কোলকাতার দিনগুলো
(২২)
এরপরে অভি মাস দেড়েকের জন্য ইন্ডিয়া যায় বিভিন্ন ইনস্টিটিউটে স্বল্পকালীন ভিজিটে। দুলাল মাঝে ফোন করেছিল। ওর ইন্ডিয়া যাওয়ার কথা শুনে জানতে চায় কখন কোথায় থাকবে। অভি তার সমস্ত সেডিউল ওকে জানায় কোন রকম চিন্তা ভাবনা না করেই। ও জানত দুলাল কয়েকদিন পরেই আমেরিকা যাচ্ছে।
২০১৪ সালের ২ নভেম্বর অভি নেতাজী এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল। আগের দিনটা কেটেছিল খুবই টেনশনে, কেননা দেশে হরতাল ছিল। এই নিয়ে কোলকাতায় ও ষষ্ঠ বার। প্রথমবার এসেছিল মায়ের সাথে ১৯৬৯ সালে, পাঁচ বছর বয়সে। এই সময়ের অনেক কথাই মনে আছে। সবচেয়ে যে ঘটনা বেশি মনে পড়ে সেটা ট্রেন দুর্ঘটনা। ওই ট্রেনে ওদের পুরী যাওয়ার কথা ছিল। হিন্দমোটর থেকে ওরা রওনা হবে। মা, রতন, দাদু, দিদিমা, টুকু আর অভি। পাশের বাড়ির কালী মামার কথা ছিল অভিকে কোলে করে স্টেশনে নিয়ে যাবেন। কি কাজে ব্যস্ত থাকায় আসতে পারেননি। ওর সে কী কান্না। ঠিক হল পরের ট্রেনে যাবে। কালী মামা নিজে ওকে ট্রেনে তুলে দেবেন। মিস করা সেই ট্রেনের কয়েকটা বগি পড়ে গিয়েছিল। অনেক হতাহত হয়েছিল। ওরা যখন ওই ট্রেনের পাশ দিয়ে পুরীর পথে এগিয়ে যায় সমস্ত লাইট অফ করা হয়েছিল। দাদু বলেছিলেন “তোর জেদের কারণে আমরা বড় বাঁচাই বেঁচে গেলাম।” এরপর ১৯৭২ সালে যুদ্ধের পরে আবার যায় মায়ের সাথেই। তখন ওর দাদা নকশাল আন্দোলনে যোগ দিয়ে নিখোঁজ ছিল। মা কোন খবর পেলেই পাগলের মত সেখানে ছুটে যেতেন। সাথে অভিও। ১৯৮০ সালে এসএসসি পরীক্ষার পরে আবার যায় দুই সপ্তাহের জন্য। একদিন মনীষের সাথে হাঁটছে শেয়ালদা স্টেশনের দিকে হঠাৎ লোকজনের মাঝে এক চাঞ্চল্য শুরু হয়ে গেল। খবর নিয়ে জানা গেল সঞ্জয় গান্ধী বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। ভীষণ টেনশন হয়েছিল অভির। মনে পড়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কথা। পরের বার ও কলকাতা আসে ১৯৮৯ সালে। সেবার মাস্টার্স কমপ্লিট করে বাড়ি গিয়েছিল বেড়াতে। মাঝে বাবার সাথে গেল ইন্ডিয়া। সেটাই বাবার সাথে ওর বলতে গেলে একমাত্র ও শেষ ভ্রমণ। শেষ বার আসে ১৯৯৭ সালে। সেবার প্লেনে। অনেক ঝামেলার মধ্যে। আসলে ব্যাপার অনেকটা কাকতালীয়। ঢাকা এয়ারপোর্টে এসে দেখে আগের প্লেনে সীট খালি, অনেকটা মানিকগঞ্জ ট্যু ঢাকা মিনিবাসের মত। বলতে গেলে জোর করেই নিয়ে গেল। কলকাতা নেমে ইমিগ্রেশন পড়ল ঝামেলায়। যেহেতু ও সেবার পুনা যাচ্ছিল একটা কনফারেন্সে, তাই সেটাই উল্লেখ করেছিল ডেসটিনেশন হিসেবে। একের পর এক সবাই