দিল্লি

 (২৮)

এলাহাবাদ এয়ারপোর্ট যতদূর মনে হয় শুধুই ডোমিস্টিক পারপাসে ব্যবহার করা হয়। অভি একটু টেনশনেই ছিল সময় মত পৌঁছতে পারবে কিনা। কিন্তু দেখা গেল বিমান লেট। এই প্রথম অভি এরকম অবস্থায় পড়ল। সবচেয়ে বড় কথা কখন প্লেন ছাড়বে তার কোন খবর নেই। জিজ্ঞেস করেও কিছু জানা যাচ্ছে না। ওদিকে চঞ্চলের এয়ারপোর্টে আসার কথা। কয়েক ঘণ্টা পরে চঞ্চল ফোন করল

তুই কোথায়?
এলাহাবাদ এয়ারপোর্টে বসে আছি। প্লেন লেট।
প্লেন কখন ছাড়বে?
কে জানে?
তাহলে এক কাজ করি, আমি বাসায় চলে যাই। তুই এয়ারপোর্টে এসে একটা ক্যাব ভাড়া করে চলে আসিস। ওসব অফিসিয়াল, তাই ঝামেলার সম্ভাবনা নেই। আবারও তোকে অ্যাড্রেস পাঠাচ্ছি।
ঠিক আছে। চিন্তা করিস না। পৌঁছে যাবে। সমস্যা হলে ফোন করব।

শেষ পর্যন্ত প্লেন ছাড়ল। দুপুরের পরে অভি পৌঁছুল ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে। সেখান থেকে একটা ক্যাব নিয়ে চলে গেল চঞ্চলের ওখানে। ও নীচে অপেক্ষা করছিল। অনেক দিন পরে দেখা হল চঞ্চলের সাথে। ও অভিদের ব্যাচের। অভির মত ওর সোভিয়েত জীবন শুরু ১৯৮৩ সালে। প্রিপারেটরি করেছে ক্রাস্নাদারে আর মূল পড়াশুনা খারকভে। মস্কো এলে রানার ওখানে উঠত। রানা ছিল কোলকাতার ছেলে। বোর্ডে স্ট্যান্ড করা ছেলে। তাই প্রথম দিকে ইয়ারমেটরা ওকে একটু অন্য চোখে দেখত। পাভ্লবস্কায়ায় অভি আর রানা এক রুমে থাকত। তাই পরিচয়টা বেশ গাড় ছিল। পরে ওরা যখন মিকলুখো মাকলায়া চলে যায় রানা আস্তানা গাড়ে এক তলায় আর অভি পাঁচ তলায়। চঞ্চল মস্কো এলে দেখা করত। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় দরাজ গলার গান শুনে অভি পেত চঞ্চলের আগমনী বার্তা। পাব্লভস্কায়া থাকার সময় প্রায়ই বিশ্বরূপ, রানা, পার্থ আর অভি ওর ঘরের সামনে টেবিল টেনিসের কোর্টের ওখানে আড্ডা দিত। গীটার বাজিয়ে গান গাইত সবাই মিলে। তবে চঞ্চলকে সেই আড্ডায় অভির মনে পড়ছে না যদিও চঞ্চলের ভাষ্য অনুযায়ী ও পাভ্লভস্কায়া এসেছে, ওর রুমে রাত কাটিয়েছে। ফেসবুকের কল্যাণে এখন ওদের বন্ধুত্বের ঘনত্ব আরও বেড়ে যায়। চঞ্চল ভেটেরিনার। দিল্লীতে অনেক দিন। গত কয়েকদিনের পথের ধকল তার উপর ওদের অনেক দিন পরে দেখা, তাই ঠিক হল ওদিনটা ওরা বাসায় আড্ডা দিয়ে কাটাবে। পরের দিন চঞ্চল অভি আর দুলালের জন্য শহর দর্শনের ব্যবস্থা করেছে।

