এলাহাবাদ
(২৭)
সকালে অভি এসে নামল বারাণসী এয়ারপোর্টে। এর আরেক নাম কাশী। এখানেই অবস্থিত বিখ্যাত বানারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি। সেখানকার অনেকের সাথেই অভির কাজের সূত্রে ভার্চুয়াল পরিচয় আছে। এখান থেকেই দুএকজন পোস্টডক কাজ করেছে অভির সাথে। তবে বারাণসীর কথা মনে হলে অভির মনে পড়ে বিশ্বনাথ মন্দির, বিসমিল্লাহ্ খানের সানাই-এর কথা। মনে পড়ে ছোটবেলার কথা যখন মা, মাসীমা আর মামা-মামীর সাথে এখানে এসেছিল তীর্থ ভ্রমণে। সেবার গন্তব্য ছিল গয়া, বুদ্ধগয়া আর কাশী। এখানেই কোথাও, মনে হয় বুদ্ধগয়ায় অনেকটা তেলের ড্রামের মত ড্রাম দিয়ে তৈরি বাঁধ পেরিয়ে ওরা যায় তুলসীদাসের মন্দিরে যেখানে প্রমাণ সাইজের পুতুল নেচে নেচে রামায়ণ গান করছিল। এই সেতু পেরোনোর সময় অভির মনে হয়েছিল বানর সেনা সহ রামের সমুদ্র পার হওয়ার করা। মনে আছে গয়ায় এক মাঠের কথা যেখানে ঘাস ছিল কার্পেটের মত মলায়েম আর অস্বাভাবিক রকম লম্বা। আর মনে পড়ছে অশোক স্তম্ভের কথা। সেবার ওরা কাশীর রাজবাড়ি গিয়েছিল। দেখেছিল সূর্যঘড়ি আর হাতির দাঁতের তৈরি বিভিন্ন স্যুভেনির। পরে রবীন্দ্রনাথের সামান্য ক্ষতি পড়তে গেলেই ওর মনে পড়ত সেই কাশীর রাজবাড়ির কথা।
এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই দেখে ওর জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে। সেখান থেকে গাড়িতে যাবে এলাহাবাদ। ওর ইচ্ছে ছিল বিশ্বনাথের মন্দিরের দু একটা ছবি তোলার। ড্রাইভারকে বলল, তবে ও ইংরেজি না বোঝার ভান করে কথাটা এড়িয়ে গেল। এলাহাবাদের পথে পড়ল বিভিন্ন গ্রাম ও শহর, ইতিহাস বই বা রামায়ণ, মহাভারত থেকে পরিচিত অনেক নাম। হঠাৎ যেন প্রাচীন কালের ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠল চোখের সামনে। প্রায় ঘণ্টা দুই জার্নির পরে ওরা এসে পৌঁছুল হরিষ চন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা এইচআরআই-এ। এই ইনস্টিটিউটের আগে নাম ছিল ফিজিক্স রিসার্চ ল্যাবরাটরি বা পিআরএল। পরে আমেরিকা প্রবাসী ভারতীয় বৈজ্ঞানিক হরিশ চন্দ্রের নামানুসারে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় এইচআরআই। এটা অবশ্য নদীর এ পাড়ে। মূল শহর নদীর অন্য পাড়ে অবস্থিত।
