মুম্বাই এলিফান্টা
(২৬)
আইউকা অভির প্লেন ফেয়ার বেয়ার করেনি, তাই মুম্বাই যেতে হবে নিজের খরচে। অভি ওর দাদার কাছে জানতে চাইলো কীভাবে গেলে ওদের সুবিধা হবে। ট্রেন বা প্লেন – দুটো অপশনই ছিল। ওরা যেহেতু কাজে ব্যস্ত থাকে তাই ওদের সুবিধা অনুযায়ী অভি প্রোগ্রাম সাজাবে। ওরা পুনায় অভির ঠিকানা জানতে চাইলো। সব জেনে লিখল বাপি, মানে ওর ভাইপো গাড়ি ঠিক করেছে। ঐ গাড়ি রবিবার সকাল ১০ টায় অভিকে তুলে নিয়ে যাবে মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে। অভি খুশিই হল, কেননা সেক্ষেত্রে রাস্তায় নেমে কিছু ছবি তোলা যাবে। কল্যাণদা পুনে আর মুম্বাইয়ের মাঝে একটা জায়গার কথা বলেছিল। অভি সেখানে নেমে কিছু কেনাকাটি করল। পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে অভি চলল মুম্বাইয়ের পথে। যদিও ইচ্ছে হচ্ছিল কোথাও নেমে ছবি তোলার, তবে গাড়ি থামানো যায় সেরকম জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। তাছাড়া অভি হিন্দি না জানায় ড্রাইভারকেও ঠিক বোঝাতে পারছিল না বা ড্রাইভার ইচ্ছে করেই না বোঝার ভান করছিল, কেননা থামা মানেই ওর সময় নষ্ট।
সুবোধদা অভির সবচেয়ে বড় দাদা। জীবনে দুবার মাত্র দেখা হয়েছে। একবার ১৯৬৯ সালে যখন অভি মায়ের সাথে কোলকাতা যায়। তখন ওরা কোলকাতা এসেছিল। পরে অভিরাও ওদের বাসায় যায় বোকারো স্টিল সিটিতে। দাদা তখন সেখানে চাকরি করতেন। এরপর দেখা ১৯৭২ সালে কোলকাতায়। দাদা তখন অসুস্থ, কী একটা অপারেশন হয়েছিল। তাই দেখা তেমন একটা হয়নি। ১৯৭২ থেকে ২০১৪। মাঝখানে কেটে গেছে দীর্ঘ ৪২ বছর। ১৯৮৯ সালে অভি কোলকাতা এলে দাদা ছিলেন দিল্লীতে চাকরি সূত্রে। প্লেনের টিকেট পাঠাতে চেয়েছিলেন, অভি যায়নি। বাবাকে রেখে যেতে ইচ্ছে করেনি। বাবাও প্লেন জার্নির ঝক্কি নিতে চাননি শারীরিক কারণে। ১৯৯৭ সালে অভি যখন পুনা ও মুম্বাই আসে দাদা অফিসের কাজে বাইরে ছিলেন। তাই সেবারও দেখা হয়নি। এবার আসার আগে অভি ঠিক করে রেখেছিল, যে করেই হোক দেখা করবে। তাই মুম্বাইতে সেমিনারের আয়োজন। যদিও দাদা নিজে শিওর ছিলেন না অফিসের কাজে বাইরে যেতে হবে কি না, তবে বলেছিলেন যে বউদি, বাপি আর সোমা থাকবে। অভি যেন অবশ্যই আসে। আর ওঁ নিজে চেষ্টা করবে অফিসের কাজে বাইরে না যেতে।
এটা অভির দ্বিতীয় বার মুম্বাই আসা। ১৯৮৩ সালে ও যদিও মুম্বাই এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করেছিল মস্কো যাওয়ার পথে সেটা ধর্তব্যের মধ্যে নয়। এরপর এসেছিল ১৯৯৭ সালে। পুনা থেকে কোলকাতা ফেরার টিকেট না পেয়ে ও মুম্বাই কোলকাতা টিকেট কিনেছিল। দ্বিতীয় শ্রেনীর টিকেট না পাওয়ায় প্রথম শ্রেনীর টিকেট কাটে, সেটাও ওয়েটিং লিস্টে। তবে ফিরতেই হবে, কেননা পরের দিন সকালে ঢাকার ফ্লাইট। তখন শৌর্যের সাথে কনফারেন্স থেকে একদিন আগেই