দিল্লি। স্বপ্নের শহর দিল্লি। যুগ যুগ ধরে এই দিল্লিকে, দিল্লির সিংহাসনকে ঘিরে কত যে যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছে তার হিসেব কে রাখে? ধারণা করা হয় খৃস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দী থেকে এখানে জনবসতি ছিল আর খৃস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে এখানে নিরবিচ্ছিন্ন মানুষ বসবাস করে আসছে। অনেকের বিশ্বাস মহাভারতের পাণ্ডবদের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ এখানেই অবস্থিত ছিল। জতুগৃহ থেকে পালিয়ে পাণ্ডবরা কুন্তীর সাথে বনে বাস করতে থাকেন আর এক পর্যায়ে পাঞ্চাল রাজকন্যা দ্রৌপদীকে বিয়ে করেন। এরপর তাঁরা হস্তিনাপুর ফিরে এলে কৌরবেরা তাঁদের প্রাপ্য রাজ্য ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেন। তখন তাঁরা খাণ্ডব নামে এক বিশাল বন পুড়িয়ে সেখানে ইন্দ্রপ্রস্থ নগর তৈরি করেন। ময়দানব তৈরি করে রাজপ্রাসাদ। এই রাজপ্রাসাদের স্থাপত্যশৈলী দেবরাজ ইন্দ্রের প্রাসাদকেও হার মানায়। এখানেই শ্বেতপাথরের তৈরি উঠান দুর্যোধন সরোবর বলে ভ্রম করলে দ্রৌপদী হেসে ওঠেন। সেখান থেকেই শুরু হয় কুরু পাণ্ডবের নতুন শত্রুতা। এর ফল আমরা দেখতে পাই কুরু রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময় ভীমের দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ আর দুঃশাসনের রক্তপানের প্রতিজ্ঞার মধ্যে। এখানে প্রাপ্ত প্রাচীনতম স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ খৃস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মৌর্য যুগের। সম্রাট অশোকের শিলালিপিও পাওয়া গেছে এখানে। বর্তমান দিল্লির দক্ষিণ অংশে ঐতিহাসিক বিভিন্ন বড় বড় নগরীর ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। টোমারা বংশের আনাং পাল ৭৩৬ খৃস্টাব্দে লাল কট স্থাপন করেন। ১১৯২ সালে পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করে মোহাম্মদ ঘোরী দিল্লিতে মুসলিম শাসনের শুরু করেন। এরপর একের পর এক বিভিন্ন মুসলিম সুলতান দিল্লির মসনদ দখল করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কুতুব উদ্দীন আইবেক, ইলতুতমিস, সুলতানা রাজিয়া। ১৫২৬ সালে প্রথম পানিপথের যুদ্ধে লোদী বংশের ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে  বাবুর ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের পত্তন করেন। মাঝখানে বাবুর পুত্র হুমায়ূন কয়েক বছরের জন্য মসনদ হারালেও তা অচিরেই পুনরোদ্ধার করেন। এরপর শুরু হয় মুঘল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ। আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, আওরঙ্গজেব প্রায় সমগ্র ভারত দিল্লির অধীনে আনেন। এই মুঘলদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় ইংরেজদের হাতে। ইংরেজ আমলে কোলকাতা হয় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী, যদিও ১৯১১ সালে ব্রিটিশ রাজ দিল্লিতে তাদের রাজধানী স্থানান্তরিত করে। এই সেই দিল্লী। পৃথিবীর প্রাচীনতম শহরগুলোর অন্যতম প্রধান। এর প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে ইতিহাস।      

পরের দিন সকালে চঞ্চল ওকে পৌঁছে দিল কুতুব মিনারে। দুলাল আগেই এসেছিল। একটা গ্রুপের সাথে ঢুকিয়ে দিল ওদের। সারাদিনের শহর ভ্রমণ। কুতুব মিনার, লোটাস টেম্পল, ইন্দিরা গান্ধী মেমরিয়াল, রাজ ঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধি, ইন্ডিয়া গেট, রাষ্ট্রপতির ভবন, চাঁদনী চক এসব ঘুরে শেষ হবে লাল কেল্লায়।   

কুতুব মিনার। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ইটের মিনার। ভারতের প্রথম মুসলিম শাসক কুতুব উদ্দীন আইবেক ১১৯৩ সালে আফগানিস্তানের জাম মিনারের অনুকরণে এই মিনারের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। সাধক খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকির নামানুসারে এর নাম রাখা হয় কুতুব মিনার। কিন্তু তিনি শুধু এর ভিত্তি স্থাপন করতে পেরেছিলেন। তাঁর উত্তরাধিকারী ও জামাতা সুলতান ইলতুতমিস আরও তিন স্তর তৈরি করেন আর ১৩৬৮ সালে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ্‌ তুঘলক পঞ্চম ও সর্বশেষ স্তর নির্মাণ করেন।