এলাহাবাদের প্রাচীন নাম প্রয়াগ। এই শহরের উৎপত্তি বৈদিক যুগে। প্রয়াগের সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগবেদে। এছাড়া পালি ভাষায় লেখা বৌদ্ধ পান্ডুলিপিতেও প্রয়াগের উল্লেখ পাওয়া যায়। বেদে উল্লেখ আছে এই জায়গায় ব্রহ্মা তার যজ্ঞ সম্পন্ন করেন। আর্যরা যখন আর্যাবর্তে এসে পৌঁছে তখন প্রয়াগ বা কৌসুম্বি ছিল এলাকার গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এক সময় এর রাজা ছিল কুরু। মহাভারতে উল্লেখ আছে যে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য এখানে লোকজন আসত স্নান করতে। মাহাভারতে উল্লেখ আছে যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পূর্বে অনেকেই এখানে পুণ্যস্নানে এসেছিলেন। বেদ ও মহাভারত বাদেও বিভিন্ন পুরাণে প্রয়াগের উল্লেখ আছে। বিভিন্ন সময়ে এই জনপদ ছিল মৌর্য, গুপ্ত ও কুশান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। এখানে অবস্থিত অশোক স্তম্ভ এক সময় এই জনপদের গুরুত্ব বারাণসী ও হরিদ্বারের চেয়ে কোন অংশেই কম ছিল না সেই সাক্ষ্য বহন করে। ১১৯৩ সালে প্রয়াগ দিল্লীর সুলতানের অধীনে আসে। সম্রাট আকবর এখানে বিশাল দুর্গ তৈরি করেন আর ১৫৭৫ বা ১৫৮৩ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন আল্লাহবাদ যা কিনা ব্রিটিশ উচ্চারণে এলাহাবাদ বলে খ্যাত হয়। বর্তমানে এই শহর প্রয়াগরাজ নামে খ্যাত।
গেস্ট হাউজে জিনিসপত্র রেখে অভি চলে গেল অফিসে। সেখানে ওর করডিনেটর শ্বেতা সব বুঝিয়ে দিল। আগামীকালের সেমিনারের সময় ও স্থান সম্পর্কে বলে দিল। এরপর অভি গেল অশোকদার খোঁজে। উনি অফিসে ছিলেন না। তাই ও ওর জন্যে বরাদ্দ করা অফিসে বসে পরের দিনের লেকচার রেডি করতে বসে গেল। কিছুক্ষণ পরে দরজায় টোকা। অশোকদা নিজেই এসে হাজির।
কি খবর কেমন আছ?
খুব ভালো অশোকদা। অনেক ধন্যবাদ ট্রিপটা আরেঞ্জ করার জন্য।
ঠিক আছে। তুমি কি আরও কয়েকটা দিন থাকবে?
না অশোকদা। আমি পরশু সকালেই দিল্লী চলে যাব। ওখানে একটু ঘুরতে চাই।
ঠিক আছে। তাহলে যেটুকু সময় পাও এদিকটাও ঘুরে দেখ। আর তিনটের সময় আমার একটা লেকচার আছে,
চলে এসো। আগামী কাল যারা তোমার সেমিনারে থাকবে ওদের সাথে আলাপ করিয়ে দেব।
ঠিক আছে।
অশোকদা চলে গেলেন। অশোকদা মানে অশোক সেন। ভীষণ অমায়িক মানুষ। পদার্থবিদ্যার বিশেষ করে
স্ট্রিং থিওরির অন্যতম প্রধান বিশেষজ্ঞ হওয়ার পরের চলনে বলে কী সাধারণ। আসলে অভি যখন
ছোটবেলায় পদার্থবিদ্যায় পড়বে বলে ঠিক করে তখন ওর কল্পনায় বিজ্ঞানীরা ঠিক এমনটাই ছিলেন।
লেকচারটা রেডি করে অভি গেল গেস্ট হাউজে। ওখানেই খাওয়ার ব্যবস্থা। পথে কে যেন ডাকল
অভি!
অভিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজেই বলল
চিনতে পারছ না? ওই তো কোলকাতায়
তোমার সেমিনারে ছিলাম। ক’দিন থাকবে?