মুম্বাই চলে আসে। ছিল শৌর্যের বন্ধু অলোকের ওখানে। সেবার ওরা সবাই মিলে গিয়েছিল গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া। ওখান থেকে টিআইএফআর গিয়েছিল, তবে ঢুকতে পারেনি, গেটের ওখান থেকে ফিরে এসেছিল। পরের দিন ওরা ওকে ট্রেনে তুলে দেয়, কোন সীট ছিল না। অনেক অনুরোধ করে প্রথম শ্রেণীর টিকেট নিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর কামড়ায় ওঠে। সেবারও ওখানে খুব সম্ভব যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা যাচ্ছিল। তবে কেউ কোন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি। ছিল অতি সাধারণ এক পরিবার, স্বামী-স্ত্রী। ওরাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। দীর্ঘ জার্নি। তাই ওরা পালা করে দুই সীটে তিন জন ঘুমুতো। তবে যাদবপুরের ছাত্ররা খুব মনোযোগ সহকারে রাশিয়ার গল্প শুনছিল, বিভিন্ন প্রশ্ন করছিল। হাওড়া স্টেশনে নামার পর একজন তো গাড়ি করে বাসায় পৌঁছে দিতে চেয়েছিল। তবে কল্যাণদা চলে আসায় ওর আর সে সাহায্য নিতে হয়নি।
পুনা থেকে মুম্বাই যেতে যেতে অভি কত কথা যে ভাবছিল! দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর পর দাদা ওকে চিনবেন তো? ও নিজেই কি চিনবে? হাজারো প্রশ্ন মনের ভেতর। ড্রাইভার মুম্বাই এসে ঠিক বুঝতে পারছিল না বাসাটা কোথায়। অভি তো সেখানকার কিছুই চেনে না। এ সময় দাদার ফোন এলো। এত সময় পার হরে গেছে, তবুও ওরা নেই দেখে তারা টেনশনে। অভি ড্রাইভারকে ফোনটা দিলে দাদা ওকে সব বুঝিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা এসে পৌঁছুল গন্তব্যে। গাড়ি থেকে নেমেই অভি দেখল ঠিক যেন বাবার মত কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। ওর এতটুকু অসুবিধা হল না চিনতে। অভি যখন মস্কো যায় বাবার বয়স তখন ৭৫, আর এখন, ২০১৪ সালে দাদার বয়স ৭৩। আসলে এর আগে দুবার যখন দেখা হয়েছে, দাদা তিরিশের এদিক সেদিকে, হালকা পাতলা। এখন শরীরে ভারিক্কি ভাব এসেছে। “তোমাকে দেখতে একেবারে বাবার মত লাগছে।” দাদা হাসলেন, বললেন “বয়স তো কম হল না।” আমরা উপর চলে গেলাম। ওখানে একটা ভাড়া বাসায় ওরা সবাই মিলে থাকে। দাদা, বউদি, সোমা আর বাপি ওর বৌ আর দুই মেয়ে নিয়ে। ওঁদের নিজেদের বাসা মুম্বাইয়ের বাইরে। বড় বাসা। সুইমিং পুল সব অন্যান্য ব্যবস্থা আছে। সোমার নিজের বাসাও শহরেই। সোমা আর বাপি দু’ জনেই ইঞ্জিনিয়ার, ওদের বাবার মত। সোমা অবশ্য বিয়ে থা করেনি। তবে অফিস কাছে, এই এলাকায় অনেক দিন আছে, বাচ্চাদের স্কুল পাশে এসব বিবেচনায় ওরা বাসা ভাড়া করে থাকে সবাই মিলে। দাদা আর বাপি প্রায়ই অফিসের কাজে বাইরে থাকে, সেদিক থেকে এটা প্র্যাক্টিক্যাল ডিসিশন। অভি একা থাকতে অভ্যস্ত। তাছাড়া এখন ছেলেমেয়রা আলাদা থাকতেই পছন্দ করে। সেদিক থেকে ওরা উল্টো পথ যাত্রী। দাদা বিভিন্ন প্রশ্ন করলেন। অভিরও অনেক প্রশ্নই ছিল। বিশেষ করে বাবাকে নিয়ে, বাবার কোলকাতা জীবন নিয়ে। তবে খুব বেশি দাদাও জানেন না। অভি এই প্রথম জানল দাদা শেষ বারের মত দেশে যান ১৯৬২ সালে অভির জন্মেরও আগে। বাড়িতে কে কেমন আছে সেটা জিজ্ঞেস
