশেই বড় বড় জনবসতি গড়ে উঠত নদীর ধারে। নদী ছিল বলতে গেলে যোগাযোগের একমাত্র উপায় যেকোনো বড় জনবসতির জন্য দরকার প্রচুর রসদ, সেটা আসত আশেপাশের গ্রামগঞ্জ থেকে, এমন কি দূর দেশ থেকে। তখন গাড়ি ছিল না, রেলগাড়ি ছিল না। তাই রসদ সবরাহের মূল উপায় ছিল নদী পথ। লোকসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে রসদের চাহিদা বাড়ে, বাড়ে আভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য জলের চাহিদা। সোভিয়েত ইউনিয়নে মস্কো যখন রাজধানীর মর্যাদা ফিরে পায়, এর লোকসংখ্যা  দ্রুত বাড়তে শুরু করে। মস্কো নদীর জল সবার চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়। প্রয়োজন হয় মস্কো নদীকে কোন বড় নদী, যেমন ভল্গা বা আবের সাথে সংযুক্ত করার। বিভিন্ন হিসেবে দেখা যায় ভল্গার সাথে মস্কো নদী সংযুক্ত করাই সব দিক থেকে ভালো অপশন, এক দিকে তাতে মস্কো নদীতে জলের সাপ্লাই থাকবে আর যেহেতু ভল্গা রাশিয়ার প্রধান নদী, তাতে করে নদীবন্দর হিসেবে মস্কোর গুরুত্ব অনেক বাড়বে। এর ফলে প্রায় একাত্তর কিলোমিটার জুড়ে ভল্গার তীরে যে শ খানেক গ্রাম ছিল  তাদের ডুবিয়ে তৈরি করা হ ইভানকভস্কি রিজারভয়ার বা মস্কো সী। যদিও সেসব গ্রামের অধিবাসীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়, যারা যেতে অস্বীকার করে, তাদের বন্দী করা হয়। অনেকে নিজেদের ঘরবাড়ি আঁকড়ে থেকে ডুবে মারা যায়। শুনেছি যখন মস্কো সীতে জলের পরিমাণ কমে যায়, কোন কোন গ্রামের ডুবে যাওয়া গির্জার চূড়া এখনও ভেসে ওঠে।  এখানে থেকেই  তৈরি করা হয় মস্কো কানাল যা প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। বলা হয় এটা করতে মূলত যুদ্ধবন্দী আর ভিন্ন মতাবলম্বীদের কাজে লাগানো হয়। মারা যায় হাজার হাজার মানুষ। যারা কমিউনিস্ট আদর্শ বা সোভিয়েত ব্যবস্থার বিরোধী তারা এটাকে অমানবিক কাজ হিসেবে দেখে। এখন চিন্তা করি ভিন্ন ভাবে। যদি মস্কো শহরের জন্য এই জলের ব্যবস্থা না থাকত কত লোক ক্ষতিগ্রস্থ হত? নিঃসন্দেহে বলতে পারি অনেক অনেক বেশি। তাই রিজারভয়ার তৈরি করতে গিয়ে শ খানেক গ্রাম ধ্বংস করা হলেও সেটার প্রয়োজন ছিল অপরিসীম। যুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনী অনেক চেষ্টা করেছে বোমা ফেলে এখানকার বাধ ভেঙ্গে ফেলতে। করতে দেওয়া হয়নি। কারণ এতে শুধু ভাঁটির জনপদই ক্ষতিগ্রস্থ হত না, মস্কোয় জলের  অভাব প্রকট হত। প্রশ্ন আসতে পারে এত লোককে মৃত্যু মুখে কেন ঠেলে দেওয়া হল কানাল তৈরি করতে? তখন আজকের মত এত সব টেকনি ছিল না, বিশেষ করে বিপ্লব পরবর্তী রাশিয়ায়। কী মিশরের পিরামিড, কী আগ্রার তাজমহল, কী শিল্পে বানিজ্যে এগিয়ে থাকা ইউরোপ আমেরিকা – এসবই কী এরকম লাখ লাখ মানুষের রক্ত, ঘাম আর কান্নার উপর গড়ে ওঠেনি? নাৎসি জার্মানির কলের চাকা কী কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের হতভাগ্য মানুষের জীবন শক্তিতে ঘোরেনি? ব্যাকিংহাম প্যালেস কী লাখ লাখ ক্ষুধার্ত  ভারতবাসীর হাড়ের উপর দাঁড়িয়ে নেই? কত আমেরিকান ইন্ডিয়ান, কত আফ্রিকা থেকে ধরে আনা দাস নিজেদের রক্ত দিয়ে আমেরিকার বিজয় রথ ভাসিয়ে রেখেছে সে খবর ক' জন রাখে, রাখতে চায় বা তা নিয়ে বলতে চায়? ছোটলোকের রক্তের উপর গড়ে তোলা প্রাসাদে বসে নিজেকে ভদ্রলোক ভাবা যায়, হওয়া যায় না। গণতান্ত্রিক ইউরোপ আমেরিকা তৃতীয় বিশ্বের মানুষের জন্য গণতন্ত্র চায় না, তাদের উন্নতি চায় না, চায় গণতন্ত্রের আপিম খাইয়ে তাদের দাস করে রাখতে ঠিক যেমন ধর্ম ব্যবসায়ীরা ধর্মের আপীম খাইয়ে মানুষকে শোষণ করে। আসল কথা হল সমস্ত সভ্যতাই গড়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের কঙ্কালের উপর। হয়তো বা সেটা না হলে আজ মানবসভ্যতা যেখানে এসে পৌঁছেছে সেটা হত না। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি। আগে দুবনা থেকে মস্কো যাওয়ার গাড়ির রাস্তা ছিল দিমিত্রভের উপর দিয়ে।  ১৯৯০ এ দশকের  শেষ দিকে শহরকে বাইপাস করে নতুন রাস্তা তৈরি করা হয়। এক জায়গায় এসে রাস্তা এক বাড়ির সামনে আটকে পড়ে। ব্যাপারটা এরকম নয় যে ওখানে মাত্র একটা বাড়ি ছিল, চাইলেই রাস্তা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেওয়া যেত। ওখানে অনেক বাড়িঘর ছিল। তাদের সবাইকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে ভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। তবে একজন সরকারের দেওয়া সব প্রস্তাব নাকচ করে নিজের ঘরে বসে থাকে। সে তার প্রতিবেশীরা যে শর্তে জায়গা ছেড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করে। আমি মাঝে মধ্যে বাসে করে মস্কো যেতাম। ওখানে এসে কত ঝামেলা যে পোহাতে হত সবাইকে!  এ নিয়ে মামলা চলে অনেক দিন। সোভিয়েত আমলে ঐ লোককে জিজ্ঞেস করত না, এখন করে। কিন্তু ঐ মামলায় রাস্তার কাজ কয়েক বছর স্থগিত থাকে, সেই ক্ষতি কি সেই লোক পূরণ করবে? কথা এখানেই, অনেক সময় বৃহত্তর স্বার্থে অমানবিক হতে হয়। ভাব তো যদি কেউ প্রশ্ন করে দেশ তো ঘুরে ফিরে আবার সেই পাকিস্তানেই পরিণত হচ্ছে। কী লাভ হল তিরিশ লাখ মানুষের জীবন আর দুই লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভ করে? অনেক কিছুই আছে যেটা ওভাবে মাপা যায় না। মন্দ দেখার আগে যেমন ভালো কী হয়েছে সেটা দেখা দরকার একই ভাবে ভালোটা কী কী ক্ষতি বয়ে আনল সেটাও ভাবা দরকার। এটা করা দরকার ভবিষ্যতে অতীতের পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সেটা নিশ্চিত করতে।    