কাল সেমিনার। পরশু সকালে দিল্লী যাচ্ছি।
তাই বল। তাহলে কাল সেমিনারের আগেই ত্রিবেণী সঙ্গম আর আনন্দ ভবন মানে মতিলাল নেহরুর
বাড়িটা অন্তত দেখে যেও। আমি গেস্ট হাউজে বলে দেব। ওরা তোমাকে গাড়ি ডেকে দেবে।
গেস্ট হাউজে খাওয়া দাওয়া শেষে অভি গেল মেইন বিল্ডিঙে। একটা সাঁকো পেরিয়ে সেখানে যেতে হয়। অনেকটা গ্রামের সাঁকোর মত তবে আধুনিক, ঝুলন্ত। ওখান থেকে শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছিল। আর ও যখন বেরোয় গেস্ট হাউজের সামনেই ঘুরছিল এক সাদা ময়ূর। অনেকটা তপোবন তপোবন ভাব। এখানেও বাইরে চায়ের ব্যবস্থা। চেন্নাই, পুনা আবার এখানেও ও দেখল সবাই একসাথে বসে চা খাচ্ছে একটা নির্দিষ্ট সময়ে আর তখন যে যার মত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছে। বেশির ভাগই পদার্থবিদ্যা বা গণিত নিয়ে। এটা অভির মনে ধরল। বন্ধুত্বপূর্ণ আর ইমফর্মাল পরিবেশে খুব কঠিন আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মত বিনিময় করা। দেশে টি স্টলে বসে লোকজন যেমন রাজনীতি নিয়ে আড্ডা দেয় ঠিক সে রকম, তবে এখানে আড্ডার বিষয়টা কথা বলার জন্য বলা নয়, গবেষণা। অভি মনে মনে ভাবল দুবনা ফিরে সেখানে এটা বলবে। এরপর অশোকদার লেকচার শুনে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে ও গেল দুলালকে আনতে। দুলাল অপেক্ষা করবে ইন্সটিটিউট ক্যাম্পাসের গেটে। জায়গাটা বেশ দূরে। সেখানে এমনিতে ঢুকে দেয় না। প্রায় সব জায়গায় একই ব্যবস্থা। দুলাল ইতিমধ্যে চলে এসেছিল। দুজন মিলে আজ ক্যাম্পাসের ভেতরেই ঘুরে বেড়াবে বলে ঠিক করল।
প্রয়াগ বা এলাহাবাদের হরিষ চন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা এইচআরআই গঙ্গার তীরে অবস্থিত। ইনস্টিটিউট থেকে একটু হাঁটলেই গঙ্গা। সেখানে অনেকেই ঘুরতে যায় সূর্যাস্ত দেখতে। এই জায়গাটির নাম কালিদাস পয়েন্ট। কেন সেটা অভি জানে না, তবে ওর মনে হয়েছে হয়তো মহাকবি কালিদাস এখানে বসেই তাঁর মেঘদূত বা রঘু বংশ বা কুমারসম্ভব রচনা করেছিলেন। না করলেও ভাবতে তো ক্ষতি নেই। দুলাল আর অভি তাকিয়ে ছিল গঙ্গার দিকে। ওখানে ছোট ছোট নৌকা ভাসছে, মাঝে মাঝে উড়ে যাচ্ছে পাখির ঝাঁক। সাঁঝ নামছে গঙ্গার উপর। ঘরে ফেরার সময়। নীচে সারি সারি কিসব যেন শোয়ানো। পাশেই এক ছেলেকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল এসব মানুষের শব। অনেকেই মৃত দেহ চিতায় দাহন না করে গঙ্গার তীরে রেখে যায়। অভি অবাক হল শুনে। ওর ধারণা ছিল হিন্দুদের শব চিতার আগুনে পোড়ান হয়। পরে শুনেছে অনেককেই এভাবে নদীর ঘাটে রেখে যাওয়া হয়, অনেককে আবার সমাধি দেওয়া হয় জোড়াসন করে বসিয়ে।
আজ লেনিনকে নিয়ে কিছু বলবেন না? - সূর্য ডুবে গেলে প্রশ্ন করল দুলাল।