করলেন। অভি দিদিকে ফোন করল। দিদি আর রতন কথা বলল দাদার সাথে। “একবার এসে ঘুরে যাও দেশে।”
“আমাদের আর হবে না রে। তোরা সবাই মিলে চলে আয় কোলকাতায়। আগে থেকে জানাস। তাহলে আমরা
সবাই কোলকাতা চলে আসব।” বউদি অনেকক্ষণ কথা বললেন। দিদির কাছে জিজ্ঞেস করলেন কি পাঠাতে
হবে। এরপর অভিকে বললেন “তুই বন্যার জন্যে এটা নিবি, সেটা নিবি। বাপি আসছে। এখনই কিনে
নিবি।” “বউদি, আমি যাচ্ছি প্লেনে। সেখানে ওজনের ব্যাপার আছে। তুমি এসব করে আমাকে ঝামেলায়
ফেলো না।” অনেক বুঝিয়ে ওরা দুই ভাই বউদিকে নিরস্ত্র করল। এর মধ্যে বাপি অফিস থেকে ফিরে
এসে দাদা বউদি বাদে সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ড্রাইভে। গেল সী বীচে। সেখানে এটা সেটা
খেল। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। সী বীচ লোকে লোকারণ্য। প্রচুর লোক এসেছে ফ্যামিলি নিয়ে। বৌ আর কয়েকজন করে ছেলেমেয়ে। মেয়েরা অধিকাংশই বোরকা
বা হিজাব পড়া। অভি একটু অবাকই হল। মুম্বাই
সম্পর্কে ওর ধারণা ছিল একেবারেই অন্য রকম। আধুনিক, নাচেগানে ভরপুর। এরপর গেল সমুদ্রের
ভেতর দিয়ে নতুন তৈরি রাস্তায় ড্রাইভে। অভির তো সব সময়ই ছবি তুলতে হাত নিশপিশ করে। তবে আলোর অভাবে সেটা হয়ে ওঠেনি। বাসায় ফিরে ঠিক
হল অভি পরের দিন দুপুরে চলে যাবে টিআইএফআরএর গেস্ট হাউজে, যাতে সেমিনারের জন্য রেডি
হতে পারে। সেমিনার পরশু। তার পরের দিন সকালে বাপি গাড়ি ঠিক করে
দেবে এয়ারপোর্টের জন্য। গেস্ট হাউজ থেকে এয়ারপোর্ট কাছে হবে। রাতে সোমাকে বৌদির ঘরে
পাঠিয়ে অভির শোবার ব্যাবস্থা
করা হল
ওর ঘরে। একটু পরে দাদা চলে এলেন। দুই ভাই গল্প করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। পরের দিন ভোরে দাদা চলে গেলেন অফিসে। বললেন «ড্রাইভার তোকে গেস্ট হাউজে পৌঁছে দেবে। ঠিক মত
খাওয়া দাওয়া করে চলে যাস। আমি পরে ফোন করব»। যাওয়ার আগে হাতে একটা ইনভেলাপ ধরিয়ে দিলেন। «এটা কী?» «বাচ্চাদের জন্য কিছু কিনে নিস।» অভি বাড়ির ছোট ছেলে। সারা জীবন অন্যদের আদর পেতেই অভ্যস্ত। পঞ্চাশ পেরিয়েও দাদা দিদিদের কাছে ছোট থাকতে বেশ ভালই লাগে। বউদি অনেক যত্ন করে অভিকে খাওয়ালেন। বাপির বৌ
ওকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এল। মুম্বাই শহর দেখতে দেখতে অভি
চলল টিআইএফআরএর দিকে। গাড়ি ঘোড়া লোকজন। শুধু ভিড় আর ভিড়। এক জায়গায় অভির মনে হল কোন
জনসভা হচ্ছে। রাস্তা প্রায় বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল জনতা। কিসব স্লোগান ভেসে আসছে