বেড়িয়ে যাচ্ছে, অভি দাঁড়িয়েই আছি তো আছেই। ওর কোন তাড়া ছিল না, কেননা দাদারা আসবে এক ঘণ্টা পরে নির্ধারিত ফ্লাইটের সময় অনুযায়ী। একসময় জানাল ওর ভিসা জাল। কী ব্যাপার? পাশের কাউন্টারে যে ছেলে দাঁড়িয়ে তার সিরিয়াল নম্বর ওর আগে, অথচ ভিসা পেয়েছে পরে। অভি জানত না দেশে ভিসা পেতে এত ঝামেলা, তাই মস্কো থেকে ভিসা না নিয়ে ঢাকায় নেবে বলে ঠিক করেছিল। এসে দেখে বিশাল হাঙ্গামা, তাই বন্ধু রকিবকে বলে দালাল দিয়ে ভিসা করিয়ে নেয়। যাহোক, ও বলল, দুটো ভিসা দেখে কোনটা আসল আর কোনটা কোনটা নকল সেটা বের করা সম্ভব নয়। মিনিমাম তিনটে ভিসা দরকার। আর মনে মনে ভাবল মানব জাতির ইতিহাসই তো দুজনের ইতিহাস। যিনি আমাদের বোকার স্বর্গে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি লর্ড আর যিনি জ্ঞান বৃক্ষের ফল দিলেন তিনি লুইসিফার। তবে যারা এসব বিশ্বাস করে তাদের কাছে এ যুক্তি হালে পানি পায় না। ইতিমধ্যে সবাই বেরিয়ে গেছে তাই তৃতীয় জনকে আর পাওয়া গেল না। অভি ইমিগ্রেশন অফিসারদের ওর ইনভাইটেশন, এমন কী ফ্যামিলি অ্যালবাম পর্যন্ত দেখাল। বলল, ও আসলে ভাইদের ওখানে থাকবে। হঠাৎ একজন জিজ্ঞেস করল «আমি যাই» এর রুশ কী। অভি চটপট উত্তর দিল। বলল আগের প্লেনে এসেছে। পরে বাসায় ফোন করে জানা গেল ওর দুই দাদা বেরিয়ে গেছে, সময় আছে ভেবে লেক টাউনে বউদির ওখানে আড্ডা দিচ্ছে। যে লোক ওকে রুশ বলতে বলেছিল সে রুশ জানে কি না জানতে চাইলে বলল, “না, তবে আপনার বলার ভঙ্গি দেখেই বুঝেছি ভাষাটা আপনি জানেন। এটা ছিল সাইকোলজিক্যাল টেস্ট। কি করব বলেন? এখন ইন্ডিয়া হয়ে বাংলাদেশের অনেকেই রাশিয়া যাচ্ছে পরবর্তীতে ইউরোপ যাবে বলে। ফলে আমাদের উপর ওদিক থেকে চাপ আছে।” ১৯৯৭ এর মত এবারও অভি গেল প্লেনে আর ভাবল আবার কোন ঝামেলায় না পড়লেই হয়। যা ভাবা, তাই হল। কল্যাণদা আগের দিন বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়া চলে গেছে ওকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করবে বলে। যাবার আগে ওর আর স্বপনদার ঠিকানা লিখে দিয়ে গেছে। এয়ারপোর্টে নেমে দেখে সেসব কিছুই নেই ওর কাছে। অভি আবারও এক গাদি ইনভাইটেশন দেখাল, কিন্তু কোন কাজ হল না। শেষ পর্যন্ত বলল যেকোনো একটা ঠিকানা লেখেন। স্বপনদার ইন্দ্রলোক হাউজিং এস্টেট মনে করতে পারল না, লিখল ইন্দ্রপুরী। অফিসাররা হহ করে হেসে উথল, তবে ওরা মনে হয় এরই মধ্যে বুঝে গেছে ওকে দাড় করিয়ে রেখে কোন লাভ হবে না, অযথা ওদের মূল্যবান সময় নষ্ট হবে। পরে অবশ্য বাসায় এসে ঠিকানা খুঁজে পেয়েছিল। লাগেজের ভেতরে ছিল। ও বাসায় দিনে দশ বার কলম, পেন্সিল, টেলিফোন ইত্যাদি হারায়। কল্যাণদাও ইতিমধ্যে বুঝে গেছে অভি আসলে একটা গন কেস।