মনে পড়ছে সুকান্তের কবিতা “লেনিন ভেঙ্গেছে রুশে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ, অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন প্রথম প্রতিবাদ।” ভেবে দেখেছ লেনিনকে নিয়ে কত কিছু লেখা হয়েছে, কত গল্প, কত উপন্যাস, কত নাটক? আমার বড়দার যাত্রার দল ছিল, অম্বিকা নাট্য প্রতিষ্ঠান। আমাকে খুব আদর করতেন। আমিও ছিলাম সেই দলের এক টাকার মালিক। জানি না কাগজ পত্রে লেখা ছিল কি না, প্রতিবছর যখন দলের কাজ শুরু হত আমাকে এক টাকার মুদ্রা নিয়ে সেখানে আসতে বলতেন আর সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দিতেন দলের স্বত্বাধিকারীদের একজন হিসেবে। আমার জন্মের পর মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমি বড়দা আর বৌদির কাছেই মানুষ। সারাদিন ওখানে থাকতাম, রাতে ঘরে ফিরতাম। এক বাড়িই তো। ওঁদের সন্তান ছিল না, আমাকে দত্তক নিতে চাইতেন। আমি রাজী হয়নি। গ্রামে আরেকটা দল ছিল – কার্ত্তিক সাহার অন্নপূর্ণা নাট্য প্রতিষ্ঠান। পরে যাত্রা সম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাসও আমাদের এলাকায় তাঁর দল চারনিক নাট্য গোষ্ঠী নিয়ে ঘাটি গাড়েন। সেসব দলে বিভিন্ন পালা হত, তার একটা লেনিন। অমলেন্দু বিশ্বাস নিজে সেখানে অভিনয় করতেন। যীশুকে নিয়ে যেমন বিভিন্ন রকমের কাহিনী গড়ে উঠেছে লেনিনকে নিয়েও সেরকম অনেক কাহিনী গড়ে উঠেছে। তবে ব্যাপারটা শুধু লেনিনকে নিয়ে নয়। সমাজতন্ত্র বা বলতে পার সোভিয়েত সমাজতন্ত্র লেনিনের মানসপুত্র। একে নিয়ে গড়ে উঠেছে নতুন ধরণের সাহিত্য, নতুন ধরণের আর্ট, নতুন ধরণের সিনেমা। সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজম নামে পরিচিত এ সব পৃথিবীর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। আভ্যানগার্ড আর্টের জন্মও মনে হয় সোভিয়েত ইউনিয়নেই। আমরা পেয়েছি নতুন ধরণের লেখক, নতুন ধরণের কবি, আর্টিস্ট, সিনেম্যাটোগ্রাফ। এতে রাজা বাদশাহ নয় সাধারণ মানুষ স্থান পেয়েছে। সাধারণ মানুষ ইতিহাস গড়েছে। প্রাচীন যুগে যেমন স্পারটাকাস, এ যুগে তেমনি হত দরিদ্র মানুষ ইতিহাস গড়েছে। এ সবই কিন্তু লেনিনের লিগেসি। এক অর্থে আজকের যে পৃথিবী সেটা লেনিনের লিগেসি। হ্যাঁ, মার্ক্স এর ভাবগুরু, কিন্তু লেনিনই প্রথম দেখান শ্রমিক শুধু পুঁজিপতিদের মুনাফা লাভের হাতিয়ার নয়, শ্রমিক, কৃষক - সমাজ বদলের কারিগর। আইনস্টাইন ভরের সাথে শক্তির সম্পর্কের সূত্র আবিষ্কার করেন, অপেনহাইমার সেই শক্তিকে মুক্ত করে জন্ম দেন পারমাণবিক বোমার। ঠিক একই ভাবে মার্ক্সের তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে লেনিন জন্ম দেন বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ। আর ১৯১৭ সালের পর থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত যাকিছু ঘটেছে সেটা ঘটেছে সেই অক্টোবর বিপ্লবকে ঘিরেই, এখনও ঘটছে। তাই লেনিনের লিগেসি অস্বীকার করা, এটা নিজেদেরকেই অস্বীকার করা।
কিন্তু অতীতকে অস্বীকার করার রাজনীতি তো লেনিন থেকেই শুরু।
সেটা ঠিক, কিন্তু সেটা আংশিক ভাবে সত্য?