সেখান থেকে। «এটা অমিতাভ
বচ্চনের বাড়ি। ঐশ্বরীয়া রায় বাসায় এসেছেন। তাই এত
লোক ভিড়
করেছে তাঁকে দেখতে।» ড্রাইভার
জানাল অভিকে। অভি কী বলবে বুঝতে পারল না। এমনটাও যে হতে পারে সেটা অভির ধারণারও বাইরে ছিল। একটু পরে ড্রাইভার অভিকে আম্বানীর বাড়ি দেখাল। মুম্বাইয়ে মনে হয় ওরা দেবদেবীর মত। শেষ পর্যন্ত ওরা গেস্ট হাউজে এসে পৌঁছুল। সেখানে লাগেজ রেখে ফোন করল
প্রোফেসর নরসিংহকে। কিভাবে তাঁর অফিসে যেতে হবে সেটা জেনে অভি সোজা চলে গেল সেখানে। উনি আগামীকালের সেমিনার সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে
বললেন “আপনার সেমিনার কাল সাড়ে তিনটায়। পরশু ভোরেই তো চলে যাচ্ছেন। সকালে এলিফান্টা থেকে ঘুরে আসেন। গেস্ট হাউজে বললে ওরা গেটওয়ে
অফ ইন্ডিয়া যাওয়ার গাড়ি ডেকে দেবে। সেখান থেকে
চলে যাবেন। যাতায়াতে ঘণ্টা দেড়েক আর ওখানে এক থেকে দেড় ঘন্টা। কোন অসুবিধা হবে না।
একটু দেরী হলে আমরা অপেক্ষা করব।” এরপর উনি ক্যান্টিন দেখিয়ে
দিলেন। ওনাকে ধন্যবাদ দিয়ে অভি ক্যান্টিনে গেল খেতে। তারপর গেল আরব সাগরের ধারে। সূর্যাস্তের
আগে আকাশে মেঘের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। সেই ঢেউয়ে সাঁতার কেটে বাসায় ফিরছে পাখির ঝাঁক। সব
জায়গায়ই সূর্য অস্ত যায় কিন্তু একেক জায়গায় তার একে রকম রূপ। আরবের মরুভূমির তপ্ত বালিতে ভাজা সূর্য কমলা বর্ণ ধারণ করে একসময় সাগর জলে ডুবে গেল।
পরদিন সকালে অভি খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠল। দুলালকে বলাই ছিল এলিফান্টার কথা। কথা হল ও গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ায় অপেক্ষা করবে।
সেখান থেকে ওরা যাবে এলিফান্টায়। প্রথমটায়
মনে হয়েছিল এই ভিড়ে টিকেট পাবে না। কিন্তু একটু পরেই ভিড় উধাও। আপডাউন দুটো টিকেট কেটে
ওরা লঞ্চে উঠে বসলো। সাগর থেকে মুম্বাই নতুন রূপে দেখা দিল। এদিক সেদিক রণতরী। অনেকটা
নৌকা টাইপ এই লঞ্চে সমুদ্র যাত্রা অভির মনে উৎসাহ আর ভয় দুটোরই জন্ম দিল। সাগরে তেমন কিছু নেই শুধু
জল ছাড়া। গল্প করার উত্তম সময়।
মনে আছে লেনিনের সেই বিখ্যাত উক্তি «গতকাল খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যেত,
কিন্তু আগামীকাল খুব দেরী হয়ে যাবে।» আমার কেন যেন মনে হয় গতকাল আর আগামীকালের মধ্যে «আজ» সময়টি বাছতে তিনি ভুল করেছিলেন। দেখ, কী সাফল্য, কী ব্যর্থতা – সব কিছুর পেছনেই অনেক কারণ থাকে। তাই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাফল্যের পেছনেও যেমন অনেক কারণ আছে,
এর ব্যর্থতার পেছনেও তেমনি অনেক কারণ আছে। এর
একটি মনে হয় ওয়ান পার্টি
সিস্টেম। অন্তত আমার তাই মনে হয়। বলতে পার সোভিয়েত ইউনিয়নে কী
একাধিক পার্টি থাকা সম্ভব ছিল?