যাই বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নে এসব স্থাপত্য অনেক ভালো ভাবে সংগৃহীত। - দুলাল বলল কুতুব মিনারের পাশে বিভিন্ন ভগ্নপ্রায় প্রাচীর দেখতে দেখতে।

কথাটা ঠিক আবার ঠিক নয়। আমরা কতুটুকু দেখেছি সোভিয়েত ইউনিয়নের? শুধু সেটুকু, যা দেখার অনুমতি ছিল। এমন কী নতুন রাশিয়ায় আমরা কী খুব বেশি জায়গায় যাই? সবাই যায় ট্যুরিস্ট স্পটে। আর সেখানে সবই ঝকঝকে তকতকে। সেটা যেকোনো দেশেই। তোমরা তো সবাই ঘোর অবিশ্বাসী ছিলে। আমিও ব্যতিক্রম ছিলাম না। তবে মাঝে মধ্যে চার্চে যেতামনা, প্রার্থনা করতে নয়। দেখতে। ছোটবেলায় তো মায়ের সাথে বিভিন্ন তীর্থে ঘুরেছি, অনেক মন্দির দেখেছি। হিন্দু মন্দিরের সাথে রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের অনেক মিল আছে। যেমন ধুপ ধুনো দেওয়া, মোমবাতি জ্বালানো। পাদ্রী যখন ভরাগলায় প্রার্থনা করেন সেটা শুনতে অনেকটা মন্ত্রের মত মনে হয়। আর আইকন। হিন্দু মন্দিরে মূর্তি থাকে, ওদের আইকন। তবে আমাদের সব বাড়িতে মূর্তি থাকে কম, থাকে ছবি। আইকন তো সে রকমই। ছাত্র জীবনে আমি আর আমার রুমমেট কুমার বিভিন্ন পার্বণে, যেমন ইস্টার, ক্রিস্টমাসে যেতাম অক্টোবরস্কায়ায় ফ্রান্সের  দুতাবাসের সামনে যে গির্জা আছে সেখানে। ওটা মস্কোর কয়েকটা সক্রিয় গির্জার একটা ছিল। বুড়িরা মানে বাবুশকারা আড় চোখে তাকাতেন কিন্তু বাধা দিতেন না। হয়তো ভাবতেন কেজিবির লোক। কিন্তু অধিকাংশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিন্তু বিভিন্ন ধরণের অয়ার হাউজ, ক্যাফে, বার ইত্যাদি হিসেবে ব্যবহৃত হত। এখন তো আমি ছবি তুলতে বিভিন্ন জায়গায় যাই। বিশেষ করে গ্রাম বা ছোট শহরে। সেখানে কত গির্জা যে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে চিন্তা করতে পারবে না। জারের রাশিয়ায় বিভিন্ন ধরণের জনপদ ছিল। গ্রাম ছিল দু ধরণের। দেরেভনিয়া আর সেলো। দেরেভনিয়া আকারে ছোট আর সেখানে লোক সংখ্যা সর্বোচ্চ ১০০০ জন।  সেলোয় জন সংখ্যা এক হাজারের বেশি আর তার নিজস্ব গির্জা ছিল। গির্জা শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয় বলতে পার এক ধরণের অফিস। কেননা এখানে বিয়ের ডকুমেন্টেশন হত জন্ম মৃত্যুর সার্টিফিকেট এখানেই দেওয়া হত। তাই রুশ সাম্রাজ্যের সেসব এলাকায় যেখানে খৃস্টানদের প্রাধান্য ছিল সেখানে গির্জার ভূমিকা ধর্মীয় গণ্ডী ছাড়িয়ে যেত। যাহোক, তুমি বলছিলে ইতিহাস সংরক্ষণের কথা। যদি গ্রাম এলাকায় যাও দেখবে সোভিয়েত আমলে জার  রাশিয়ার ঐতিহ্য কীভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। জানি জাগোরস্ক বা সেরগিয়েভ পাসাদের কথা বলবে। কিন্তু এসব হাতে গনা, মূলত প্রোপ্যাগান্ডার জন্য। এক সময়ের বিখ্যাত সব কেন্দ্র যেমন তরঝক, কাশিন, কালিয়াজিনের দিকে তাকিয়ে দেখ বুঝবে ব্যাপারে আমাদের ধারণা কত প্রতারণামূলক। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে যে সোভিয়েত ইউনিয়নে ধর্মের কোন স্থান ছিল না বাইরের এই প্রোপ্যাগান্ডা যেমন ঠিক নয় একই ভাবে মস্কো, লেনিনগ্রাদ বা গোল্ডেন রিঙের শহরগুলো দেখে সব ঠিক ছিল বলাটাও ঠিক নয়। পিতৃভূমির যুদ্ধে রাশান চার্চ খুব ভালো ভূমিকা পালন করেছে, চার্চের নামেও প্রচুর মানুষ যুদ্ধ করতে গেছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। নতুন রাশিয়ায় অবস্থার খুব পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না। যদিও গির্জার সম্পদ অনেকটাই তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবে পুরনো গির্জার রিকনস্ট্রাকশন তেমন হচ্ছে না। তার মূল কারণ সেলোগুলো প্রায় জনশূন্য। লোকজন আজকাল চার্চে গেলেও বিভিন্ন জরিপে দেখা যায় এদেশের মাত্র %  থেকে % মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস করে।    