যেমন?
দেখ, বিপ্লবের পর লেনিন বলতে গেলে দেশের অর্থনীতি ঢেলে সাজান। সেটাই স্বাভাবিক। কেননা মার্ক্স যে তত্ত্ব দিয়েছেন তাতে সমাজের চরিত্র অর্থনীতি বা উৎপাদন সম্পর্কের উপরই নির্ভর করে। তাই পুরনো অর্থনীতির সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে উৎপাদনে নতুন সম্পর্ক প্রণয়ন করেন। কিন্তু সমাজ তো শুধু অর্থনীতি নয়। সেই সময়ের শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানীদের দিকে তাকাও। মেন্দেলিয়েভ, কাপিৎসা, ভাভিলভ, চেরেনকভ, লান্দাউ, ভেরনাদস্কি, বুনিন, গোর্কি, এসেনিন, মায়াকভস্কি, পাস্তেরনাক, আখমাতভা, গুমিলেভ, কঞ্চালভস্কি, ৎসভেতায়েভা, বুলগাকভ, আইজেনস্টাইন, স্তানিস্লাভস্কি, যোশেঙ্কো, মারশাক, বার্তো – যারা সোভিয়েত বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, থিয়েটার, সিনেমা থেকে শুরু করে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখে গেছেন, তারা কিন্তু বিপ্লব পূর্ব রুশ ধারার প্রতিনিধি। তার মানে এই যে লেনিন যদিও বিখ্যাত «দার্শনিক জাহাজে» প্রচুর রুশ বুদ্ধিজীবীদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তবুও সেটা সমূলে উৎপাটন করেননি। তবে এটাও ঠিক নতুন বাস্তবতা তাদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে। তাদের শিল্পের বিষয়বস্তু পাল্টায়, পাল্টায় গল্পের নায়ক নায়িকা। এক সময় সাহিত্য ছিল দেবতা আর রাজা বাদশাহদের জয়গাঁথা। তবে সাহিত্য এখান থেকে অনেক আগেই সরে এসেছে। প্রকৃতি বা সুন্দরের প্রকাশ ছাড়াও সাহিত্যে স্থান পেয়েছে সাধারণ মানুষ। গোগোল, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, চেখভ এরা তো সাধারণ মানুষের কথাও বলেছেন। লেনিন নিজে তলস্তয়কে রুশ বিপ্লবের আয়না বলে আখ্যায়িত করেছেন। সে সময় রুশ দেশে শ্রমিক শ্রেণী ছিল না বললেই চলে। তবে গোর্কি, অস্ত্রভস্কি তাঁদের লেখায় সেই অভাবটা পুষিয়ে দিয়েছেন। নতুন বাস্তবতা নতুন ধরণের সাহিত্যের জন্ম দিয়েছে। সেটা একদিকে ছিল নতুন রাজতন্ত্রের পূজা অন্যদিকে রুপকের আড়ালে নতুন ব্যবস্থার সমালোচনা। বুলগাকভ এ ব্যাপারে খুবই সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। তাই সোভিয়েত সমাজ রুশদেশেরে সব কিছু সমূলে উল্টে দিয়েছে বা দিতে পেরেছে – সেটা বলা ভুল। আর সে কারণেই হয়তো সোভিয়েত ইউনিয়ন এসব ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে। অর্থনীতিতে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি, হয়তো এ কারণেই শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত অর্থনীতি ব্যর্থ হয়। হয়তো সেটাই সোভিয়েত ইউনিয়ননের অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