পূর্ব জার্মানি বা অন্য যেসব সমাজতান্ত্রিক দেশে একাধিক
পার্টি ছিল,
তারাও মুলত কোয়ালিশন করে এক পার্টি গঠন করেছিল, অনেকটা
আমাদের বাকশালের মত। আমি ঠিক সেরকম কিছু বলছি না। যদি সোভিয়েত ইউনিয়নের সংবিধান বা
সোভিয়েত ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে এমন একাধিক দল থাকত আর
তাতে যেমন সরকারি তেমনি বিরোধী দলও থাকত ঘটনা ভিন্ন হতে পারত। গণতান্ত্রিক দেশে অনেক দল থাকে আর সেসব দল
দেশের সংবিধান মেনে চলে। তাহলে কেন সমাজতন্ত্রে সেটা সম্ভব নয়? সোভিয়েত
ইউনিয়নের পতনের মূল কারণ দেশ চালনায় কমিউনিস্ট পার্টির অপারগতা। সেই সময়ে যে গণভোট হয়েছিল তাতে সিংহভাগ মানুষ সোভিয়েত
ব্যবস্থার পক্ষে রায় দিয়েছে। তার মানে এই মানুষ কমিউনিস্ট পার্টির উপর আস্থা হারালেও
সমাজতন্ত্রের প্রতি আস্থা হারায়নি। বলতে পার তখন তো ভোট হত অল্টারনেটিভ অপশন ছাড়া।
কিন্তু এর মধ্যে সমাজে পেরেস্ত্রইকা, গ্লাসনস্ত জনপ্রিয় হয়েছে। যদিও সেই নির্বাচন হয়েছে
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পরে, ১৯৯২ সালে তাতে সবচেয়ে বেশি ভোট পায় ঝিরিনভস্কির এলডিপিআর।
এ সেই ঝিরিনভস্কি, যিনি গরবাচভের বিরুদ্ধে গেকাচেপে বা ক্যু সমর্থন করেছিলেন, সোভিয়েত
ইউনিয়নের অবসান ঘটায় যে বেলভেঝস্কি চুক্তি বা ষড়যন্ত্র তাঁর বিরোধিতা করেছিলেন। ব্যক্তিগত
ভাবে আমি তাঁকে বা তাঁর দলকে সমর্থন করি না। কিন্তু তাঁর এসব রাজনৈতিক পদক্ষেপ ভুললে
চলবে না। সে সেময় যদি সোভিয়েত ব্যবস্থার প্রতি অনুগত কোন শক্তিশালী দল
থাকত তারা কমিউনিস্ট পার্টির পরিবর্তে সরকার গঠন করতে পারত। এতে প্রথমত কমিউনিস্ট পার্টি আমলাতান্ত্রিক পার্টিতে
পরিণত হত
না আর
দেশও ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত না। আমাদের দেশের দিকে খেয়াল কর। অনেকেই বলবে আওয়ামী লীগের কোন বিকল্প নেই। কেন? তারা একাত্তরের চেতনায় বিশ্বাসী শক্তিশালী
কোন বিরোধী দল দেখতে পায় না। গণ
জাগরণ মঞ্চ ঘিরে যে রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল,
তখন সেরকম একটা পার্টি বা
জোট গঠন করা সম্ভব ছিল। আওয়ামী লীগ সেটা হতে দেয়নি। ফল
কি? আওয়ামী
লীগ নিজেই একাত্তরের চেতনা ধারণ করে কিনা সে
প্রশ্ন আজ
মানুষের মুখে মুখে। যেকোন ধরণের মনোপলিই সমাজের জন্যও তো বটেই এমন কি মনোপলিস্টদের জন্যও ক্ষতিকর। এ
প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ে অনেক পুরনো এক আনেকডোত।
কোনটা?
তোমাদের নিয়ে। এক ভদ্রলোক ওষুধের দোকানে এসেছেন মাথা ব্যথার ওষুধ কিনতে। দোকানের কম্পাউন্ডার অন্য এক কাস্টমারকে সার্ভ করছিল। তাই ভদ্রলোক তার আনকোরা সহকারীর কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে চলে গেলেন। ইতিমধ্যে কম্পাউন্ডার ফ্রি হয়ে সহকারীকে জিজ্ঞেস করল কি অসুখ আর কি ওষুধ সে দিয়েছে। উত্তর শুনে বেচারির তো হার্ট ফেল করার অবস্থা। “করেছ কী? এটা খেলে তো সে লোকের লুজ মোশন শুরু হয়ে যাবে?” “তা ঠিক, তবে তার তখন মাথা ব্যথা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় থাকবে না। এর মধ্যে হয়তো তার মাথা ব্যথাও সেরে যাবে।”
কিন্তু এর সাথে রাজনীতির সম্পর্ক কি?