কোলকাতায় ওর ফরমালি দু-তিনটে কাজ ছিল, ইন্ডিয়ান আসসিয়েশন ফর কালটিভেশন অফ সায়েন্স, ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট আর কোলকাতা ইউনিভার্সিটির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে সেমিনার দেয়া আর অসংখ্য আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করা। এবার ও উঠেছিল কল্যাণদার ওখানে নাগের বাজারে, লর্ড ক্লাইভের ভাঙ্গা বাড়ির পাশে। ১৯৯৭ সালে ওর আসার তেমন কোন প্ল্যান ছিল না। কিন্তু হঠাৎ খবর পেল ওর জ্যাঠতুতো দাদা ভাগুদা মানে ভাগবতদা মারা গেছেন। তখনই মনে হল ওদের জেনারেশনের বিদায়ের পালা শুরু হল। তাই দেশে গিয়ে সবার সাথে দেখা করা দরকার। এরপর থেকে দেশে বা ইন্ডিয়া এলে সমস্ত ভাইবোনদের সাথে দেখা করে। কোলকাতায় দেখা করার মধ্যে ছিল স্বপনদা, দীপকদা, জ্যোৎস্না বউদি, অশোক মামা, মনীষ, মিঠু আর শিবাজী। কোলকাতার বাইরে সন্ধ্যাদি, আরতিদি আর চন্দনা। অন্য মামাদের সাথে সময় ফেলে ফেরার পথে দেখা করবে। এর বাইরে দুয়েকটা জায়গা দেখার ইচ্ছে ছিল। এ সবের মধ্যে ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি, বেলুর মঠ, দক্ষিণেশ্বর। ঠাকুর বাড়ি সেবারই অভি প্রথম যাবে। বেলুর মঠ আর দক্ষিণেশ্বরে আগেও গিয়েছে। ওর মনে আছে, কোতরং দাদুর বাড়ি থেকে অনেক সময় হাঁটতে হাঁটতে আসত উত্তরপাড়া সন্ধ্যাদির ওখানে আর সেখান থেকে দক্ষিণেশ্বরে। ভাটার সময় গঙ্গা প্রায় শুকিয়ে যেত, ওই সময়টাতে ওরা আসত। বেলুর মঠের রং বেরঙের গোলাপ ওকে সব সময়ই মুগ্ধ করত। আগে গড়ের মাঠ, প্ল্যানেটরিয়াম, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল, আলিপুর চিড়িয়াখানা, হাওড়া ব্রীজ, ইডেন গার্ডেন রাখতো ওর উইশ লিস্টে, এখন ওগুলো আর মাস্ট আইটেম নয়। তবে চেষ্টা করে কলেজ স্ট্রিট আর কফি হাউজে ঢুঁ মারতে।
ফর্মাল কাজের মাঝেই ও একে একে আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করল, সব জায়গায়ই অল্প সময়ের জন্য। কোথাও লাঞ্চ তো কোথাও ডিনার। কোলকাতার সময় এভাবেই শেষ হয়ে আসছিল। হঠাৎ দুলালের টেলিফোন এলো
অভিদা, আমি কোলকাতায়। দেখা করতে পারি?
অবশ্যই। শোন এক কাজ করা যাক, কাল সকালে কফি হাউজে চলে এস। কলেজ স্ট্রীটে আমার কিছু
বই দেখতে হবে, সেই সাথে কফি হাউজে আড্ডা দেওয়া যাবে। কদিন আগেই তো মান্না দে মারা গেছেন।
ওখানে নিশ্চয়ই ওই গানটা এখন মাঝে মাঝেই বাজে!