তরঝক, কাশিন, কালিয়াজিন – এসব সম্পর্কে একটু বলবেন?
অবশ্যই। তবে এখন নয়। আগামী কাল তো বাসে আগ্রা যাচ্ছি। চল তখন বলা যাক। এখন বলতে গেলে আর কিছুই দেখা হবে না।  

কুতুব মিনার দেখা শেষ করে ওরা গেল লোটাস টেম্পলে। এটা বাহাই সম্প্রদায়ের উপাসনালয়। বাহাউল্লাহ জন্ম নেন ইরানে। তিনি বাহাই ধর্ম নামে এক ধর্ম প্রচার করেন। এখনও পর্যন্ত উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, উগান্ডা,  জার্মানি, পানামা, সামোয়া ও ইন্ডিয়া – এই সাত জায়গায় সাতটি বাহাই টেম্পল আছে, অষ্টমটি তৈরি হচ্ছে চিলিতে। অপূর্ব স্থাপত্য শৈলীতে তৈরি এসব মন্দিরগুলো পৃথিবীর নতুন আশ্চর্য আর একই সাথে দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠছে।  দিল্লিমন্দির পদ্মের আকারে তৈরি বিধায় এটা লোটাস টেম্পল নামে পরিচিত। অভি বাহাউল্লাহ সম্পর্কে প্রথম শুনে ১৯৯০ সালে তুরস্ক যাওয়ার পথে। গিয়েছিল ট্রেনে। তিন দিনের জার্নি। ট্রেনেই পরিচয় জন নামে এক অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রলোকের সাথে। তিনি বাহাই সম্প্রদায়ের। বাহাউল্লাহ সম্পর্কে অনেক গল্প করেছিলেন আর বেশ কিছু বই দিয়েছিলেন। সেই দীর্ঘ যাত্রা পথে অভির সাথী ছিল জন আর বিভূতি ভূষণের গল্পসংগ্রহ। অপুর কোলকাতা যাত্রার কথা পড়তে পড়তে ট্রেনে বসে ওর নিজেকেই অপু মনে হচ্ছিল। সে সময় দিল্লীর এই লোটাস টেম্পল তৈরির কথা চলছিল। এখন ওরা সেই লোটাস টেম্পলে। অভির মনে হচ্ছিল জনের কথা। বিশাল লাইন। অনেকটা সোভিয়েত আমলে লেনিনের সমাধি দেখার মত। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গোটা এলাকা। বাগান। ঝলমলে রাস্তাঘাট। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পদ্মাকার এই অপূর্ব সুন্দর স্থাপত্য। ওদের তেমন সময় ছিল না ঘুরে ঘুরে সব দেখার। তবে যেটুকু দেখল তাতেই মন ভরে গেল। আসলে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দূষণ মুক্ত যে কোন জায়গাই মানুষকে টানে।     

ওদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ইন্ডিয়া গেট। সেখানেও লোকের ভিড়। অনেক জিপসির আনাগোনা।

যে দেখতে অনেকটা মস্কোর কুতুজভস্কি প্রস্পেক্টের ট্রিউম্ফালনায়া আরকা মানে বিজয় খিলানের মত। - দুলাল বলল।