দেখ, আমাদের সব দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ভোট ভাগাভাগির ভয়ে নিজেদের কাছাকাছি আদর্শের দলগুলোকে দাবিয়ে রাখে। ফলে কোন কারণে জনগণ দল বদলাতে চাইলে শুধু দল নয়, বস্তুত সিস্টেম পাল্টাতে বাধ্য হয়। ভারত স্বাধীনতার পর অনেক দিন পর্যন্ত কংগ্রেস ছিল ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী। জরুরি অবস্থার সময় জয়প্রকাশ নারায়নের নেতৃত্বে শক্তিশালী বিরোধী জোট গড়ে ওঠে। বিরোধী হলেও এ জোট ছিল ভারতের সংবিধানের মূল নীতিগুলোর প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু এক সময় সে জোট ভেঙ্গে যায়। সর্ব ভারতীয় পর্যায়ে এ রকম দলের অনুপস্থিতিতে জনগণ বিজেপিকে সমর্থন করে। জনগণ কংগ্রেসের পরিবর্তে ঐ জাতীয় অন্য কোন দল মানে আনালজিনের পরিবর্তে প্যারাসিটামল না পেয়ে ডায়রিয়ার ওষুধ গ্রহণ করেছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতায় যেকোন একটা পরিবর্তন আনা, তারা সেটাই করেছে। এ জন্যেই শাসক দলের সব সময় ভাবা দরকার ক্ষমতার ম্যান্ডেট অনন্তকালের জন্য নয়। তাই সময় থাকতে এমন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা যাতে প্রায় একই আদর্শের বিরোধী দল গড়ে ওঠে। তাহলেই আর ক্ষমতা হারানো এতটা ভয়ানক হবে না। যদিও এক সময় বিভিন্ন দেশে ট্যু পার্টি সিস্টেম
খুব সফল ভাবে কাজ করেছে বর্তমানে মনে হয় সেটাও গুড অপশন নয়। আমাদের ছোটবেলায় ইংল্যান্ডে
লেবার আর কনজারভেটিভ পার্টি পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে, এখন দেখ নতুন নতুন পার্টি তৈরি
হচ্ছে। এর পেছনে অবজেক্টিভ কারণ আছে। আসলে ট্যু পার্টি সিস্টেমে এক সময় দেখা যায় এরা
একই মুদ্রার এ পিঠ ও পিঠ। আলটিমেটলি সবাই বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করে। সেটা আমেরিকায়
ডেমোক্র্যাটিক আর রিপাবলিকান পার্টিই হোক আর আমাদের দেশে আওয়ামী লীগ আর বিএনপিই হোক।
অবাক হলে? কিন্তু আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যে একাত্তরে বঙ্গবন্ধু আর জিয়ার ভূমিকা
নিয়ে মত পার্থক্য ছাড়া আর কি তেমন সমস্যা আছে? তাদের অর্থনৈতিক প্রোগ্রাম কী কমবেশি
এক নয়? দেশের মানুষ তৃতীয় শক্তির খোঁজ পাচ্ছে না। ইউরোপে বিভিন্ন দেশে গ্রীন পার্টি,
এমন কি আলট্রা রাইট দলগুলো জনপ্রিয় হচ্ছে ট্র্যাডিশনাল দলগুলোর প্রতি মানুষ আস্থা হারাচ্ছে
বলে। আমেরিকায় বিগ মানির গেম, তাই হয়তো দুই দলের বাইরে কেউ তেমন মাথা তুলতে পারছে না।
তবে আমার বিশ্বাস সেখানেও আজ প্রচুর মানুষ এই দুই পার্টির অল্টারনেটিভ কোন দল খুঁজছে।
আমেরিকা বা পশ্চিমা বিশ্ব যত বেশি করে বিশ্বের উপর তাদের ক্ষমতার মনোপলি আরোপ করতে
চাইছে তাদের দেশে ততো বেশি করে প্লুরালিজমের চাহিদা বাড়ছে।