দেখতে দেখে আঁধারে হারিয়ে যায় গঙ্গা। শেয়ালের ডাক শুনতে শুনতে ওরা ফিরে যায় লোকালয়ে। দুলাল শহরে, অভি গেস্ট হাউজে। কথা হয় পরের দিন সকালে দুলাল চলে যাবে এলাহাবাদ ফোর্টের পাশে। ওখান থেকে শুরু হবে ওদের নতুন করে পথ চলা। অভি খুব ভোরে উঠে পড়ল ঘুম থেকে। ব্রেকফাস্ট করতে না করতেই চলে এলো গাড়ি। ওরা চলল প্রয়াগ তীর্থের দিকে। দুলাল আগেই সেখানে অভির অপেক্ষা করছিল। নদীর তীরে লোকে লোকারণ্য। কত যে নৌকা। নৌকায় করে সবাই যাচ্ছে গঙ্গা আর যমুনার মিলনস্থলে। সাধুরা বসে আছে এখানে সেখানে। কেউ বা হাত দেখছে আবার কোথাও বা সাধুরা গোল হয়ে বসে গল্প করছে। ছোটবেলায় গোলকধাঁধা খেলতে গিয়ে অভি কতবার যে এখানে এসেছে! অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত ওরাও ঠিক করল নৌকা করে যাবে সেই সঙ্গমে। নৌকার ভাড়া দেড় হাজার থেকে তিন শতে নামল। চারিদিকে শুধু নৌকা আর নৌকা। মাথার উপর চক্কর দিচ্ছে গাংচিলের ঝাঁক। দূর থেকে এলাহাবাদ ফোর্ট নব রূপে দেখা দিচ্ছে। ত্রিবেণী সঙ্গমে নারী পুরুষ সবাই স্নান করছে।
ত্রিবেণী সঙ্গম মানে তিন নদীর মিলন মেলা। গঙ্গা ও যমুনার দেখা মিললেও সরস্বতীর দেখা এখানে কেউই পায়নি। এটা কি শুধুই কাল্পনিক নদী নাকি প্রাচীন কালে তার অস্তিত্ব ছিল? অভির মনে আছে গয়ায় গঙ্গা স্নানের কথা। সেখানে গঙ্গা অন্তঃসলিলা। তাই ওরা অনেকটা বালু খুঁড়ে গর্ত করে সেখানে স্নান করেছিলো। কথিত আছে রামকে বনবাসে পাঠিয়ে রাজা দশরথ পুত্রশোকে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কয়েকদিনের মধ্যেই প্রাণ ত্যাগ করেন। একদিন রাম আর লক্ষণ যখন খাদ্যের সন্ধানে বাইরে গিয়েছিলেন দশরথ সীতাকে দর্শন দেন। দু ভাই ফিরে এলে সীতা তাঁদের দশরথের আগমনের কথা বলেন। দু ভাই সে কথায় বিশ্বাস না করলে সীতা সাক্ষী হিসেবে ডাকেন তুলসী গাছ আর গঙ্গাকে। তুলসী গাছ সীতার পক্ষে সাক্ষ্য না দেওয়ায় সীতা থাকে অভিশাপ দেন। সেই থেকে তুলসী গাছ দেখলেই কুকুর তার উপর প্রস্রাব করে। আর সীতার অভিশাপে এখানে গঙ্গা অন্তঃসলিলা হয়। ঋগবেদ সহ বৈদিক ও হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থে সরস্বতী নদীর উল্লেখ থাকলেও এখনও পর্যন্ত এর দেখা মেলেনি। কেউ কেউ ধারণা করেন ছায়াপথকে ত্রিবেণী সঙ্গমের তৃতীয় নদী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। আবার অনেকের মতে যমুনা ও সুতলেজ নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় ভারত ও পাকিস্তানে প্রবাহিত ঘাজ্ঞার-হারকা নদীই হয়তো সেই বৈদিক সরস্বতী। স্যাটেলাইট চিত্র সাক্ষ্য দেয় যে এক সময় এখানে এক গুরুত্বপূর্ণ নদী ছিল যার ধারে গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতার অনেক বড় বড় জনপদ। আবার অনেকের মতে আফগানিস্তানের হেম্লান্দ বা হারাক্সভাতি নদীই হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মীয় শাস্ত্রে উল্লেখিত সেই নদী। তবে সে যাই হোক সরস্বতী নদীর গুরুত্ব মোটেই কমেনি বরং একবিংশ শতাব্দীতে নতুন ভাবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে সিন্ধু সভ্যতাকে সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা নামেও উল্লেখ করা হয়। এই নতুন আপ্রোচ ভারতবর্ষে আর্য মাইগ্রেশনের ব্যাপারে নতুন চিন্তার খোঁড়াক যোগায়।