কথা রইল।
পরের দিন অভি কল্যাণদার সাথে কফি হাউজে গেল। কোলকাতায় কল্যাণদা ওর গাইড, সব জায়গায় নিয়ে যায়। অভির মনে পড়ল ১৯৮৯ সালের কথা। সেবার ক্লাসমেট রানার সাথে দেখা করেছিল এই কফি হাউজেই। কল্যাণদা ওকে রানার কাছে রেখে নিজের কাজে চলে গিয়েছিল আর সময় মত এসে নিয়ে গিয়েছিল। তখন সেল ফোনের সুযোগ ছিল না, তাই আগে থেকেই কথা বলে নিতে হত। এখন অবশ্য অন্য কথা। দুলালের কাছে অভিকে পৌঁছে দিয়ে কল্যাণদা চলে গেল নিজের কাছে। দুলাল নিজেই বলল
দাদা, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি শহরটা ভালো চিনি। দুজনে সারা দিন ঘুরে অভিদাকে আপনার ঘরে পৌঁছে দেব।
কল্যাণদা আমাদের রেখে চলে গেল।
চলুন, আগে এখানে কিছু খেয়ে নিই। কফি হাউজে এলাম, কফি খাবো না, সে কি হয়! এরমধ্যে আমি ট্যাক্সি বুক করে ফেলি।
না, তার দরকার নেই। এই শহরের সাথে আমার শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িত। চল হেঁটে বেড়াব আর
মাঝে মধ্যে ট্রামে চড়ব।
হঠাৎ ট্রামে?
ছোটবেলায় যখনই আসতাম, আমি থাকতাম বেহালার চৌরাস্তায়। একদিকে ছিল অশোকা সিনেমা হল, অন্য
দিকে আমাদের বাসা। অশোকা সিনেমা হলের পাশেই ছিল মামার বাসা। আমরা প্রায়ই দাদাদের ওখান
থেকে হাঁটতে হাঁটতে মামার বাসায় যেতাম। ১৯৬৯ সালে গেলাম এখানে গোপী গাইন বাঘা বাইন
দেখতে। ভূত দেখে আমার সে কী কান্না। ভাগ্যিস মামার বাসা পাশে ছিল। মামা আমাকে বাসায়
নিয়ে গেলেন। তখন মাঝে মধ্যে ট্রাম দেখে চড়তে ইচ্ছে করত, কিন্তু কখনোই হয়ে ওঠেনি। ছোটবেলার
সেই ইচ্ছেটা এখন পূরণ করতে চাইছি। আর হ্যাঁ, হাঁটবো অনেক। হাঁটতে অসুবিধা নেই তো? দেশের মানুষ তো হয় গাড়ি নয় রিক্সায় করে ঘুরতে অভ্যস্ত। একদিন ভুলেই যাবে তার পা কেন দেওয়া হয়েছিল।
ঠিক আছে। যেটা আপনার খুশি। চলুন তাহলে ট্রাম স্ট্যান্ডে যাই।
তার দরকার হবে না মনে হয়। এটা মনে হয় পৃথিবীর একমাত্র শহর বা রাজ্য যেখানে হাত তুললেই
বাস, ট্রাম থামায়। অন্তত সেটাই দেখছি আগে। চল এক কাজ করি বেলুর মঠে যাই। ওখান থেকে
ফেরীতে দক্ষিণেশ্বর আসব। ওই জায়গাগুলোও আমার ছোটবেলার স্মৃতি জড়িত। সারা দিন তো সামনেই।
আপনি হঠাৎ তীর্থস্থান দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন?
না না, হঠাৎ হবে কেন? এখন তো পৃথিবী ধার্মিকে ভরে গেছে। জাস্ট দেখার ইচ্ছে এখানকার
ধার্মিকেরা কেমন?
মানে?
দেখ, এখন তো সারা বিশ্বই ধর্মীয় উগ্রবাদে ভরা। সেদিক থেকে রামকৃষ্ণ আর বিবেকানন্দ অনেকটা
ধর্ম নিরপেক্ষ এ অর্থে যে সেখানে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবার প্রবেশ অধিকার আছে বলেই
শুনেছি। অসহিষ্ণুতার এই যুগে তারা একটু হলেও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিচ্ছেন। তাই ওই দুটো
জায়গায় যাচ্ছি। তাছাড়া আরও একটা পর্যবেক্ষণ দরকার।
কিসের পর্যবেক্ষণ?