দেখতে দেখতে ওরা চলে এলো পুনা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে। কি একটা রিকনস্ট্রাকশন চলছে সেখানে। তাই খুব বেশি ঘুরাঘুরির স্কোপ নেই। অভির মনে পড়ল ১৯৯৭ সালের কথা। তখন এদিক দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন আইউকা যেত, ছাত্রছাত্রীদের কলরবে মুখর থাকত চত্বরটা। ওখানে কিছু ছবি তুলে ওরা হাঁটতে শুরু করল উল্টো দিকে। আইউকার চন্দ্রশেখর অডিটোরিয়াম পেরিয়ে ওরা চলল স্টেডিয়ামের দিকে। কত লোকজন যে ক্রিকেট খেলছে তার ইয়ত্তা নেই। পুনা জনসংখ্যার দিক থেকে ভারতের অষ্টম বৃহত্তম শহর আর দ্বিতীয় বৃহত্তম আইটি হাব। পুনার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় রাষ্ট্রকুটা বংশের ৯৩৭ সালের এক লিপিতে। ৮৫৮ ৮৬৮ সালের তাম্রলিপি থেকে জানা যায় সে সময় এখানে জনবসতি ছিল। পরবর্তীতে পুনা যথাক্রমে ভোশালে জায়গীর আর মারাঠা সাম্রাজ্যের অংশ হয়। পুনাকে কেন্দ্র করে  মারাঠা মুঘলদের মধ্যে যুদ্ধও হয়। ১৭২০ সালে বালাজি রাও মারাঠা সাম্রাজ্যের পেশোয়া বা প্রধানমন্ত্রী রূপে নিয়োগ পান।  তিনি ১৭২৮ সালে সাস্বাদ থেকে রাজধানী পুনায় স্থানান্তরিত করেন। তখন থেকেই শুরু হয় পুনার অগ্রযাত্রা। ওদের পথে যে অডিটোরিয়াম দেখতে পায় সেটা প্রখ্যাত ভারতীয়-আমেরিকান জ্যোতির্বিদ সুব্রামনিয়াম চন্দ্রশেখরের নামানুসারে। উনি ছিলেন ভারতের প্রথম নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ সি ভি রমনের ভাইপো। ইউনিভার্সিটি শেষ করে ইংল্যান্ড যান স্যার এডিংটনের অধীনে পিএইচডি করতে। দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রায় তিনি ব্ল্যাক হোলের ভর বিষয়ে কিছু মৌলিক ফলাফল লাভ করেন। তবে স্যার এডিংটন সেটা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। পিএইচডি শেষ তিনি দেশে এসে অনেক চেষ্টা করেও কোথাও  চাকরি না পেয়ে আমেরিকা চলে যান এবং নিজেকে অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের একজন অন্যতম প্রধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৮৩ সালে পদার্থবিদ্যায় তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