তাতো বটেই। সব দেশেই বিজয়ের ব্যাপার স্যাপার এভাবেই প্রকাশ করা হয়। এখন অবশ্য মস্কোয় ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। আগে ওখানে ছিল বারাদিনস্কায়া প্যানারমা। এখন সেই সাথে হয়েছে পার্ক পবেদি বা বিজয় পার্ক। তুমি দেখেছ মনে হয়। আমাদের ছাত্র জীবনে মহান পিতৃভূমির যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা মূলত বলশয় থিয়েটারের উল্টো দিকে কার্ল মার্ক্সের স্ট্যাচুর ওখানে বা পার্ক কুলতুরিতে মিলিত হতেন। এখন তাদের মিলন কন্দ্র পার্ক পবেদি। সেখানে বিভিন্ন রকম মিউজিয়াম, স্ট্যাচু। শুধু বিজয় দিবসেই নয়, বছরের যেকোনো সময়েই সেখানে প্রাণ ভরে ঘোরা যায়। এখনও মনে আছে ১৯৮৩ সালে আমরা যখন মস্কো আসি, শীতের প্রারম্ভে আমাদের বাসে করে মস্কো দেখায়। ঐ সময় আমাদের পার্ক পবেদি নিয়ে যায়। তখন সেটার কাজ সবে শুরু হয়েছে।

 এরপর ওরা গেল ইন্দিরা গান্ধী মেমরিয়ালে। এখানেই তিনি দেহরক্ষীদের গুলিতে প্রাণ হারান। সাদামাদা একটা বাড়ি। মানে একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্বেও যথেষ্ট সিম্পল। জরুরী আইন জারির কারণে ভারতে ইন্দিরা গান্ধিকে নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে, তাঁর প্রতি আছে অনেক বিদ্বেষ, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ, যারা একাত্তরের চেতনায় বিশ্বাসী, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ সার্বভৌম বাংলাদেশে বিশ্বাসীতাদের কাছে ইন্দিরা গান্ধী অসীম শ্রদ্ধার পাত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় অবদানের ব্যাপকতার কাছে ভারতের রাজনীতিতে তাঁর সমস্ত অগণতান্ত্রিক চর্চা বানের জলে খড়কুটোর মত ভেসে যায়। এখনও ঘরে ঘরে ঠিক সেভাবেই রয়ে গেছে তাঁর ব্যবহৃত সব কিছু। সময় যেন এখানে থেমে গেছে। যে জায়গাটা তাঁকে গুলি করা হয়েছিল সেটা বুলেট প্রুফ কাঁচ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। মস্কোয় যেমন অনির্বাণ শিখার সামনে সৈনিক দাঁড়িয়ে থাকে এখানে ঠিক সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে একজন ভারতীয় জওয়ান। উঠানে শত বর্ষের পুরনো বিশাল বিশাল গাছ। সামনের রাস্তায়ও তাই। কোলাহল নেই। সব মৃত্যুপুরীর মত শান্ত। 