বিভিন্ন
রকমের পর্যবেক্ষণ। আমি এবার যখন দেশে আসি, তার কয়েকদিন আগেই দুর্গা পূজা ছিল। মস্কোয় কেউ কেউ বলেছিল আমি যেন পূজার আগেই দেশে যাই, পূজাটা তাহলে দেখা হবে। কিন্তু আমি ইচ্ছে করেই আসিনি। জানই তো আমি
ফর্মালিটি তেমন পছন্দ করি না। মস্কোয় পূজা দেখতে যাই মূলত বন্ধুদের সাথে দেখা করতে। আবার ইচ্ছে না হলে যাই না। দেশে তো সেটা হবে না। আত্মীয় স্বজনদের অনুরোধের ঢেঁকি গিলে ইচ্ছে অনিচ্ছায় যেতে হবে। ছোট বেলায় সত্যিই ইচ্ছে ছিল, এখন আর নেই। তাই ভাবলাম দেশে গেলে আনন্দের চেয়ে মন খারাপের পরিমাণটা বেশি হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া আমার ছোটবেলায় মানুষ মূলত পূজা করত, পূজার আনন্দই মূল ছিল, নতুন জামাকাপড়ের আনন্দ যে ছিল না তা নয়, তবে সেটা মুখ্য ছিল না। এখন পূজার থেকেও পূজার সাজগোজ, প্রতিমার বা মণ্ডপের ডেকরেশন এসবই মূল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পূজার গুরত্বের ভরকেন্দ্র আগের জায়গায় থাকছে না। তবে পূজার পরে কোলকাতায় এসেই যে পূজার
হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি তা নয়। রাস্তায় রাস্তায় দেখছি জগদ্ধাত্রী পূজা। বাংলাদেশে এর
তেমন প্রচলন নেই। তাই একটু অবাকই হলাম। বিশাল বিশাল প্যান্ড্যাল, একেকটা ছোটোখাটো লাস
ভেগাস। কিছু কিছু মণ্ডপ রাস্তা দখল করে বসে আছে। শহরটা যেন দেবতাদের কাছে জিম্মি। কিছু
কিছু পূজা আছে যেকোনো সময় করা যায়, কিন্তু এই প্রথম একটা পূজা দেখে মনে হল এখানে অসময়েও
অসময়, মানে এক জায়গায় এর বিসর্জন হচ্ছে তো অন্য জায়গায় শুরু। বর্তমানের পুঁজিবাদী বিশ্বে
অনেককে সরিয়ে জগদ্ধাত্রী, বিশ্বকর্মা, গণেশের মত কমার্শিয়াল আর টেকনিক্যাল দেব দেবীরা
সামনে চলে আসছেন। মানে সব জায়গাতেই প্রগতির হাওয়া, ভোগবাদের জয়জয়কার। একই কথা কিন্তু ঈদে। অন্তত সামাজিক মিডিয়া দেখলে মনে হয় ঈদের চেয়েও ঈদের মারকেটিং, জামাকাপড়ের ফ্যাশান, কোরবানির পশুর দাম এসবই প্রথম সারিতে চলে আসছে। ক্রিসমাসেও দেখবে একই ঘটনা। আসলে সবই বদলাচ্ছে। আগে মানুষ পড়াশুনা করত মূলত জ্ঞানের জন্য, জানার জন্য, এখন করে ডিগ্রীর জন্য। এই মেন্টালিটি সমাজের সর্বত্র ক্যান্সারের
মত ছড়িয়ে পড়ছে।
কিন্তু এসব তো পত্রপত্রিকা পড়েই জানা যায়। অথবা গাড়িতে করে ঘুরে। হাঁটার কি কোন বিশেষ উদ্দেশ্য আছে?