পুনায় অভির জন্য কোন সেমিনারের ব্যবস্থা ছিল না। ওখানে গেস্টদের জন্য সপ্তাহে  একটা করে সেমিনারের ব্যবস্থা।  সেই সপ্তাহে সেমিনার ছিল সদ্য ইংল্যান্ড ফেরত এক ছেলের আর পরের সপ্তাহে অভি থাকবে না। তবে পুনায় কিছু স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সাথে ওর কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা হয়। ওখানে কমবেশি সবাই কসমোলজি বা অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের উপর কাজ করছেন। ওদের এক্সপেরিমেন্টাল গ্রুপ খুবই শক্তিশালী। পাশেই টাটা ন্যাশনাল সেন্টার ফর রেডিও অ্যাস্ট্রোফিজিক্স। তার সাথেও অনেকে কোলাবরেশন করেন। তাই এদের সাথে আলোচনা অভির কাজের ক্ষেত্রে খুবই ফলপ্রসূ ছিল।    

এই সমস্ত আলোচনার ফাঁকেই অভি একদিন দুলালের সাথে যোগাযোগ করে বেরিয়ে পড়ল পুনা দর্শনে।  আগা খান প্যালেসে অভি আগেই গিয়েছিল। আগা খান প্যালেস তৃতীয় সুলতান মুহাম্মদ শাহ আগা খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। এটা ছিল নিজারি ইসমাইলি মুসলমানদের আধ্যাত্মিক গুরুর এক দাতব্য কর্ম যিনি পুনার  আশেপাশের এলাকার দুর্ভিক্ষে ক্ষতিগ্রস্থ সাধারণ মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ভারত ছাড় আন্দোলনের সময় এই প্যালেসে মহত্মা গান্ধী, তাঁর স্ত্রী কাস্তুরব গান্ধী, সেক্রেটারি মহাদেব দেশাই সরোজিনী নাইডু অন্তরীন ছিলেন। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাদেও আগা খান প্যালেস তার অপূর্ব স্থাপত্যের জন্য ফটোগ্রাফারদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান।   এরপর ওরা গেল শনিভার ভাদা নামে এক জায়গায়। ১৭৩২ সালে তৈরি এই দুর্গ ১৮১৮ সাল পর্যন্ত ছিল মারাঠা সাম্রাজ্যের পেশোয়া বা প্রধানমন্ত্রীর বাসস্থান। বর্তমানে সেটা ঠিক ধ্বংসস্তূপ না হলেও খুব ভালভাবে যে সংরক্ষিত সেটা বলা যাবে না। তবে প্রতিদিন সেখানে প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে। ওরা সেখানে গেছিল বিকেলের দিকে। দেখে মনে হয়েছিল এটা পুনাবাসীর সান্ধ্যকালীন ভ্রমনের এক জনপ্রিয় জায়গা।    