ওদের পরের গন্তব্য ছিল রাজ ঘাট। এখানেই অন্তিম শয্যায় শুয়ে আছেন স্বাধীন ভারতের আরেক স্বপ্নদ্রষ্টা মহাত্মা গাঁধি। অহিংসা নীতির জন্য সারা বিশ্বে পুজিত। মারটিন লুথার কিং সহ অনেকেই তাঁকে পথ প্রদর্শক মনে করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়ায় উনি যথেষ্ট সমাদৃত। মস্কোয় তাঁর স্ট্যাচু আছে ইউনিভার্সিটি হোটেলের সামনে। পরে রাস্তার ঠিক উল্টো দিকে ইন্দিরা গান্ধীর মূর্তি উন্মচন করা হয় আর জায়গাটির নাম রাখা হয় ইন্দিরা গান্ধী স্কয়ার। তবে An experiment with the truth সহ গাঁধির বিভিন্ন বিভিন্ন বই পড়ে আর সে সময়ের রাজনীতির উপর সুভাষ বোস, মৌলানা আজাদ, জহরলাল নেহরু, রামচন্দ্র গুহ, যশোবন্ত সিং সহ বিভিন্ন লেখকের বই পড়ে অভি দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে এই দেবতা মাঝে মাঝে দানবের পাল্লায় পড়তেন। অনেক সময় ঠিক আদর্শ বলব না, নিজের জেদের কাছে জিম্মি করতেন লাখ লাখ মানুষের ভাগ্য। তিনি জঙ্গি ছিলেন না, তবে অনেক সময়ই রাজনীতি আর ধর্মকে গুলিয়ে ফেলতেন। তিনি নিজেও লেভ তলস্তয়ের প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন। বিশেষ করে তলস্তয়ের “তোমার মধ্যে ঈশ্বরের রাজ্য” তাঁকে ভীষণ ভাবে আলোড়িত করে। ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতি যদি রাজনীতির নিজস্ব গতিতে চলত, এর মধ্যে যদি ভালো অর্থে গাঁধির ধর্মীয় প্রভাব না পড়ত, উপমহাদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত। মুসলিম লীগ বা আরএসএস ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করেছে রাজনীতি আর ধর্ম দুটোকেই পস্তাতে,  এর বিপরীতে তিনি চেয়েছেন ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতিকে দূষণ মুক্ত করতে। কিন্তু তিনি হেরে গেছেন। যদি ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার না করে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এদের অনুকরণে তিনি ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে সমাজকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাতেন তাতে মানবতার সেবা করার তাঁর প্রচেষ্টা আরও কার্যকরী হত। রাজ ঘাটে মহাত্মা গাঁধির মেমরিয়াল অনেকটা জায়গা নিয়ে তৈরি। যমুনার পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক ঘাটের আদি নাম পুরনো দিল্লি ঘাট বা শাহজাহানাবাদ ঘাট। পরবর্তীতে গাঁধির মেমোরিয়ালও রাজ ঘাট নামে পরিচিতি লাভ করে। এখানেই ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি আততায়ী নাথুরাম গডসের হাতে নিহত মহাত্মা গাঁধির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। খোলামেলা। ঘণ্টার ধ্বনি। অনির্বাণ শিখা। জয় রাম লেখা বেদি। চারিদিকে ধর্মীয় আবহাওয়া বিরাজমান।           

এরপর ওদের নিয়ে গেল চাঁদনী চকে। দিল্লীর অন্যতম প্রধান বাজার। ট্যুরিস্টদের এখানে নিয়ে যায় কেনাকাটি করার জন্য। কী নেই সেখানে? সারা ভারতের সব প্রদেশের জিনিসপত্র দিয়ে ভরা এ বাজার।

দেখুন বাজার কাকে বলে। সোভিয়েত ইউনিয়নে যদি এরকম কিছু থাকত হয়তো দেশটা ভাঙ্গত না। গুম, ৎসুম – কত বড় বড় দোকানই না ছিল – জারের আমলে তৈরি গুমের সৌন্দর্য রাজপ্রাসাদকেও হার মানায়, কিন্তু সামগ্রীর প্রাচুর্য ছিল না। মানুষকে আদর্শের বুলি দিয়ে খুব বেশি দিন খাওয়ান যায় না।

সেটা ঠিক দুলাল। এজন্যেই তো পেরেস্ত্রইকা। প্রথমে তো সেটাই লক্ষ্য ছিল। খাদ্যে পন্যে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা। মনে আছে গরবাচভের সময় কর্পোরেটিভের কথা? লেনিন কিন্তু নেপ এ সেটাই করতে চেয়েছিলেন, পারেন নি। তখন গরবাচভ প্রায়ই “ব্যাক টু লেনিন” বলতেন। কর্পোরেটিভ ছিল লেনিনের সেই প্ল্যান বাস্তবায়ন করার একটা প্রচেষ্টা। তবে অর্থনীতির সাথে সাথে রাজনীতিকে খুলে দিয়ে, দেশ শাসনে সিপিএসইউ এর একচ্ছত্র আধিপত্য উইথড্র করে তিনি আসলে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দেন। রাজনৈতিক মুক্ত হাওয়া সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যায়। শুরু হয় ক্যাওয়াস। ফলাফল – মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। পেরেস্ত্রইকা, গ্লাসনস্ত – এ সব নিঃসন্দেহে দরকার ছিল, কিন্তু এ ধরণের বিশাল কর্মকাণ্ড সঠিক ভাবে পরিচালনার জন্য যে ধরণের বলিষ্ঠ ও দক্ষ নেতৃত্ব প্রয়োজন গরবাচভ তেমনটা ছিলেন না। তাঁর দুর্বল নেতৃত্বের কারণেই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী একটা দেশ, মানব সমাজকে নিয়ে এক অভূতপূর্ব এক্সপেরিমেন্ট শুধু ব্যর্থই হয় না, সারা পৃথিবীর জন্যে বয়ে আনে অভাবনীয় দুর্যোগ। ১৯১৭ সালের মহান অক্টোবর বিপ্লব পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল। ১৯৯১ সালে সেই বিল্পবের করুণ আত্মসমর্পণ পৃথিবীকে আবার বদলে দেয় – জন্ম দেয় কিছু মনস্টারের। আজকে আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি সেটা গরবাচভের অদক্ষ ও দুর্বল নেতৃত্বের  ফল। 