এলিফান্টা গুহা ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ। মুম্বাই থেকে ১০ কিলোমিটার পূর্বে এলিফ্যান্ট দ্বীপে অবস্থিত এই গুহাগুলো মূলত হিন্দু দেবতা শিবের মন্দির। তবে সেখানে কিছু বুদ্ধ স্তূপও আছে। স্তূপগুলো খৃস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে তৈরি। এলিফান্টা গুহায় রক কাটা পাথরের স্থাপত্য হিন্দু ও বৌদ্ধ ধারণার সমন্বয়বাদ ও আইকনোগ্রাফির বহিঃপ্রকাশ। এখানে খোদাই করা হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল ত্রিমূর্তি সদাশিব, নটরাজ ও যোগীশ্বর। এই মূর্তিগুলো পঞ্চম থেকে নবম শতকে বিভিন্ন হিন্দু ডাইনাস্টি দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। এসব গুহা দেখতে দেখতে দ্রুত সময় কেটে গেল। অভির তাড়া ছিল ঘরে ফেরার। দুলালও আজই এলাহাবাদ রওনা হবে। ওরা সময় মত মুম্বাই ফিরে এলো। দুলাল অভিকে গেস্ট হাউজে নামিয়ে চলে গেল নিজের ডেরায়। অভি ল্যাপটপ নিয়ে চলল সেনিমারে। সেমিনার শেষ অভি ঘরে ফিরে রেস্ট নিচ্ছে, ভাবছে হাঁটতে যাবে সমুদ্রের ধারে, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলতেই একজন বলল “আপনাকে কেউ একজন ফোন করছে, নীচে চলে আসেন।” অভি তো অবাক। নীচে গিয়ে দেখে দাদার ফোন এসেছে। “আমি সেই কখন থেকে ফোন করছি, কোন সাড়া নেই। সব ঠিক আছে তো?” অভির মনে পড়ল সেমিনারের সময় ফোনটা মিউট করে রেখেছিল। “হ্যাঁ, সব ঠিকঠাক মত হয়েছে। এখন ভাবছি একটু ঘুরতে যাব।” “কোন দরকার নেই। ড্রাইভার ওখানে তোর অপেক্ষা করছে। লাগেজ নিয়ে চলে আয়। আজ আমাদের সাথে কাটা। কাল সকালে এখান থেকে এয়ারপোর্ট যাবি।”
সে রাতে ছিল এক জম্পেশ ডিনার। বউদি খুব ভালো রান্না করেন। আমাদের বউদিদের মধ্যে কয়েকজন আছেন মা ঘরানার মানে মায়েরা যেমন ছেলেমেয়েদের এরা তেমনি দেবর-ননদদেরদের আদর যত্ন করেন। স্বপ্না বউদি তাদের একজন। অবশ্য তাঁর কাজই দুটো, রান্না করা আর ঠাকুর দেবতার পূজা অর্চনা করা। অনেক রাত পর্যন্ত চলল আড্ডা। খুব ভোরে অভি চলে গেল এয়ারপোর্টে। যাওয়ার আগে সবার কাছ থেকে বিদায় নেবার পালা। কে জানে আবার কবে দেখা হবে, হবে কিনা আদৌ। সোমাকে ও এবারই প্রথম দেখে, যদিও অনেক আগে এক সময় চিঠি লিখত। তবে এখন দেখা না হলেও যোগাযোগের মাধ্যম বেড়েছে, ফলে চাইলে অন্তত যোগাযোগটা রাখা যাবে। অভির আরও একটা দায়িত্ব বেড়ে গেল। এক শহর থেকে অন্য শহরে গিয়ে অন্য দাদাদের সাথে এখানেও একটা ফোন করে জানানো ভালো ভাবে পৌঁছেছে। দাদা বেরুনোর সময় বললেন কোলকাতার বাড়িটা বিক্রি করে দেবেন। ওখানে কেউ থাকে না, যায় না। ওরা মুম্বাইতেই অভ্যস্ত, ছেলেমেয়েরা তো এখানেই বড় হয়েছে। তাই কি লাভ ওখানে একটা বাড়ি রেখে। অভির মনে হল, ইস দাদার সাথে বাংলার যোগাযোগটা একেবারেই ছিন্ন হয়ে যাবে। ও নিজে যদিও অনেক আগেই এ এলাকার সাথে সম্পর্ক ঘুচিয়ে বিদেশ বিভূঁইকে আপন করে নিয়েছে সেটা ওর মনেই হল না। মানুষ মনে হয় এমনটাই।
http://bijansaha.ru/albshow.html?tag=133
http://bijansaha.ru/albshow.html?tag=129

Comments
Post a Comment