পরে আরেকদিন ওরা গেল পার্বতী। পুনার এই পাহাড় সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭০০ মিটার উঁচু। এই পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত পার্বতী মন্দির। পেশোয়াদের রাজত্বকালে তৈরি এই মন্দির পুনার প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার অন্যতম। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা এই মন্দির থেকে সমস্ত পুনা যেন হাতের মুঠোয় দেখা যায়।  

অভির পরবর্তী গন্তব্য ছিল মুম্বাই। সেখানে টাটা ইনস্টিটিউট ফর ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ বা টিয়াইএফআর- একটা সেমিনার আছে। ওর ওখানে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য সুবোধদার সাথে দেখা করা। তাই অনেক চেষ্টা করে এভাবে প্রোগ্রাম সেট করেছে। সেখান থেকে দিল্লী হয়ে কোলকাতায় ফিরবে। ওর ইন্ডিয়া ট্যুরের ব্যয়ভার বহন করছিল ওর ইনস্টিটিউট আর  আভ্যন্তরীণ ব্যয়ভার বহন করছিল স্থানীয় ইনস্টিটিউটগুলো। শেষ মুহূর্তে ওর যে কলাবরেটর ওকে দিল্লী ইনভাইট করেছিল তার ফাণ্ড নিয়ে একটু সমস্যা হয়। কী করা? অভি লিখল অশোকদাকে এলাহাবাদে একটা ট্রিপের জন্য। অশোকদা মানে প্রোফেসর অশোক সেন। ওনার সাথে অভির আলাপ ২০০৬ সালে ইতালীর ট্রিয়েস্টে। চিঠি পাওয়া মাত্রই উনি আমন্ত্রণ পত্র পাঠালেন। অভি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচল। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে রাশিয়ায় অভি কলিগ বা শিক্ষকদের নাম ধরে ডাকতেই অভ্যস্ত।  দেশে অবশ্য সবাই স্যার বলতে বা শুনতে পছন্দ  করেন। ভারতে ওর বাঙ্গালী কলিগরা দাদা ডাকলে মাইন্ড তো করেনই না বরং তাতে খুশিই হন। ফলে সম্পর্ক অনেক ইমফর্মাল হয়।   

যেহেতু মুম্বাইতে অভি থাকবে মাত্র দুদিন আর তার একদিন থাকবে দাদার সাথে, আরেকদিন সেমিনার, তাই দুলাল আগেই চলে গেছে মুম্বাই নিজে নিজে একটু ঘুরবে বলে। ওদের প্ল্যান আছে, যদি সেমিনারের আগে বা পরে সময় করতে পারে, দুজনে যাবে এলিফান্টায় বেড়াতে। ওরা আশাবাদী  সংক্ষিপ্ত সফর হলেও এলাহাবাদ আর দিল্লীতে ওরা সময় পাবে একত্রে ঘোরার আর সোভিয়েত দেশ নিয়ে নিজেদের আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার।  এরমধ্যে তিনটে শহর ঘুরে স্যুভেনির দিয়ে অভির ব্যাগ ভারী হয়ে গেছিল। শত হলেও বিমানে ওজনের রেস্ট্রিকশন। তাই যাদবপুর ইউনিভার্সিটির সুপ্রিয়র হাতে কিছু জিনিস পাঠিয়ে দিল। ট্রেনে যাবে, তাই ওজনের সমস্যা হবে না। কল্যাণ বা নিজে কোলকাতায় ফিরে সেগুলো কালেক্ট করে নেবে।   




   

Comments

Popular posts from this blog

সোভিয়েত থেকে রাশিয়া

কাজান

আগ্রা মথুরা বৃন্দাবন