কথা বলতে বলতে ওরা শাল, টুকিটাকি স্যুভেনির কিনে নিল। পড়ন্ত বিকেল। এখনও লাল কেল্লা দেখা বাকী।

লাল কেল্লা বা রেড ফোর্ট। এই ঐতিহাসিক কেল্লা দিল্লীতে মুঘল সম্রাটদের প্রধান আবাস্থল। সম্রাট শাহজাহান আগ্রা থেকে দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে ১৬৩৮ সালে এই কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তাজমহলের স্থপতি উস্তাদ আহমাদ লাহরি লাল কেল্লারও স্থপতি। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু লাল কেল্লার লাহরি গেটে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।  এরপর থেকে প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল কেল্লার প্রধান তোরণে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এখান থেকেই তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষন দেন। ওরা যখন ট্র্যাফিক এড়িয়ে লাল কেল্লায় এলো সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। দুর্গের বিশালতা দেখে অভির মনে হল এর কাছে এমন কি মস্কোর ক্রেমলিন ছোট্ট শিশু। সোভিয়েত স্থাপত্যে মনুমেন্টালিজমের প্রাধান্য সর্বত্র। কিন্তু মুঘল স্থাপত্যের কাছে সেগুলো কিছুই নয় বলেই অভির মনে হল। কি নেই এখানে? রাজপ্রাসাদ, রঙ্গমঞ্চ, বিশাল উঠান, উপাসনালয়! এখানেই এক বিল্ডিঙে যেন মেলা বসেছে। চাঁদনী চকের মত এখানেও বিভিন্ন স্যুভেনিরের দোকান। অভির মনে হল কাজানের কথা।

জান দুলাল কাজান ক্রেমলিনেও এরকম অনেক দোকান আছে, যদিও প্রাচুর্য এমন নয়।
আপনি কাজান গেছেন?
অনেক বার। ২০০৭ সাল থেকে প্রায় প্রতি দু বছরে একবার করে যাই। ইদানীং তো প্রতি বছরেই।
কাজানের গল্প বলেবেন না?
অবশ্যই। এখন নয়। পরে।    

ওদের ট্রিপ শেষ হল সন্ধ্যে ৭ টার দিকে। অভি চঞ্চলকে ফোন করল। চঞ্চলের কথা মত অভি চলে এলো একটা মেট্রো স্টেশনে। দুলাল ফিরে গেল হোটেলে আগামীকালের আগ্রা ট্রিপের জন্য রেডি হতে। অভি চঞ্চল, তৃণা আর ওদের মেয়ের সাথে গেল সার্ক  ইউনিভার্সিটি এলাকায় ওদের আরেক বন্ধু লেনিনগ্রাদের লিপির মেয়ে শুচিস্মিতার সাথে দেখা করতে। ও সেখানে পড়াশুনা করে। চঞ্চলের ভাষায় শুচিস্মিতা আমাদের সোভিয়েততুত ভাগ্নি। ওর সাথে দেখা করা আর কোথাও খাওয়া দাওয়া করা। এর মধ্যে চঞ্চল ওদের আগামীকালের আগ্রা ট্রিপ কনফার্ম করেছে। কাল খুব ভোরে রওনা হতে হবে। তাই ইচ্ছে থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে আড্ডা  দেওয়ার উপায় ছিল না।

http://bijansaha.ru/album.php?tag=109

 


 

 

 

Comments

Popular posts from this blog

সোভিয়েত থেকে রাশিয়া

কাজান

আগ্রা মথুরা বৃন্দাবন