ঐ দেখ একটা ছেলে রাস্তার উপর স্নান করছে। দাড়াও
একটা ছবি তুলে নিই। আচ্ছা গাড়িতে গেলে এ দৃশ্য দেখতে পেতে? মানুষকে দেখতে চাইলে তাদের মধ্যে যেতে হবে। গাড়ি তো আমাদের সংস্কৃতি নয়। জানই তো আমি ছবি তুলতে খুব পছন্দ করি। এক সময় শুধুই প্রকৃতির ছবি তুলতাম, কোথাও গেলে অপেক্ষা করতাম কখন সব মানুষজন সরে যায়। এক সময় বুঝলাম গ্রাম, শহর মানুষ ছাড়া মৃত। মানুষের হাতে তৈরি যা কিছু তাতে মানুষ অনুপস্থিত থাকলে সেটা সম্পূর্ণ হয় না। কলকাতা এলাম, তার রাস্তায় ঘুরব না, রাস্তায় মানুষ কীভাবে স্নান করছে, চুল কাটাচ্ছে বা দাঁড়িয়ে চা আর ফুচকা খাচ্ছে, ঐ যে রিক্সাওয়ালা যাত্রীর অপেক্ষায়
দাঁড়িয়ে আছে সেটা ক্যামেরায় না ধরলে আমি রাশিয়ায় বন্ধুদের কোলকাতা দেখাব কীভাবে?
কিন্তু কোলকাতা তো শুধু এসব মানুষেরই বাসভূমি নয়। এখানে তো পস এরিয়াও আছে।
আছে, সেটা তো সবাই তোলে, সবাই দেখায়। কনট্রাস্টটাও তো দেখানো দরকার। ঢাকার তুলনায় কোলকাতার ফুটপাত অনেক পরিষ্কার। ঢাকায় তো চাইলেও হাঁটতে পারবে না। তাছাড়া এখন যেভাবে প্রাসাদসম মন্দির মসজিদ তৈরি হচ্ছে সর্বত্র তাতে কোনটা যে পস এরিয়া, আর কোনটা নয় সেটাই বোঝা কষ্ট। দেখ দেখ ঈশ্বরের কত রিয়াল এস্টেট।
যে দিকেই তাকাও শুধু মন্দির, মসজিদ, গির্জা। তাছাড়া প্রতিদিন কত মানুষ নিজেদের সামর্থ্য
অনুযায়ী ঈশ্বরকে ট্যাক্স
দিচ্ছে প্রণামী হিসেবে সে হিসাব কে রাখে? এর একটা অংশও যদি পরম করুণাময় দুঃস্থ মানুষের
মধ্যে দান করার ব্যবস্থা করতেন সেটাই দেশে দেশে দারিদ্র্য দমনে একটা ব্রেকথ্রো হতে
পারত। এখনও পর্যন্ত যা দেখছি শুধু ধনী দরিদ্রের মধ্যেই দূরত্ব বাড়ছে না, দূরত্ব বাড়ছে
মানুষ আর ঈশ্বরের মধ্যে। ঈশ্বর যেমন বিশাল বিশাল অট্টালিকায় স্থান পাচ্ছেন তেমনিভাবে
কোটি কোটি মানুষ বাড়িঘর হারিয়ে এসব উপাসনালয়ের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষে করে দিন কাটাচ্ছে।
যত বেশি করে সাধারণ মানুষ ঈশ্বরের শরণাপন্ন হচ্ছে আর্থিক ভাবে তিনি তাদের চেয়ে তত বেশি দূরে সরে যাচ্ছেন।
আবার রাজনীতি।
না না, রাজনীতির কি আছে? এটাই বাস্তবতা। দেখ না চারিদিকে তাকিয়ে। যাদের সুযোগ আছে তারা
ঈশ্বরের উপর ভারসা না করে নেতাদের শরণ নেয়। নেতা বল, বস বল - তারা যাদের মনে করে নিজেদের
ভাগ্যবিধাতা, দেবতার মত সেসব মানুষের পূজা করে। আর যাদের নেতা নেই, বস নেই, এ জন্মে
কিছুই পাওয়ার আশা পর্যন্ত নেই তারা ঈশ্বরের শরণ নেই যদি পরলোকে কিছু পাওয়া যায় সেই
দুরাশায়। ধর্ম মানুষের অস্থি মজ্জায় এমনভাবে ঢুকে গেছে যে সে তার জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই
এই ফর্মুলা মেনে চলছে। আমার তো মনে হয় ধর্ম এখন মানুষের ডিএনএ লেবেলে ঢুকে পড়েছে। অবাক
হব না যদি বিজ্ঞানীরা কোন দিন ডিএনএ তে ধর্ম কোষ নামে কোন কিছু খুঁজে পান।