ছোটবেলায় মকর সংক্রান্তিতে কালিগঙ্গা নদীতেও লোকজন স্নান করত। কেউ কেউ যেত শীতলক্ষ্যার তীরে লাঙ্গলবন্ধে। তবে এখানে এসব হয় সারা বছর ব্যাপী। সেখান থেকে দৃশ্যমান নতুন তৈরি যমুনা সেতু। সময় থাকলে সারাদিন নৌকায় করে ঘুরে কাটানো যায়। কিন্তু এত সময় কোথায়? সেখান থেকে ওরা গেল পাশের হনূমানের মন্দিরে। পরের ঠিকানা আনন্দ ভবন। যদিও আকারে এলাহাবাদ ফোর্টের মত গুরুগম্ভীর নয়, স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই ভবনের গুরুত্ব মোটেও কম নয়। এর প্রতিষ্ঠাতা প্রথিতযশা উকিল মতিলাল নেহরু। জহরলাল নেহরুর আত্মজীবনীতে এই বাড়ি সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। কংগ্রেসের প্রথম যুগে যখন মতিলাল নেহরু, দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জন দাস ছিলেন এর কর্ণধার তখন যেমন তেমনি পরবর্তী কালেও এই আনন্দ ভবন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখানেই ভারতের স্বাধীনতার উপর বিভিন্ন সভা হয়েছে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিলও এখনেই লেখা হয়েছে। এখন এটা মিউজিয়াম। সেখানে অতি যত্নে সংগৃহীত আছে জহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর বিভিন্ন জিনিসপত্র। একটা অংশ ছেঁড়ে দেওয়া হয়েছে শিশুদের জন্য। বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে বেলা বাড়তে লাগল। সেমিনারের সময় এগিয়ে আসছে। ওদিকে দুলাল চলে যাবে দিল্লী। দিল্লীতে ওরা আবার একসাথে ঘুরবে। এরপর অভি ওখানে একটা লেকচার দিয়ে চলে যাবে কোলকাতা, দুলাল যাবে আমেরিকা ওর বৌ আর বাচ্চাদের কাছে।
সেমিনার বেশ ভালই হল। বিশেষ করে সেমিনার শেষে অশোকদার টিপস অভির পরবর্তী কাজে খুবই সহায়ক হয়েছিল। সেমিনার শেষ টি পার্টি। সন্ধ্যায় অভি আবার গেল সূর্য দর্শনে ঠিক যেমন করে দুবনায় ও ভল্গার তীরে যায়। পরদিন সকালে ওকে যেতে হবে এলাহাবাদ এয়ারপোর্টে। সকাল সকাল রেডি হয়ে ও আবার গেল সকালের গঙ্গা দেখতে। এখন সে বিকেলের মত এত রঙ্গিন নয়। তারপরও গঙ্গা গঙ্গাই। দিল্লীতে ওর জন্য গেস্ট হাউজে সীট বুক করাই ছিল। তবে প্রথম দুদিন মানে শনি আর রবি বার ও থাকবে বন্ধু চঞ্চলের বাসায়। চঞ্চল ওদের জন্য দিল্লী আর আগ্রা ভ্রমণের ব্যবস্থা করে রাখবে। তাছাড়া ছুটির দিনে এই অজানা অচেনা শহরে একা ও কীই বা করবে। চঞ্চল বলেছে ও এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে যাবে। খাওয়া দাওয়া শেষে অভি নিশ্চিন্ত মনে রওনা হল এয়ারপোর্টের পথে।
http://bijansaha.ru/albshow.html?tag=138

Comments
Post a Comment