আমরা কিন্তু দক্ষিণেশ্বর এসে গেছি। এখানে আগে যাব, না আগে বেলুর মঠ।
আগে বেলুর মঠ। আমার ছোটবেলায় এই ব্রীজ ছিল না। ভাটার সময় আমরা প্রায় হেঁটে গঙ্গা পার
হতাম। তখন সাইরেন বাজিয়ে জোয়ার ভাটার খবর জানানো হত। অন্তত দাদু তাই বলতেন। এখন কত
রাস্তাঘাট হয়ে গেছে। আমাদের দেশও বদলে গেছে। নতুন রাস্তাঘাট হয়েছে। এতে একদিকে যেমন
দেশের উন্নতি হচ্ছে অন্যদিকে তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলা, হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের
শৈশব, শৈশবের স্মৃতি।
দেখতে
দেখতে ওরা বেলুর মঠ চলে এল। তখন ছিল লাঞ্চ ব্রেক। প্রচুর লোকজন বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
সাধারণ মন্দিরে যেখানে বয়স্ক মানুষের ভিড়, তার বিপরীতে এখানে তরুণ তরুণীদের সংখ্যাই
বেশি। কেউ দাঁড়িয়ে ডাবের জল খাচ্ছে, কেউ বা বাদাম। দেখতে দেখতে এক সময় দরোজা খুলে গেল।
ছবি তুলতে মানা তাই অভি খুব বেশি ইন্টারেস্ট অনুভব করল না এখানে বেশি সময় কাটানোর।
অনেকেই আসে প্রার্থনা করতে, অনেকে ঘুরে বেড়াতে। গঙ্গার ধারে সুন্দর জায়গা, বসে থাকলেও
মনটা ভালো হয়ে যায়। ভারতের আকাশে বিবেকানন্দের আবির্ভাব অনেকটা ধুমকেতুর মত, ধর্ম প্রচার
করলেও মূলত তিনি ছিলেন সমাজ সংস্কারক। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে ওরা গেল গঙ্গার ধারে। ওখানে থেকে লঞ্চে যাবে দক্ষিণেশ্বর।
ওটাই আজকের শেষ স্টেশন। এর আগে অভি কোনদিন গঙ্গায় নৌকা ভ্রমণ করেনি। একদিকে কোলকাতা,
অন্যদিকে হাওড়া। মাঝে মধ্যেই নদীর ধারে কলকারখানা অথবা উপাসনালয়। তেত্রিশ কোটি দেবতার
জন্য স্বর্গ মনে হয় খুব ঘন বসতিপূর্ণ। তাই আজকাল তাঁরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভক্তদের
দেওয়া দেবালয়েই বেশি সময় কাটান। ফোর্বস যদি তার ধনীদের তালিকায় দেবতাদের যোগ করত, সেখানে
দেবতারাই প্রথম কয়েক শ স্থান দখল করত বলে অভির বিশ্বাস। দক্ষিণেশ্বরে এসে দেখে কল্যাণদা
ওদের জন্য অপেক্ষা করছে। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করল। আগের মতই নেই কিছুই। ওর
ছোটবেলায় পাণ্ডাদের অত্যাচার ছিল অন্য রকম, অথবা হতে পারে ওদের দেখে বোঝা যায় এরা বেড়াতে
এসেছে, পূজা দিতে নয়। মন্দিরে ঢুকল না ওরা, হেঁটে বেড়াল বিশাল চত্বরে, গঙ্গার ধারে
হাঁটল। এখানে বিভিন্ন ফুড কর্নার ছিল, সেখানেই তিন জনে খেয়ে নিল। কাল সকালে অভি ফ্লাই
করবে ভুবনেশ্বর। দুলাল চলে গেল হোটেলে, অভি কল্যাণদার বাসায়। পথে স্বপনদার ওখানে নামবে।
নভম্বরের ০৮ থেকে ১৫ এ সাত দিন ওর কাটাবে ভুবনেশ্বরে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সাইন্সে।
http://bijansaha.ru/albshow.html?tag=83

Comments
Post a Comment